{{ news.section.title }}
সন্তানহীনতার দায় শুধু নারীর নয়, অবহেলিত পুরুষের চিকিৎসা
সন্তান ধারণে ব্যর্থতার জন্য অনেক ক্ষেত্রেই একমাত্র নারীকেই দায়ী করা হয়। অথচ গবেষণা বলছে, প্রায় অর্ধেক বন্ধ্যত্বের ঘটনার পেছনে পুরুষজনিত কারণও দায়ী। তা সত্ত্বেও চিকিৎসা ব্যবস্থা, গবেষণা ও জনসচেতনতায় পুরুষের বন্ধ্যত্বের বিষয়টি এখনো তুলনামূলকভাবে উপেক্ষিত রয়ে গেছে।
সন্তান না হওয়ার দায় কি শুধু নারীর? নীরবে বাড়ছে পুরুষ বন্ধ্যত্বের সংকট
সন্তান না হওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের সমাজে এখনো একটি প্রচলিত ধারণা কাজ করে-সমস্যাটি সম্ভবত নারীর। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রেই চিকিৎসার প্রাথমিক ধাপেও নারীকেই মূল রোগী হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ছয়টি দম্পতির মধ্যে একটি দম্পতি বন্ধ্যত্ব সমস্যার সম্মুখীন হয়। এই সমস্যার প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রেই পুরুষজনিত কারণ সরাসরি বা আংশিকভাবে দায়ী। তবুও চিকিৎসা ব্যবস্থা, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং জনসচেতনতায় পুরুষ বন্ধ্যত্ব এখনও অনেকাংশে উপেক্ষিত একটি বিষয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘদিনের নীরবতা এখন একটি বৈশ্বিক স্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে কেন বাড়ছে পুরুষ বন্ধ্যত্ব?
গত কয়েক দশকে পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পুরুষদের শুক্রাণুর সংখ্যা এবং গুণগত মান ধীরে ধীরে কমছে।
একটি বহুল আলোচিত গবেষণায় দেখা যায়, গত কয়েক দশকে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পুরুষদের গড় শুক্রাণু ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। পরিবেশ দূষণ, জীবনযাত্রার পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস, মানসিক চাপ এবং বিভিন্ন রাসায়নিকের প্রভাবকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অনেক পুরুষ বুঝতেই পারেন না যে তাদের প্রজনন ক্ষমতায় সমস্যা রয়েছে। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ থাকে না। ফলে সন্তান নেওয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পরেই সমস্যাটি সামনে আসে।
কেন চিকিৎসার কেন্দ্রে এখনো নারীরা?
বহু দেশে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, ফার্টিলিটি চিকিৎসার অধিকাংশ সেবা নারীকেন্দ্রিক।
দম্পতিরা চিকিৎসকের কাছে গেলেও প্রথমে নারীর হরমোন পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড, ওভুলেশন পরীক্ষা এবং অন্যান্য জটিল পরীক্ষা শুরু হয়। অন্যদিকে পুরুষের সবচেয়ে মৌলিক পরীক্ষা, অর্থাৎ সিমেন অ্যানালাইসিস, অনেক ক্ষেত্রেই দীর্ঘ সময় পরে করা হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি শুধু সময় নষ্ট করে না, বরং চিকিৎসার ব্যয়ও কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের গবেষকরা বলছেন, অনেক পুরুষ চিকিৎসা নিতে অনীহা দেখান। একই সঙ্গে সমাজে বিদ্যমান পৌরুষের ধারণাও অনেককে পরীক্ষা করাতে নিরুৎসাহিত করে।
পুরুষ বন্ধ্যত্বের প্রধান কারণগুলো কী?
চিকিৎসকদের মতে, পুরুষ বন্ধ্যত্বের কারণ অনেক ধরনের হতে পারে।
সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে-
কম শুক্রাণু সংখ্যা, শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যাওয়া, শুক্রাণুর গঠনগত ত্রুটি, হরমোনজনিত সমস্যা, ভ্যারিকোসিল, জিনগত সমস্যা, সংক্রমণ, প্রজনন অঙ্গের জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট কারণও খুঁজে পাওয়া যায় না।
জীবনযাত্রা কীভাবে ক্ষতি করছে?
আধুনিক জীবনযাত্রা পুরুষদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলছে। ধূমপান শুক্রাণুর ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অতিরিক্ত মদ্যপান টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমাতে পারে। স্থূলতা হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাবও বড় একটি কারণ। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব পুরুষ নিয়মিত কম ঘুমান, তাদের শুক্রাণুর গুণগত মান কম হতে পারে।
মানসিক চাপও কি দায়ী?
