কম পানি পানেই কমতে পারে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা

কম পানি পানেই কমতে পারে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

কাজের মাঝে হঠাৎ ভুলে যাওয়া, বারবার একই জিনিস খুঁজে না পাওয়া, কোনো বিষয়ে দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ ধরে রাখতে না পারা, অকারণ ক্লান্তি, মাথা ভার লাগা কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা-এ ধরনের সমস্যায় এখন ভুগছেন অসংখ্য মানুষ। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব সমস্যার জন্য মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি, অতিরিক্ত কাজের চাপ কিংবা বয়সকে দায়ী করা হয়।

কিন্তু চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদরা বলছেন, অনেক সময় এর পেছনে লুকিয়ে থাকতে পারে অত্যন্ত সাধারণ কিন্তু অবহেলিত একটি কারণ-শরীরে পানির ঘাটতি বা ডিহাইড্রেশন।

 

বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন স্বাস্থ্য গবেষণা দেখিয়েছে, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া শুধু শরীরকে দুর্বল করে না, এটি মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ, মানসিক স্থিতি, হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি এমনকি দীর্ঘমেয়াদি আয়ুকেও প্রভাবিত করতে পারে। চিকিৎসকদের মতে, অনেক মানুষ দীর্ঘদিন ধরে হালকা ডিহাইড্রেশনে ভুগলেও সেটি বুঝতে পারেন না। অথচ শরীরের প্রতিটি অঙ্গের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য পর্যাপ্ত পানি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

মানবদেহের প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশই পানি দিয়ে গঠিত। শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি। রক্ত, কোষ, মস্তিষ্ক, পেশি, ফুসফুস, কিডনি-প্রায় সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গই সঠিকভাবে কাজ করার জন্য পানির ওপর নির্ভরশীল। বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের প্রায় ৭৫ শতাংশই পানি। ফলে শরীরে সামান্য পানির ঘাটতিও প্রথমে প্রভাব ফেলে মস্তিষ্কের ওপর।

 

চিকিৎসকদের মতে, শরীরের মোট ওজনের মাত্র ১ থেকে ২ শতাংশ পানি কমে গেলেই মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা কমতে শুরু করে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৬০ কেজি ওজনের একজন মানুষের শরীরে মাত্র ১ থেকে ১.২ লিটার পানির ঘাটতি তৈরি হলেও মানসিক সক্ষমতার ওপর তার প্রভাব পড়তে পারে।

 

মস্তিষ্কের কোষ বা নিউরনগুলো একে অপরের সঙ্গে বৈদ্যুতিক সংকেতের মাধ্যমে যোগাযোগ করে। এই প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রাখতে শরীরে পর্যাপ্ত পানি প্রয়োজন। ডিহাইড্রেশনের ফলে মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ কমে যেতে পারে, অক্সিজেন সরবরাহ ব্যাহত হতে পারে এবং নিউরনের কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। এর ফলে তথ্য প্রক্রিয়াকরণের গতি ধীর হয়ে যায়, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং মনোযোগ কমে যায়।

 

চিকিৎসকদের মতে, অনেক মানুষ অফিসে কাজ করার সময় হঠাৎ ক্লান্তি, মনোযোগের সমস্যা কিংবা ভুলে যাওয়ার সমস্যাকে মানসিক চাপ মনে করেন। কিন্তু বাস্তবে শরীরে পানির ঘাটতিই অনেক ক্ষেত্রে এসব সমস্যার মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

 

ডিহাইড্রেশন শরীরের শক্তি উৎপাদন প্রক্রিয়াকেও প্রভাবিত করে। পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কোষগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। ফলে শরীরে দুর্বলতা, ক্লান্তি, অবসাদ, কাজের প্রতি অনীহা, শরীর ভার লাগা এবং কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়।

 

অনেকেই বিকেলের দিকে হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং বারবার চা বা কফি পান করেন। পুষ্টিবিদদের মতে, অনেক সময় এক গ্লাস পানি কফির চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। কারণ শরীর যখন পানিশূন্য হয়ে পড়ে, তখন অতিরিক্ত ক্যাফেইন অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা আরও বাড়াতে পারে।

 

বাংলাদেশের মতো গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি আরও বেশি। গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে প্রচুর পানি হারায়। একই সঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে যায় গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও লবণ। যারা দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করেন, যেমন নির্মাণ শ্রমিক, রিকশাচালক, ডেলিভারি কর্মী কিংবা মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা, তারা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। তবে শুধু বাইরে কাজ করা মানুষই নয়, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে কাজ করা অফিসকর্মীরাও অনেক সময় পর্যাপ্ত পানি পান করেন না।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তৃষ্ণা পেলেই পানি পান করা যথেষ্ট নয়। কারণ তৃষ্ণা অনুভব করার অর্থ হলো শরীরে ইতোমধ্যে পানির ঘাটতি শুরু হয়ে গেছে। তাই নিয়মিত বিরতিতে পানি পান করা উচিত। অনেক চিকিৎসক প্রতি এক থেকে দুই ঘণ্টা পর পর কিছু পরিমাণ পানি পান করার পরামর্শ দেন।

 

শরীরে পানির ঘাটতি হয়েছে কি না, তার অন্যতম সহজ লক্ষণ হলো প্রস্রাবের রং। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রস্রাব হালকা হলুদ বা প্রায় স্বচ্ছ হয়ে থাকে। কিন্তু যদি প্রস্রাবের রং গাঢ় হলুদ বা কমলা হয়ে যায়, তাহলে সেটি শরীরে পানির ঘাটতির ইঙ্গিত হতে পারে।

 

ডিহাইড্রেশনের আরেকটি লক্ষণ হলো ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া। হাতের পেছনের অংশের ত্বক চিমটি কেটে ছেড়ে দিলে যদি দ্রুত আগের অবস্থায় ফিরে আসে, তবে শরীরে পানির ভারসাম্য স্বাভাবিক রয়েছে বলে ধরা হয়। কিন্তু ত্বক যদি ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তাহলে সেটি ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ হতে পারে। যদিও বয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষা সব সময় নির্ভরযোগ্য নাও হতে পারে।

 

শরীরে দীর্ঘদিন পানির ঘাটতি থাকলে কিডনির ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। কিডনির প্রধান কাজ শরীর থেকে বর্জ্য অপসারণ করা। পর্যাপ্ত পানি না থাকলে কিডনিতে চাপ বাড়ে, প্রস্রাব কমে যায় এবং কিডনিতে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। দীর্ঘমেয়াদে কিডনির কার্যক্ষমতাও কমে যেতে পারে।

 

ডিহাইড্রেশন হৃদ্‌যন্ত্রকেও প্রভাবিত করতে পারে। শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে রক্তের পরিমাণও কমে যায়। এতে হৃদ্‌যন্ত্রকে স্বাভাবিক রক্তসঞ্চালন বজায় রাখতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। ফলে হৃদস্পন্দন বেড়ে যেতে পারে, রক্তচাপ কমে যেতে পারে এবং অনেক ক্ষেত্রে মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে।

 

বয়স্কদের ক্ষেত্রে ডিহাইড্রেশনের ঝুঁকি আরও বেশি। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তৃষ্ণা অনুভব করার ক্ষমতা কমে যায়। ফলে অনেক বয়স্ক মানুষ পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। এর ফলে বিভ্রান্তি, স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি, প্রস্রাবের সংক্রমণ এবং কিডনি সমস্যার মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

 

শিশুদের ক্ষেত্রেও ডিহাইড্রেশন অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। জ্বর, ডায়রিয়া, বমি কিংবা অতিরিক্ত খেলাধুলার কারণে শিশুদের শরীর থেকে দ্রুত পানি বের হয়ে যায়। মুখ শুকিয়ে যাওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া, কান্নার সময় চোখে পানি না আসা কিংবা অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব শিশুদের ডিহাইড্রেশনের গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হতে পারে।

 

অনেক মানুষ মনে করেন চা, কফি বা কোমল পানীয় পান করলেই শরীরের পানির চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। চিকিৎসকদের মতে, এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। অতিরিক্ত ক্যাফেইনযুক্ত পানীয় অনেক সময় শরীর থেকে আরও বেশি পানি বের করে দিতে পারে। বিশুদ্ধ পানির কোনো বিকল্প নেই। তবে ডাবের পানি, লেবুর শরবত, ফলের রস কিংবা স্যুপও শরীরে তরল সরবরাহে সহায়তা করতে পারে।

 

কতটুকু পানি পান করা উচিত, তা বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে। সাধারণভাবে একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দৈনিক প্রায় ৩ থেকে ৩.৭ লিটার এবং নারীদের প্রায় ২.২ থেকে ২.৭ লিটার তরল গ্রহণের প্রয়োজন হতে পারে। গরম আবহাওয়া, ব্যায়াম বা শারীরিক পরিশ্রমের ক্ষেত্রে এই চাহিদা আরও বেড়ে যেতে পারে।

 

সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত পানি না খেলে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদ্‌রোগ, কিডনি রোগ, বিপাকীয় জটিলতা এবং দ্রুত বার্ধক্যের ঝুঁকি বাড়তে পারে। কিছু গবেষণায় পর্যাপ্ত হাইড্রেশনকে দীর্ঘায়ুর সঙ্গেও সম্পর্কিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

তবে কিছু পরিস্থিতিতে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া প্রয়োজন। বারবার বমি হওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, অত্যন্ত কম প্রস্রাব হওয়া, বিভ্রান্তি, দ্রুত হৃদস্পন্দন, শ্বাসকষ্ট কিংবা তীব্র দুর্বলতা দেখা দিলে তা গুরুতর ডিহাইড্রেশনের লক্ষণ হতে পারে।

 

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে অনেক মানুষ কাজ, মোবাইল, অফিস, মিটিং এবং মানসিক চাপের কারণে নিজের শরীরের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদাটিই ভুলে যাচ্ছেন-পানি পান। মাথাব্যথা, ক্লান্তি, ভুলে যাওয়া, মনোযোগ কমে যাওয়া কিংবা সারাক্ষণ অবসন্ন লাগার পেছনে অনেক সময় বড় কোনো রোগ নয়, বরং লুকিয়ে থাকতে পারে সাধারণ একটি সমস্যা-ডিহাইড্রেশন।

 

চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, পর্যাপ্ত পানি পান করা শুধু তৃষ্ণা মেটানোর বিষয় নয়। এটি মস্তিষ্ক, হৃদ্‌যন্ত্র, কিডনি, ত্বক, স্মৃতিশক্তি এবং পুরো শরীরকে সচল রাখার অন্যতম প্রধান উপাদান। তাই সুস্থ থাকতে এবং কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে প্রতিদিন নিয়মিত পর্যাপ্ত পানি পান করার অভ্যাস গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে সহজ, সবচেয়ে সাশ্রয়ী এবং সবচেয়ে কার্যকর স্বাস্থ্যসুরক্ষা।


সম্পর্কিত নিউজ