দুপুরে ২০ মিনিটের ঘুমে মিলতে পারে বড় উপকার, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

দুপুরে ২০ মিনিটের ঘুমে মিলতে পারে বড় উপকার, যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দুপুরের খাবারের পর হালকা ঘুম ঘুম ভাব অনেকের কাছেই পরিচিত একটি অনুভূতি। অফিসে কাজের চাপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, ব্যবসার ব্যস্ততা কিংবা ঘরের নানা দায়িত্বের কারণে অধিকাংশ মানুষ এই তন্দ্রাচ্ছন্ন ভাবকে উপেক্ষা করেন। অনেকে মনে করেন, দুপুরে ঘুমালে অলসতা বাড়ে কিংবা রাতে ঘুমের সমস্যা হতে পারে। তবে সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা এবং বিশেষজ্ঞদের মতামত বলছে, স্বল্প সময়ের একটি ‘পাওয়ার ন্যাপ’ শরীর ও মনের জন্য অত্যন্ত উপকারী হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুরে ১০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত ঘুম ক্লান্তি দূর করার পাশাপাশি মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা বাড়ায়, মনোযোগ উন্নত করে, মানসিক চাপ কমায় এবং কর্মদক্ষতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক বড় প্রতিষ্ঠান, গবেষণা সংস্থা এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞও দিনের মাঝামাঝি সময়ে অল্প সময়ের বিশ্রামকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন।

 

জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের প্রধান পুষ্টিবিদ ও উপদেষ্টা আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, দুপুরের স্বল্প সময়ের ঘুম শরীরকে পুনরুজ্জীবিত করতে সাহায্য করে। তবে এই ঘুমের সময়সীমা নিয়ন্ত্রিত হওয়া জরুরি। খুব বেশি সময় ঘুমালে উল্টো শরীরে ঝিমুনি এবং রাতের ঘুমে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

 

পাওয়ার ন্যাপ আসলে কী

পাওয়ার ন্যাপ বলতে দিনের বেলায় ১০ থেকে ৩০ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত ঘুমকে বোঝানো হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হলো শরীর ও মস্তিষ্ককে অল্প সময়ের জন্য বিশ্রাম দিয়ে পুনরায় সক্রিয় করে তোলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘুম গভীর ঘুমের পর্যায়ে যাওয়ার আগেই শেষ হয়ে যায়। ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর অবসাদ বা ভারী অনুভূতির পরিবর্তে মানুষ নিজেকে সতেজ ও কর্মক্ষম অনুভব করেন।

 

ঘুমবিষয়ক গবেষকরা বলছেন, মানুষের শরীরে একটি স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম কাজ করে। দুপুরের দিকে, বিশেষ করে খাবার গ্রহণের পর শরীরের শক্তির মাত্রা কিছুটা কমে যায়। এ সময় সামান্য বিশ্রাম মস্তিষ্কের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

 

কেন দুপুরে ঘুম পায়

চিকিৎসকদের মতে, দুপুরের ঘুম শুধু ভাত খাওয়ার কারণে আসে না। মানুষের শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ছন্দের কারণেও দুপুরে কিছুটা ক্লান্তি ও তন্দ্রাচ্ছন্নতা দেখা দেয়। রাতের ঘুম পর্যাপ্ত না হলে এই প্রবণতা আরও বেড়ে যায়। এছাড়া অতিরিক্ত কাজের চাপ, দীর্ঘ সময় কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, মানসিক চাপ এবং পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবও দুপুরের ক্লান্তির অন্যতম কারণ।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুপুরের ঘুমের প্রয়োজন অনুভব করা সবসময় অলসতার লক্ষণ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এটি শরীরের বিশ্রামের স্বাভাবিক সংকেত।

 

কর্মক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর

দীর্ঘ সময় একটানা কাজ করার ফলে মস্তিষ্কের মনোযোগ ও দক্ষতা কমে যেতে পারে। এ সময় অল্প সময়ের একটি পাওয়ার ন্যাপ কর্মক্ষমতা পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, স্বল্প সময়ের ঘুম মনোযোগ, সতর্কতা এবং মানসিক কর্মক্ষমতা বাড়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। অনেক প্রতিষ্ঠান এখন কর্মীদের জন্য ন্যাপ রুম বা বিশ্রামকক্ষও তৈরি করছে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব পেশায় দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখতে হয়, যেমন চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কিংবা শিক্ষার্থীরা, তাদের জন্য পাওয়ার ন্যাপ বিশেষভাবে উপকারী হতে পারে।

 

সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়ায়

মস্তিষ্ক পর্যাপ্ত বিশ্রাম পেলে তথ্য বিশ্লেষণের ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। এতে দ্রুত এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হয়। গবেষকদের মতে, ঘুমের অভাব মানুষের বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে স্বল্প সময়ের বিশ্রাম মানসিক সতর্কতা ফিরিয়ে আনে এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা উন্নত করে।

 

বিশেষ করে যেসব কাজে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি, সেখানে পাওয়ার ন্যাপ ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

 

স্মৃতিশক্তি ও শেখার ক্ষমতা উন্নত করে

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, অল্প সময়ের ঘুম মস্তিষ্কে নতুন তথ্য সংরক্ষণে সহায়তা করে। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন কোনো তথ্য শেখার পর অল্প সময়ের বিশ্রাম সেই তথ্য দীর্ঘমেয়াদে মনে রাখতে সাহায্য করতে পারে। এ কারণে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার মাঝে সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম নিলে ভালো ফল পেতে পারেন।

 

মস্তিষ্ক তথ্যকে সংগঠিত ও সংরক্ষণ করার জন্য বিশ্রামের প্রয়োজন অনুভব করে। পাওয়ার ন্যাপ সেই প্রক্রিয়াকে সহজ করে।

 

মানসিক চাপ কমায়

বর্তমান ব্যস্ত জীবনে মানসিক চাপ একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিসের চাপ, পারিবারিক দায়িত্ব এবং নানা উদ্বেগ মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, অল্প সময়ের ঘুম মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। বিশ্রামের সময় মস্তিষ্ক কিছুটা শান্ত হয় এবং মানসিক ক্লান্তি দূর হয়।

 

যারা দীর্ঘ সময় ধরে মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তাদের জন্য প্রতিদিনের স্বল্প সময়ের বিশ্রাম উপকারী হতে পারে।

 

মেজাজ ভালো রাখতে সাহায্য করে

ঘুমের অভাব মানুষের মেজাজে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিরক্তি, উদ্বেগ, হতাশা এবং অস্থিরতা বাড়তে পারে। পাওয়ার ন্যাপের পর অনেক মানুষ নিজেকে আরও ইতিবাচক এবং প্রফুল্ল অনুভব করেন। মস্তিষ্ক বিশ্রাম পাওয়ার ফলে মানসিক প্রশান্তি বৃদ্ধি পায় এবং সারাদিনের কাজে আগ্রহও বাড়ে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি দিনের বেলায় অল্প সময়ের বিশ্রামও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক।

 

হৃদ্‌স্বাস্থ্যের ওপরও থাকতে পারে ইতিবাচক প্রভাব

কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত স্বল্প সময়ের ঘুম মানসিক চাপ কমানোর মাধ্যমে হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত চাপ শরীরে বিভিন্ন হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। স্বল্প সময়ের বিশ্রাম শরীরকে কিছুটা স্বস্তি দেয় এবং চাপজনিত প্রভাব কমাতে সহায়তা করে।

 

তবে চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু পাওয়ার ন্যাপের ওপর নির্ভর না করে নিয়মিত ব্যায়াম, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং পর্যাপ্ত রাতের ঘুমও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

 

কোন সময় পাওয়ার ন্যাপ সবচেয়ে উপকারী

ঘুম বিশেষজ্ঞদের মতে, দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৩টার মধ্যে পাওয়ার ন্যাপ নেওয়ার সবচেয়ে ভালো সময়। এই সময় শরীরের শক্তির মাত্রা স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায়। ফলে এই সময়ে স্বল্প সময়ের বিশ্রাম সবচেয়ে বেশি উপকার দিতে পারে।

বিকেলের অনেক পরে ঘুমালে রাতের স্বাভাবিক ঘুমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাই সন্ধ্যার কাছাকাছি সময়ে পাওয়ার ন্যাপ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় না।

 

কতক্ষণ ঘুমানো উচিত

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাওয়ার ন্যাপের আদর্শ সময় ১০ থেকে ২০ মিনিট। কেউ কেউ ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঘুমাতে পারেন। এর বেশি সময় ঘুমালে শরীর গভীর ঘুমের পর্যায়ে প্রবেশ করতে পারে। তখন ঘুম ভাঙার পর ঝিমুনি, মাথা ভার লাগা এবং ক্লান্তি অনুভূত হতে পারে।

 

এ অবস্থাকে অনেক বিশেষজ্ঞ ‘স্লিপ ইনারশিয়া’ বলে উল্লেখ করেন। ফলে দীর্ঘ সময়ের দুপুরের ঘুম অনেক ক্ষেত্রে উপকারের পরিবর্তে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

 

কারা বেশি উপকৃত হতে পারেন

যেসব মানুষ রাতে পর্যাপ্ত ঘুমাতে পারেন না, শিফট ডিউটি করেন, দীর্ঘ সময় কাজ করেন বা মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন, তারা পাওয়ার ন্যাপ থেকে বেশি উপকার পেতে পারেন। শিক্ষার্থী, অফিসকর্মী, চিকিৎসক, গণমাধ্যমকর্মী, চালক এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কর্মরত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও এটি কার্যকর হতে পারে।

 

তবে যাদের দীর্ঘদিনের অনিদ্রা রয়েছে বা ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

 

ভালো পাওয়ার ন্যাপের জন্য কী করবেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, নীরব ও আরামদায়ক পরিবেশে স্বল্প সময়ের জন্য চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নেওয়াই সবচেয়ে ভালো। ঘর অন্ধকার বা হালকা আলোযুক্ত হলে ঘুম সহজে আসে। মোবাইল ফোন বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক ডিভাইস দূরে রাখা উচিত।কিছু বিশেষজ্ঞ ঘুমের আগে অল্প পরিমাণ কফি পান করার কথাও বলেন। কারণ কফির প্রভাব শুরু হতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। ফলে ঘুম থেকে ওঠার পর অনেকেই নিজেকে আরও সতেজ অনুভব করতে পারেন।

 

অতিরিক্ত দুপুরের ঘুমের ক্ষতিও আছে

বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, দুপুরে দীর্ঘ সময় ঘুমানো ঠিক নয়। এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় ঘুমালে রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে। এছাড়া কিছু মানুষের ক্ষেত্রে মাথাব্যথা, অবসাদ বা অতিরিক্ত ঝিমুনিও দেখা দিতে পারে। তাই পাওয়ার ন্যাপের মূল উদ্দেশ্য হলো অল্প সময়ের বিশ্রামের মাধ্যমে শরীর ও মস্তিষ্ককে পুনরায় সক্রিয় করে তোলা।

 

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ

চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, পাওয়ার ন্যাপ কখনোই রাতের পর্যাপ্ত ঘুমের বিকল্প নয়। একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতিদিন সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন। তবে ব্যস্ত জীবনে দিনের মাঝখানে ১০ থেকে ২০ মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত বিশ্রাম শরীর ও মনের জন্য উপকারী হতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুপুরের খাবারের পর যে তন্দ্রাচ্ছন্নতা আসে, সেটিকে সবসময় নেতিবাচকভাবে দেখার প্রয়োজন নেই। বরং নিয়ন্ত্রিত সময়ের একটি পাওয়ার ন্যাপ কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, মানসিক প্রশান্তি, স্মৃতিশক্তির উন্নয়ন এবং সার্বিক সুস্থতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

আধুনিক ব্যস্ত জীবনে তাই অনেক বিশেষজ্ঞই বলছেন, যদি সুযোগ থাকে, তবে দিনের মাঝামাঝি মাত্র ২০ মিনিটের একটি পাওয়ার ন্যাপ আপনার শরীর ও মনের জন্য হতে পারে সবচেয়ে সহজ এবং কার্যকর বিনিয়োগ।


সম্পর্কিত নিউজ