হিট স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য কী?

হিট স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের মধ্যে পার্থক্য কী?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন যখন বিপর্যস্ত, তখন বাড়ছে গরমজনিত অসুস্থতার ঘটনাও। প্রচণ্ড রোদ, উচ্চ তাপমাত্রা এবং বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে যাচ্ছেন। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী, দীর্ঘদিনের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যারা খোলা আকাশের নিচে কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়েই তাপপ্রবাহের সংখ্যা, স্থায়িত্ব এবং তীব্রতা বাড়ছে। এর ফলে শুধু হিট স্ট্রোক নয়, হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি জটিলতা এবং শ্বাসকষ্টের মতো গুরুতর সমস্যাও বেড়ে যাচ্ছে। প্রতি বছর অতিরিক্ত গরমের কারণে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু হচ্ছে, যার বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল যদি সময়মতো লক্ষণ শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়া যেত।

 

চিকিৎসকদের মতে, গরমের সময় সবচেয়ে বেশি যে দুটি জরুরি স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তা হলো হিট স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক। দুটি রোগের কিছু লক্ষণ একে অপরের সঙ্গে এতটাই মিল যে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বুঝতেই পারেন না আসলে কোনটি ঘটছে। ফল হিসেবে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হয়, আর সেই বিলম্বই অনেক ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে।

 

আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (AHA) জানিয়েছে, অতিরিক্ত গরমে শরীরের ওপর চাপ বেড়ে যাওয়ায় হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি কাজ করতে হয়। অন্যদিকে WHO ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) বলছে, শরীর যখন নিজের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়, তখন হিট এক্সহশন থেকে দ্রুত হিট স্ট্রোকে রূপ নিতে পারে। এই অবস্থায় দ্রুত চিকিৎসা না পেলে মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, কিডনি এবং লিভারের স্থায়ী ক্ষতি হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

 

হিট স্ট্রোক আসলে কী, কেন এটি এত বিপজ্জনক

হিট স্ট্রোক হলো গরমজনিত সবচেয়ে গুরুতর স্বাস্থ্য সমস্যা। এটি তখন ঘটে যখন শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে এবং শরীর আর অতিরিক্ত তাপ বাইরে বের করতে পারে না।

 

স্বাভাবিক অবস্থায় মানুষের শরীর ঘাম তৈরি করে এবং ত্বকের মাধ্যমে সেই ঘাম বাষ্প হয়ে শরীরকে ঠান্ডা রাখে। কিন্তু অতিরিক্ত গরম, উচ্চ আর্দ্রতা অথবা দীর্ঘ সময় রোদে থাকার কারণে এই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। তখন শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে এবং অনেক ক্ষেত্রে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হয়ে যায়।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শরীরের তাপমাত্রা এত বেশি হয়ে গেলে শুধু অস্বস্তিই হয় না, শরীরের কোষ ও প্রোটিন ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করে। মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ বাড়ে, রক্তচাপ অস্বাভাবিকভাবে ওঠানামা করতে পারে এবং বিভিন্ন অঙ্গ ধীরে ধীরে বিকল হতে শুরু করে।

 

চিকিৎসকদের ভাষায়, হিট স্ট্রোক একটি "Medical Emergency"। অর্থাৎ এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্রুত শরীর ঠান্ডা করা এবং হাসপাতালে নেওয়া না হলে মৃত্যুঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়।

হিট এক্সহশন আর হিট স্ট্রোক এক নয়

 

অনেকেই হিট এক্সহশন এবং হিট স্ট্রোককে একই বিষয় মনে করেন। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এ দুটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে।

 

হিট এক্সহশন হলো হিট স্ট্রোকের আগের ধাপ। এ সময় শরীরে অতিরিক্ত ঘাম হয়, প্রচণ্ড দুর্বল লাগে, মাথা ঘোরে, পেশিতে টান ধরে, অতিরিক্ত তৃষ্ণা লাগে এবং শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। যদি এই পর্যায়ে বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি এবং ঠান্ডা পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই রোগী সুস্থ হয়ে ওঠেন।

 