হ্যাঁ।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়। এটি টেস্টোস্টেরন উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে। অফিসের চাপ, আর্থিক অনিশ্চয়তা, পারিবারিক সমস্যা এবং সন্তান না হওয়ার মানসিক যন্ত্রণা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক পুরুষ বিষণ্নতা, উদ্বেগ এবং আত্মবিশ্বাসহীনতার মধ্যে ভোগেন।
মোবাইল, ল্যাপটপ ও তাপের প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছেন। দীর্ঘ সময় কোলে ল্যাপটপ ব্যবহার, অত্যধিক গরম পরিবেশে কাজ করা, নিয়মিত সনা ব্যবহার কিংবা টাইট পোশাক কিছু ক্ষেত্রে শুক্রাণু উৎপাদনে প্রভাব ফেলতে পারে।যদিও এ বিষয়ে এখনও আরও গবেষণা প্রয়োজন, তবে চিকিৎসকরা অতিরিক্ত তাপ এড়ানোর পরামর্শ দেন।
অ্যানাবলিক স্টেরয়েডের বিপদ
জিমে পেশি বাড়ানোর জন্য অনেকেই স্টেরয়েড ব্যবহার করেন। এই স্টেরয়েড শরীরে টেস্টোস্টেরনের স্বাভাবিক উৎপাদন বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে অণ্ডকোষ ছোট হয়ে যাওয়া, শুক্রাণু উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বন্ধ্যত্বের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।অনেক ক্ষেত্রে এই ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদী হয়ে যায়।
পুরুষ বন্ধ্যত্ব অন্য রোগের ইঙ্গিতও হতে পারে
চিকিৎসকরা বলছেন, পুরুষ বন্ধ্যত্ব কখনও কখনও শরীরের অন্য সমস্যারও ইঙ্গিত হতে পারে। হরমোনজনিত রোগ, ডায়াবেটিস, থাইরয়েড সমস্যা, স্থূলতা, মেটাবলিক সিনড্রোম, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে ক্যানসারের সঙ্গেও এর সম্পর্ক পাওয়া গেছে।অস্বাভাবিক সিমেন রিপোর্ট অনেক সময় ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রাথমিক সংকেত হতে পারে।
কোন লক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে?
সব ক্ষেত্রে উপসর্গ থাকে না। তবে কিছু লক্ষণ দেখা গেলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত-
- যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়া
- ইরেকটাইল সমস্যা
- অণ্ডকোষে ব্যথা বা ফোলা
- হরমোনজনিত পরিবর্তন
- দীর্ঘদিন সন্তান না হওয়া
- পূর্বের অপারেশন বা আঘাতের ইতিহাস
কী কী পরীক্ষা করা হয়?
পুরুষ বন্ধ্যত্ব মূল্যায়নের প্রথম ধাপ হলো সিমেন অ্যানালাইসিস। এছাড়া চিকিৎসকরা প্রয়োজনে- হরমোন পরীক্ষা, আল্ট্রাসাউন্ড, জেনেটিক টেস্ট, সংক্রমণ পরীক্ষা, অণ্ডকোষ মূল্যায়ন করতে পারেন। অনেক ক্ষেত্রে একাধিকবার পরীক্ষা করা হয়।
চিকিৎসা কি সম্ভব?
অধিকাংশ মানুষ মনে করেন পুরুষ বন্ধ্যত্ব মানেই স্থায়ী সমস্যা। বাস্তবে তা নয়। জীবনযাত্রার পরিবর্তন, ওষুধ, হরমোন থেরাপি, অস্ত্রোপচার এবং আধুনিক ফার্টিলিটি প্রযুক্তির মাধ্যমে বহু পুরুষ সফলভাবে বাবা হতে সক্ষম হচ্ছেন। ভ্যারিকোসিল অপারেশন, সংক্রমণের চিকিৎসা এবং হরমোন থেরাপি অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর।
আইভিএফ ও আইসিএসআই কতটা সাহায্য করে?
বর্তমানে আইভিএফ এবং আইসিএসআই প্রযুক্তি অনেক দম্পতির জন্য আশার আলো হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শুক্রাণুর সংখ্যা অত্যন্ত কম হলেও আইসিএসআই পদ্ধতির মাধ্যমে সফলভাবে সন্তান নেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব প্রযুক্তির আগে পুরুষের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন অত্যন্ত জরুরি।
সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো জরুরি
অনেক পুরুষ এখনও বন্ধ্যত্ব নিয়ে কথা বলতে লজ্জা পান। অনেকে মনে করেন এটি পুরুষত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে সমস্যাটি লুকিয়ে রাখা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মানসিকতা পরিবর্তন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধ্যত্ব কোনো ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। এটি একটি চিকিৎসাবিজ্ঞানের বিষয়।
চিকিৎসকরা কী পরামর্শ দিচ্ছেন?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এক বছর নিয়মিত চেষ্টা করার পরও সন্তান না হলে নারী ও পুরুষ উভয়ের একসঙ্গে পরীক্ষা করা উচিত। যদি নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি হয়, তাহলে ছয় মাসের মধ্যেই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রাথমিক পর্যায়ে পুরুষের পরীক্ষা করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে দ্রুত সমস্যা শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো যায়?
চিকিৎসকরা কয়েকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন-
- ধূমপান বন্ধ করা
- মদ্যপান কমানো
- ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা
- নিয়মিত ব্যায়াম করা
- পর্যাপ্ত ঘুমানো
- মানসিক চাপ কমানো
- স্টেরয়েড ব্যবহার এড়ানো
- সুষম খাদ্য গ্রহণ
- ডায়াবেটিস ও অন্যান্য রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখা
নীরব সংকট থেকে জনস্বাস্থ্য ইস্যু
বিশ্বজুড়ে পুরুষ বন্ধ্যত্ব এখন শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সমস্যা নয়, বরং একটি বড় জনস্বাস্থ্য ইস্যুতে পরিণত হচ্ছে। চিকিৎসা, গবেষণা এবং জনসচেতনতায় পুরুষদের আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সন্তান না হওয়ার দায় কোনো একক ব্যক্তির নয়। এটি দম্পতির একটি যৌথ স্বাস্থ্য সমস্যা।
আর চিকিৎসার শুরু থেকেই নারী ও পুরুষ উভয়কে সমান গুরুত্ব দেওয়া গেলে অনেক ক্ষেত্রেই দ্রুত রোগ নির্ণয়, কম মানসিক চাপ এবং সফল চিকিৎসার সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে।