{{ news.section.title }}
ফার্মের মুরগি খাওয়া কতটা নিরাপদ? জেনে নিন পুষ্টিগুণ, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপদে খাওয়ার সঠিক নিয়ম
বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারের খাবারের তালিকায় নিয়মিত স্থান করে নিয়েছে ফার্মের মুরগি বা ব্রয়লার। তুলনামূলক কম দাম, সহজলভ্যতা এবং উচ্চমাত্রার প্রোটিনের কারণে এটি বর্তমানে সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রাণিজ খাদ্যের অন্যতম। তবে এই জনপ্রিয়তার পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরেই একটি প্রশ্ন ঘুরে ফিরে আসে, ফার্মের মুরগি খাওয়া কি সত্যিই স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর?
এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের দাবি ও বিভ্রান্তিকর তথ্যও ছড়িয়ে পড়ে। কেউ বলেন ব্রয়লার মুরগিতে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক থাকে, আবার কেউ দাবি করেন এতে হরমোন ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে পুষ্টিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফার্মের মুরগি নিরাপদ কি না, তা নির্ভর করে এর উৎপাদন ব্যবস্থা, খাদ্য, ওষুধের ব্যবহার, সংরক্ষণ, বাজারজাতকরণ এবং রান্নার পদ্ধতির ওপর। সঠিকভাবে উৎপাদিত ও রান্না করা ব্রয়লার মুরগি সাধারণত নিরাপদ এবং এটি শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস হতে পারে।
ফার্মের মুরগির সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি
অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, পশুপাখির খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিশ্বব্যাপী উদ্বেগের বিষয়। কিছু খামারে রোগ প্রতিরোধ বা চিকিৎসার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয়। কিন্তু নির্ধারিত নিয়ম না মেনে ওষুধ ব্যবহার করা হলে এবং জবাইয়ের আগে প্রয়োজনীয় 'Withdrawal Period' অনুসরণ না করলে মাংসে ওষুধের অবশিষ্টাংশ থেকে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে এমন মাংস খাওয়া অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এর ফলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসাও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
অস্বাস্থ্যকর খামার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা
মুরগির মাংসের নিরাপত্তা শুধু খামারের ওপর নয়, জবাই, পরিবহন ও সংরক্ষণের ওপরও নির্ভর করে। স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ না করলে সালমোনেলা, ক্যাম্পিলোব্যাক্টর এবং অন্যান্য খাদ্যবাহিত জীবাণু মাংসে থাকতে পারে। অপর্যাপ্ত তাপমাত্রায় সংরক্ষণ বা আধা-সেদ্ধ অবস্থায় খাওয়ার কারণে খাদ্যবাহিত অসুস্থতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
নিম্নমানের খাদ্যের ব্যবহার
বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালিত খামারে সুষম ও মানসম্মত খাদ্য ব্যবহার করা হলেও কিছু অনিয়ন্ত্রিত খামারে নিম্নমানের বা দূষিত খাদ্য ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। এতে মুরগির স্বাস্থ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি মাংসের গুণগত মানও কমে যেতে পারে।
হরমোন নিয়ে প্রচলিত ধারণা
অনেকেই মনে করেন ব্রয়লার মুরগিকে দ্রুত বড় করতে নিয়মিত হরমোন ব্যবহার করা হয়। তবে আন্তর্জাতিক গবেষণা এবং বিভিন্ন খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, বাণিজ্যিক ব্রয়লার উৎপাদনে হরমোন ব্যবহার সাধারণ নিয়ম নয়। আধুনিক ব্রয়লার অল্প সময়ে বড় হয় মূলত উন্নত জাত, সুষম খাদ্য, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘদিনের নির্বাচিত প্রজনন প্রযুক্তির কারণে।
ফার্মের মুরগির পুষ্টিগুণ
সঠিকভাবে উৎপাদিত ব্রয়লার মুরগি উচ্চমানের লিন প্রোটিনের অন্যতম ভালো উৎস। শরীরের পেশি গঠন, কোষ মেরামত এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে এই প্রোটিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এছাড়া এতে রয়েছে,
- উচ্চমানের সম্পূর্ণ প্রোটিন
- ভিটামিন বি-১২
- ভিটামিন বি-৬
- নিয়াসিন
- সেলেনিয়াম
- ফসফরাস
- জিঙ্কসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উপাদান
চামড়া ছাড়া ব্রয়লার মুরগির মাংসে তুলনামূলক কম চর্বি থাকে। তাই পরিমিত পরিমাণে গ্রহণ করলে এটি একটি স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের অংশ হতে পারে।
দেশি ও ফার্মের মুরগির মধ্যে পার্থক্য
দেশি মুরগি সাধারণত ধীরে বেড়ে ওঠে এবং খোলা পরিবেশে বিচরণ করে। এর মাংস তুলনামূলক শক্ত এবং স্বাদে কিছুটা ভিন্ন। অন্যদিকে ব্রয়লার মুরগি দ্রুত বেড়ে ওঠে এবং পরিকল্পিত খামারে পালন করা হয়। পুষ্টিগুণের দিক থেকে উভয় ধরনের মুরগিই ভালো প্রোটিনের উৎস। তবে খাদ্য, পালন পদ্ধতি এবং মাংসের চর্বির পরিমাণে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
কীভাবে নিরাপদে খাবেন?
স্বাস্থ্যঝুঁকি কমাতে বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি বিষয় অনুসরণ করার পরামর্শ দেন।
প্রথমত, সবসময় বিশ্বস্ত ও পরিচ্ছন্ন বিক্রেতার কাছ থেকে মুরগি কিনুন। সম্ভব হলে মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা প্রতিষ্ঠানের পণ্য বেছে নিন।
দ্বিতীয়ত, কাঁচা মুরগির মাংস আলাদা পাত্রে সংরক্ষণ করুন এবং অন্য খাবারের সঙ্গে যেন সংস্পর্শ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখুন।
তৃতীয়ত, রান্নার আগে ও পরে হাত, ছুরি, কাটিং বোর্ড এবং রান্নাঘরের অন্যান্য সরঞ্জাম ভালোভাবে পরিষ্কার করুন।
চতুর্থত, মুরগির মাংস সম্পূর্ণ সেদ্ধ হওয়া পর্যন্ত রান্না করুন। সাধারণভাবে মাংসের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা ৭৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে অধিকাংশ ক্ষতিকর জীবাণু ধ্বংস হয়ে যায়।
সবশেষে, প্রতিদিন শুধুমাত্র ব্রয়লার মুরগির ওপর নির্ভর না করে মাছ, ডিম, ডাল, বাদাম এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর প্রোটিনের উৎস খাদ্যতালিকায় রাখুন।
বিশেষজ্ঞদের চূড়ান্ত মতামত
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফার্মের মুরগি নিজেই ক্ষতিকর নয়। বরং এটি সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চমানের প্রোটিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে অনিয়ন্ত্রিতভাবে উৎপাদিত, স্বাস্থ্যবিধি না মেনে সংরক্ষণ করা বা সঠিকভাবে রান্না না করা মুরগির মাংস স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
তাই বাজার থেকে কেনার সময় পণ্যের মান, উৎপাদনের উৎস এবং বিক্রেতার পরিচ্ছন্নতার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য প্রস্তুত ও সুষম খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করলে ফার্মের মুরগি একজন সুস্থ মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকার নিরাপদ ও পুষ্টিকর অংশ হতে পারে।