কিন্তু এই অবস্থাকে অবহেলা করলে শরীরের তাপমাত্রা আরও বাড়তে থাকে এবং একসময় হিট স্ট্রোক দেখা দেয়। তখন রোগী বিভ্রান্ত হয়ে পড়তে পারেন, কথা জড়িয়ে যেতে পারে, আচরণ পরিবর্তন হতে পারে, এমনকি খিঁচুনি বা অচেতনও হয়ে যেতে পারেন।

 

CDC বলছে, হিট এক্সহশনকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। কারণ এটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই প্রাণঘাতী হিট স্ট্রোকে রূপ নিতে পারে।

 

হার্ট অ্যাটাক কী এবং কেন হয়

হার্ট অ্যাটাক সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি চিকিৎসাজনিত জরুরি অবস্থা। এটি শরীর অতিরিক্ত গরম হওয়ার কারণে নয়, বরং হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহকারী করোনারি ধমনিতে রক্তপ্রবাহ হঠাৎ কমে গেলে বা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলে ঘটে।

 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধমনির ভেতরে জমে থাকা চর্বি বা প্লাক ফেটে সেখানে রক্ত জমাট বাঁধে। এর ফলে হৃদপেশীতে অক্সিজেন পৌঁছাতে পারে না এবং সেই অংশের কোষ মারা যেতে শুরু করে।

 

আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি (ACC) বলছে, চিকিৎসা শুরু করতে যত বেশি দেরি হয়, হৃদপেশীর ক্ষতি তত বেশি হয়। তাই হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, গরমের সময় শরীরে পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত ঘাম এবং রক্ত ঘন হয়ে যাওয়ার কারণে হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কাজ করতে হয়। যাদের আগে থেকেই হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই চাপ হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।


হিট স্ট্রোক ও হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ কেন এতটা মিল, আর কোথায় রয়েছে সবচেয়ে বড় পার্থক্য

চিকিৎসকদের মতে, হিট স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক-দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন রোগ হলেও কিছু লক্ষণ একে অপরের সঙ্গে এতটাই মিল যে সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। উভয় ক্ষেত্রেই রোগী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়তে পারেন, শরীর দুর্বল লাগতে পারে, ঘাম হতে পারে, শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে এবং দ্রুত হৃদস্পন্দন অনুভূত হতে পারে। এই মিলের কারণেই অনেক সময় রোগী বা তার স্বজনরা সমস্যার গুরুত্ব বুঝতে পারেন না।

 

বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, পার্থক্য বোঝার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হলো রোগটি কীভাবে শুরু হয়েছে এবং কোন লক্ষণটি সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে, সেটি লক্ষ্য করা। যদি দীর্ঘ সময় রোদে কাজ করা, প্রচণ্ড গরমে হাঁটা, পর্যাপ্ত পানি না খাওয়া বা অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রমের পর অসুস্থতা শুরু হয়, তাহলে হিট স্ট্রোকের সম্ভাবনা বেশি থাকে। অন্যদিকে কোনো ব্যক্তির আগে থেকে হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল বা ধূমপানের ইতিহাস থাকলে এবং হঠাৎ তীব্র বুকব্যথা শুরু হলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হবে।

 

WHO বলছে, হিট স্ট্রোকে শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হয়ে যায়। রোগীর শরীর স্পর্শ করলে অস্বাভাবিক গরম লাগতে পারে। তবে সব সময় শরীর শুকনো থাকবে-এমন ধারণাও সঠিক নয়। বিশেষ করে যারা পরিশ্রমজনিত হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, তাদের অনেকের শরীরে তখনও ঘাম থাকতে পারে।

 

অন্যদিকে হার্ট অ্যাটাকে শরীরের তাপমাত্রা সাধারণত স্বাভাবিকই থাকে। প্রধান সমস্যা দেখা দেয় হৃদযন্ত্রে রক্ত সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণে। তাই রোগী বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী কিছু চেপে বসার অনুভূতি কিংবা জ্বালাপোড়া ধরনের ব্যথার কথা বেশি বলেন।

 

হিট স্ট্রোকের লক্ষণগুলো কীভাবে ধাপে ধাপে বাড়তে থাকে

চিকিৎসকদের মতে, হিট স্ট্রোক সাধারণত হঠাৎ করেই শুরু হয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর আগে শরীর কয়েকটি সতর্ক সংকেত দেয়, যেগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

 

প্রথম দিকে প্রচণ্ড তৃষ্ণা, দুর্বলতা, মাথা ভার লাগা, অতিরিক্ত ঘাম, পেশিতে টান ধরা, মাথাব্যথা এবং অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। অনেকেই এটিকে সাধারণ গরমের ক্লান্তি মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু এই সময়ই দ্রুত ছায়াযুক্ত স্থানে যাওয়া, ঠান্ডা পানি পান করা এবং বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।

 

অবস্থা আরও খারাপ হলে রোগীর শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। বিভ্রান্তি, অসংলগ্ন কথা বলা, হাঁটতে সমস্যা হওয়া, ভারসাম্য হারানো, অস্বাভাবিক আচরণ, বমি, দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস এবং দ্রুত হৃদস্পন্দন দেখা দিতে পারে।

 

সবচেয়ে গুরুতর অবস্থায় রোগী খিঁচুনিতে আক্রান্ত হতে পারেন, অজ্ঞান হয়ে যেতে পারেন অথবা কোমায় চলে যেতে পারেন। চিকিৎসকদের মতে, এই পর্যায়ে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত মূল্যবান। দ্রুত শরীর ঠান্ডা করা এবং জরুরি চিকিৎসা শুরু না করলে মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেড়ে যায়।

 

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ সবসময় একই রকম হয় না

অনেকের ধারণা, হার্ট অ্যাটাক মানেই বুকে প্রচণ্ড ব্যথা। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি সব সময় এমন নয়।

 

American Heart Association-এর তথ্য অনুযায়ী, হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে সাধারণ লক্ষণ হলো বুকের মাঝখানে চাপ, ভারী অনুভূতি, জ্বালাপোড়া বা কয়েক মিনিট ধরে স্থায়ী ব্যথা। এই ব্যথা অনেক সময় কমে আবার শুরু হতে পারে।

 

শুধু বুকেই নয়, এই ব্যথা ধীরে ধীরে বাম হাত, দুই হাত, কাঁধ, ঘাড়, চোয়াল, পিঠ কিংবা ওপরের পেটে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অনেক রোগী এটিকে গ্যাসের ব্যথা ভেবে ভুল করেন।

 

এর পাশাপাশি শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব, মাথা ঘোরা, দুর্বল লাগা এবং হঠাৎ অস্বাভাবিক ক্লান্তিও দেখা দিতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে বুকব্যথা খুব বেশি না থাকলেও এসব লক্ষণই প্রধান হয়ে ওঠে।

 

নারীদের ক্ষেত্রে কেন হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত করা কঠিন

চিকিৎসা গবেষণায় দেখা গেছে, নারীদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ অনেক সময় পুরুষদের তুলনায় ভিন্ন হতে পারে।

 

অনেক নারী তীব্র বুকব্যথার পরিবর্তে অস্বাভাবিক ক্লান্তি, ঘুম ঘুম ভাব, বদহজম, বমি বমি ভাব, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা, পিঠে অস্বস্তি কিংবা শ্বাসকষ্ট অনুভব করেন। এ কারণে অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তিনি হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হয়েছেন।

 

Mayo Clinic-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অস্বাভাবিক লক্ষণগুলোর কারণে নারীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে প্রায়ই দেরি হয়ে যায়। ফলে হৃদপেশীর ক্ষতির ঝুঁকিও বেড়ে যায়।

 

বিশেষ করে ৫০ বছরের বেশি বয়সী নারী, ডায়াবেটিস রোগী এবং উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তিদের এসব লক্ষণকে কখনোই হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়।

 

ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে কেন বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেক সময় "Silent Heart Attack" হতে পারে। এ ক্ষেত্রে তীব্র বুকব্যথা নাও থাকতে পারে। পরিবর্তে হঠাৎ অতিরিক্ত ঘাম, দুর্বলতা, শ্বাসকষ্ট, বমি বমি ভাব অথবা অস্বাভাবিক ক্লান্তিই একমাত্র লক্ষণ হিসেবে দেখা দিতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের ডায়াবেটিসে স্নায়ুর সংবেদনশীলতা কমে যাওয়ার কারণে অনেক সময় ব্যথার অনুভূতি স্বাভাবিক থাকে না। এই কারণেই ডায়াবেটিস রোগীদের ক্ষেত্রে সামান্য সন্দেহ হলেও দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে

হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকেন যারা দীর্ঘ সময় রোদে বা গরম পরিবেশে কাজ করেন। নির্মাণশ্রমিক, কৃষক, ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক, ডেলিভারি কর্মী, কারখানার শ্রমিক এবং ক্রীড়াবিদদের মধ্যে এই ঝুঁকি বেশি।

 

শিশু এবং বয়স্কদের শরীর তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে তুলনামূলক দুর্বল হওয়ায় তারাও উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন। একইভাবে গর্ভবতী নারী, স্থূলতা, কিডনি রোগ, হৃদরোগ বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেও গরমের প্রভাব বেশি হতে পারে।

 

হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকির ক্ষেত্রে বয়স, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, উচ্চ কোলেস্টেরল, স্থূলতা, অনিয়মিত জীবনযাপন, পারিবারিক ইতিহাস এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

 

চিকিৎসকদের মতে, যদি কোনো ব্যক্তি একই সঙ্গে হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকেন এবং প্রচণ্ড গরমে দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন, তাহলে তার ক্ষেত্রে দুটি সমস্যারই ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যেতে পারে।

 

গরমের সময় কেন হৃদযন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে

তাপমাত্রা বেড়ে গেলে শরীর নিজেকে ঠান্ডা রাখার জন্য ত্বকের দিকে বেশি রক্ত পাঠাতে শুরু করে। ফলে হৃদযন্ত্রকে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি পরিশ্রম করতে হয়। অতিরিক্ত ঘামের কারণে শরীর থেকে পানি ও সোডিয়াম, পটাশিয়ামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইট বেরিয়ে যায়। এতে পানিশূন্যতা তৈরি হয় এবং রক্ত কিছুটা ঘন হয়ে যেতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পরিবর্তনের কারণে হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ বেড়ে যায়। আগে থেকেই যাদের হৃদরোগ রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত চাপ হার্ট অ্যাটাক বা অন্যান্য হৃদরোগজনিত জটিলতার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।

 

এ কারণেই চিকিৎসকেরা গরমের সময় পর্যাপ্ত পানি পান, অতিরিক্ত রোদ এড়িয়ে চলা এবং অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত বিশ্রাম নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে থাকেন।

 

হিট স্ট্রোকের সন্দেহ হলে প্রথম ১০ মিনিট কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

চিকিৎসকদের মতে, হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রথম ১০ থেকে ৩০ মিনিটকে 'গোল্ডেন পিরিয়ড' বলা হয়। এই সময়ের মধ্যে শরীরের তাপমাত্রা যত দ্রুত কমানো যায়, মস্তিষ্ক, হৃদযন্ত্র, কিডনি ও লিভারের স্থায়ী ক্ষতির ঝুঁকি তত কমে। তাই রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি শরীর ঠান্ডা করার কাজও সঙ্গে সঙ্গে শুরু করতে হবে।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (CDC) বলছে, আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রথমেই সরাসরি রোদ বা গরম পরিবেশ থেকে সরিয়ে ছায়াযুক্ত, শীতল ও বাতাস চলাচল করে এমন স্থানে নিয়ে যেতে হবে। যদি সম্ভব হয়, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে নেওয়া আরও ভালো।

 

এরপর রোগীর অতিরিক্ত পোশাক ঢিলা করে দিতে হবে অথবা প্রয়োজন হলে খুলে দিতে হবে, যাতে শরীরের তাপ সহজে বেরিয়ে যেতে পারে। শরীরে ঠান্ডা পানি ছিটানো, ভেজা তোয়ালে দিয়ে মুছে দেওয়া কিংবা ফ্যানের বাতাস দেওয়া শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমাতে সহায়তা করে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘাড়, বগল এবং কুঁচকির মতো বড় রক্তনালির স্থানে বরফ বা আইস প্যাক ব্যবহার করলে শরীর দ্রুত ঠান্ডা হতে পারে। তবে বরফ সরাসরি ত্বকের ওপর দীর্ঘ সময় ধরে রাখা উচিত নয়; কাপড়ে মুড়ে ব্যবহার করাই নিরাপদ।

 

কখন পানি খাওয়াবেন, কখন খাওয়ানো বিপজ্জনক

হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পানি দেওয়া নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি থাকে। চিকিৎসকদের মতে, যদি রোগী সম্পূর্ণ সচেতন থাকেন, স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারেন এবং গিলতে কোনো সমস্যা না থাকে, তাহলে ধীরে ধীরে ঠান্ডা (বরফ-ঠান্ডা নয়) পানি বা ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন (ওআরএস) দেওয়া যেতে পারে।

 

কিন্তু যদি রোগী বিভ্রান্ত থাকেন, অজ্ঞান হয়ে যান, খিঁচুনি হয় অথবা গিলতে সমস্যা হয়, তাহলে মুখে কোনো খাবার বা পানি দেওয়া উচিত নয়। এতে শ্বাসনালিতে পানি ঢুকে আরও বড় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অবস্থায় দ্রুত জরুরি চিকিৎসা নিশ্চিত করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

 

হার্ট অ্যাটাকের সন্দেহ হলে কী করবেন

হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানে একটি প্রচলিত কথা রয়েছে-"Time is Muscle." অর্থাৎ যত দ্রুত চিকিৎসা শুরু হবে, তত বেশি হৃদপেশী বাঁচানো সম্ভব হবে। যদি কোনো ব্যক্তি বুকের মাঝখানে চাপ, তীব্র ব্যথা, শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, বমি বমি ভাব বা ব্যথা হাত, ঘাড়, চোয়াল কিংবা পিঠে ছড়িয়ে পড়ার মতো লক্ষণ অনুভব করেন, তাহলে এটিকে হার্ট অ্যাটাক হিসেবে বিবেচনা করে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।

 

রোগীকে বসিয়ে বা আধা শোয়া অবস্থায় বিশ্রাম দিতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব অ্যাম্বুলেন্স বা জরুরি চিকিৎসা সেবা ডাকতে হবে। নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পরিবর্তে অন্য কারও সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।

 

American Heart Association বলছে, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই অনেক রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

কোন ভুলগুলো কখনোই করবেন না

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিট স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক-দুই ক্ষেত্রেই কিছু ভুল পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে। অনেকেই রোগীকে জোর করে হাঁটানোর চেষ্টা করেন বা বলেন, "কিছুক্ষণ বসে থাকলে ঠিক হয়ে যাবে।" এটি মারাত্মক ভুল হতে পারে। অসুস্থ ব্যক্তিকে বিশ্রামে রাখতে হবে এবং তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

 

আবার অনেকেই মনে করেন, বুকে ব্যথা মানেই গ্যাসের সমস্যা। ফলে অ্যান্টাসিড বা সাধারণ ওষুধ খেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেন। এতে হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা শুরু হতে দেরি হয় এবং হৃদপেশীর স্থায়ী ক্ষতি বেড়ে যায়।

 

হিট স্ট্রোকের ক্ষেত্রেও অনেকেই রোগীকে গরম চা বা কফি খাওয়ানোর চেষ্টা করেন, যা একেবারেই ঠিক নয়। একইভাবে অচেতন ব্যক্তির মুখে পানি ঢেলে দেওয়াও অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

 

চিকিৎসকদের মতে, কোনো অবস্থাতেই অচেতন বা বিভ্রান্ত রোগীকে জোর করে কিছু খাওয়ানো উচিত নয়।

 

কখন জরুরি অ্যাম্বুলেন্স ডাকবেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও অপেক্ষা করা উচিত নয়।

 

যদি রোগী অজ্ঞান হয়ে যান, খিঁচুনি শুরু হয়, বারবার বমি করেন, স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে না পারেন, শ্বাস নিতে কষ্ট হয় অথবা শরীরের তাপমাত্রা অত্যন্ত বেশি থাকে, তাহলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকতে হবে। একইভাবে পাঁচ মিনিটের বেশি সময় ধরে বুকে চাপ বা ব্যথা থাকলে, ব্যথা শরীরের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়লে, শ্বাসকষ্ট বাড়লে অথবা রোগী হঠাৎ অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়লে এটিকেও জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেকেই লক্ষণ কমে যাওয়ার অপেক্ষা করেন। কিন্তু হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা অনেক সময় কিছুটা কমে আবার বাড়তে পারে। তাই ব্যথা কমে গেলেও চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিশ্চিন্ত হওয়া উচিত নয়।

 

হাসপাতালে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়

হিট স্ট্রোক নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকেরা প্রথমেই রোগীর শরীরের তাপমাত্রা দ্রুত কমানোর চেষ্টা করেন। এ জন্য বিশেষ কুলিং ব্ল্যাঙ্কেট, ঠান্ডা স্যালাইন, বরফ, ঠান্ডা পানির স্পঞ্জিং বা অন্যান্য উন্নত পদ্ধতি ব্যবহার করা হতে পারে। পাশাপাশি রক্তচাপ, অক্সিজেনের মাত্রা, হৃদস্পন্দন এবং কিডনির কার্যকারিতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়।

 

অন্যদিকে হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত ইসিজি, রক্ত পরীক্ষা এবং প্রয়োজনে এনজিওগ্রাম করা হয়। রক্ত জমাট ভাঙার ওষুধ, রক্ত পাতলা করার ওষুধ অথবা প্রয়োজনে এনজিওপ্লাস্টি করে বন্ধ ধমনি খুলে দেওয়া হয়।

 

চিকিৎসকদের মতে, যত দ্রুত এই চিকিৎসা শুরু করা যায়, রোগীর সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তত বেশি থাকে।

 

গরমে যেসব ওষুধ খাওয়া মানুষদের বাড়তি সতর্ক থাকা দরকার

চিকিৎসকদের মতে, কিছু ওষুধ শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কিছু ওষুধ, ডাইইউরেটিক (যা শরীর থেকে পানি বের করে দেয়), কিছু মানসিক রোগের ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন এবং কিছু স্নায়ুবিষয়ক ওষুধ গ্রহণকারীদের গরমে পানিশূন্যতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

 

তবে বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কোনো ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা যাবে না। বরং গরমের সময় কীভাবে নিরাপদে ওষুধ চালিয়ে যেতে হবে, সে বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে কেন বাড়তি সতর্কতা জরুরি

শিশুদের শরীর এখনও পুরোপুরি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে দক্ষ নয়। অন্যদিকে বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঘাম কম হয় এবং তৃষ্ণাও অনেক সময় কম অনুভূত হয়। ফলে দুই বয়সী মানুষের শরীরেই খুব দ্রুত পানিশূন্যতা এবং হিট স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কখনোই শিশু বা বয়স্ক কাউকে পার্ক করা গাড়ির ভেতরে রেখে যাওয়া উচিত নয়। গাড়ির ভেতরের তাপমাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

 

তীব্র গরমে কীভাবে হিট স্ট্রোক ও হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব

চিকিৎসকদের মতে, হিট স্ট্রোক এবং গরমজনিত হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি অনেকাংশেই প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি সময়মতো সতর্কতা অবলম্বন করা যায়। বিশেষ করে তাপমাত্রা যখন অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায় বা আবহাওয়া অধিদপ্তর তাপপ্রবাহের সতর্কতা জারি করে, তখন দৈনন্দিন জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি।

 

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) বলছে, গরমের সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘক্ষণ রোদে অবস্থান না করাই সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা। সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে সূর্যের তাপ সবচেয়ে বেশি থাকে। তাই এই সময়ে বাইরে কাজ বা ভারী শারীরিক পরিশ্রম এড়িয়ে চলা উচিত। যদি বাইরে যেতেই হয়, তাহলে নিয়মিত বিরতি নিয়ে ছায়াযুক্ত স্থানে বিশ্রাম নেওয়া প্রয়োজন।

 

চিকিৎসকদের মতে, শরীরের তাপমাত্রা বাড়তে শুরু করলে অনেক সময় মানুষ তা বুঝতে পারেন না। তাই তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে নিয়মিত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ। যারা বাইরে কাজ করেন বা অতিরিক্ত ঘামেন, তাদের ক্ষেত্রে পানি ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্য বজায় রাখাও জরুরি।

 

American Heart Association-এর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যাদের আগে থেকেই হৃদ্‌রোগ রয়েছে, তাদের জন্য অতিরিক্ত গরম বিশেষ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এই সময় হৃদযন্ত্রকে শরীর ঠান্ডা রাখতে স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি কাজ করতে হয়। তাই হৃদ্‌রোগীদের গরমের সময় অতিরিক্ত পরিশ্রম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

 

শরীরকে ঠান্ডা রাখতে কী করবেন

বিশেষজ্ঞদের মতে, গরমের সময় হালকা রঙের, ঢিলেঢালা এবং সুতি কাপড় পরা সবচেয়ে ভালো। এতে শরীরের তাপ সহজে বেরিয়ে যেতে পারে এবং ঘাম দ্রুত শুকিয়ে যায়। বাইরে বের হলে ছাতা, টুপি বা ক্যাপ ব্যবহার করা উপকারী। সরাসরি সূর্যের আলো থেকে মাথা ও ঘাড় রক্ষা করলে শরীরের ওপর তাপের প্রভাব কিছুটা কমে।

 

যদি ঘরে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকে, তাহলে জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা, ফ্যান ব্যবহার করা এবং দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে ঘরের ঠান্ডা অংশে অবস্থান করার পরামর্শ দেন চিকিৎসকেরা।

 

গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে অনেকেই বরফ-ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করেন। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত গরম শরীরে হঠাৎ খুব ঠান্ডা পানি ব্যবহার না করে স্বাভাবিক বা ঠান্ডা পানিতে ধীরে ধীরে শরীর ঠান্ডা করাই বেশি নিরাপদ।

 

শুধু পানি নয়, শরীরের লবণ ও খনিজের ভারসাম্যও গুরুত্বপূর্ণ

গরমে অতিরিক্ত ঘামের মাধ্যমে শরীর থেকে শুধু পানি নয়, সোডিয়াম, পটাশিয়ামসহ গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রোলাইটও বেরিয়ে যায়। দীর্ঘ সময় বাইরে কাজ করা, খেলাধুলা করা বা কঠোর পরিশ্রমের ফলে এই ক্ষতি আরও বেড়ে যেতে পারে।

 

চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ মানুষের জন্য পরিষ্কার ও নিরাপদ পানি পান করাই যথেষ্ট। তবে দীর্ঘ সময় ঘাম হলে ওরাল রিহাইড্রেশন সল্যুশন (ওআরএস) বা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইলেকট্রোলাইটযুক্ত পানীয় উপকারী হতে পারে।

 

একই সঙ্গে তরমুজ, বাঙ্গি, শসা, ডাবের পানি, কমলা, মাল্টা এবং অন্যান্য পানি-সমৃদ্ধ ফল শরীরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখতে সহায়তা করতে পারে। তবে কিডনি রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা থাকলে অতিরিক্ত তরল গ্রহণের আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

 

কোন খাবার গরমে উপকারী, কোনগুলো এড়িয়ে চলবেন

পুষ্টিবিদদের মতে, তাপপ্রবাহের সময় হালকা, সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া উচিত। অতিরিক্ত তেল-মসলা, ভাজাপোড়া এবং খুব ভারী খাবার শরীরের বিপাকীয় চাপ বাড়াতে পারে। মৌসুমি ফল, শাকসবজি, ডাল, দই এবং পর্যাপ্ত তরলসমৃদ্ধ খাবার শরীরকে সুস্থ রাখতে সাহায্য করে। অতিরিক্ত চিনি-যুক্ত কোমল পানীয়, অতিরিক্ত ক্যাফেইন এবং অ্যালকোহল শরীরের পানিশূন্যতা বাড়াতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেন।

 

গরমে খাবার দ্রুত নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তাই দীর্ঘ সময় বাইরে রাখা রান্না করা খাবার খাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত এবং নিরাপদ খাদ্যাভ্যাস মেনে চলা জরুরি।

 

বাইরে কাজ করা মানুষদের জন্য বিশেষ সতর্কতা

বাংলাদেশের মতো দেশে নির্মাণশ্রমিক, কৃষক, ট্রাফিক পুলিশ, রিকশাচালক, পরিবহনকর্মী, ডেলিভারি কর্মী এবং অন্যান্য খোলা পরিবেশে কর্মরত মানুষ তাপপ্রবাহের সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও দায়িত্ব রয়েছে কর্মীদের জন্য বিশ্রামের সময় নির্ধারণ করা, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা এবং অতিরিক্ত গরমের সময় কাজের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা।

 

দীর্ঘ সময় একটানা রোদে কাজ না করে নির্দিষ্ট বিরতিতে ছায়ায় বিশ্রাম নেওয়া, ভেজা তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছে নেওয়া এবং অসুস্থ বোধ করলে সঙ্গে সঙ্গে কাজ বন্ধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

 

শিশু, বয়স্ক ও গর্ভবতী নারীদের জন্য আলাদা সতর্কতা

শিশুরা দ্রুত পানিশূন্যতায় ভুগতে পারে এবং অনেক সময় নিজের অসুস্থতার কথা ঠিকভাবে বলতে পারে না। তাই অভিভাবকদের তাদের শরীরের তাপমাত্রা, আচরণ, পানি পান এবং প্রস্রাবের পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা উচিত। বয়স্কদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণার অনুভূতি কমে যেতে পারে। ফলে তারা বুঝতেই পারেন না যে শরীরে পানির ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আবার অনেক বয়স্ক ব্যক্তি একাধিক ওষুধ সেবন করেন, যার কিছু গরমে শরীরের প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করতে পারে।

 

গর্ভবতী নারীদের শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকে। তাই তাপপ্রবাহের সময় তাদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম, তরল গ্রহণ এবং অতিরিক্ত গরম এড়িয়ে চলা জরুরি।

 

কখন চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে

চিকিৎসকদের মতে, গরমের সময় মাথা ঘোরা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা, বিভ্রান্তি, শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়া, অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনি দেখা দিলে এটিকে জরুরি অবস্থা হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। একইভাবে বুকে ব্যথা, বুকে চাপ, শ্বাসকষ্ট, ব্যথা হাত বা চোয়ালে ছড়িয়ে পড়া, ঠান্ডা ঘাম, হঠাৎ দুর্বলতা বা অস্বাভাবিক ক্লান্তি দেখা দিলে হার্ট অ্যাটাকের সম্ভাবনা ধরে নিয়ে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক মানুষ ব্যথা কমে যাওয়ার অপেক্ষা করেন অথবা নিজেরাই ওষুধ খেয়ে সময় নষ্ট করেন। এই ভুলের কারণে মূল্যবান সময় নষ্ট হয় এবং জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

 

সচেতনতাই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা

WHO, CDC, American Heart Association, Mayo Clinic, Cleveland Clinic এবং NHS–এর চিকিৎসা নির্দেশনা একটি বিষয়েই একমত-হিট স্ট্রোক এবং হার্ট অ্যাটাক দুটিই জরুরি চিকিৎসা পরিস্থিতি। তবে সময়মতো লক্ষণ চিনে দ্রুত ব্যবস্থা নিলে অসংখ্য প্রাণ বাঁচানো সম্ভব।

 

চিকিৎসকদের মতে, সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো দুটি অবস্থার মৌলিক পার্থক্য জানা। হিট স্ট্রোকে শরীরের তাপমাত্রা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে যায় এবং দ্রুত শরীর ঠান্ডা করা জরুরি। অন্যদিকে হার্ট অ্যাটাকে মূল সমস্যা হলো হৃদ্‌পেশীতে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়া, যেখানে দ্রুত হাসপাতালের চিকিৎসাই জীবন বাঁচানোর প্রধান উপায়।

 

বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে। তাই গরমকে আর সাধারণ মৌসুমি অস্বস্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু। ব্যক্তি, পরিবার, কর্মস্থল এবং রাষ্ট্র-সব পর্যায়েই সচেতনতা বাড়ানো, নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জরুরি চিকিৎসা সম্পর্কে সাধারণ মানুষকে জানানো সময়ের দাবি।

 

সবশেষে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, তীব্র গরমে শরীরের অস্বাভাবিক কোনো লক্ষণকে কখনোই অবহেলা করবেন না। হিট স্ট্রোক হোক বা হার্ট অ্যাটাক-দুই ক্ষেত্রেই দ্রুত সিদ্ধান্ত, সঠিক প্রাথমিক পদক্ষেপ এবং যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসা গ্রহণই জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।


সম্পর্কিত নিউজ