হাম উপসর্গে আরো ৫ শিশুর মৃত্যু

হাম উপসর্গে আরো ৫ শিশুর মৃত্যু
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। গত ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ৯৬৯ জনের শরীরে হাম বা এর উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। ফলে চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি শুরু হওয়া এই প্রাদুর্ভাবে মৃত্যু ও আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেড়েছে।

রোববার (১২ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত হামবিষয়ক নিয়মিত প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।

 

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দিনে হামের উপসর্গ নিয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হওয়ার পর আরও একজন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। সব মিলিয়ে গত ১৫ মার্চ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে মোট ৭৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। অধিকাংশ মৃতই শিশু, যা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

 

একই সময়ে পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন করে ৯০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। পাশাপাশি আরও ৮৭৯ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। অর্থাৎ গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৯৬৯ জন নতুন রোগী শনাক্ত বা উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসার আওতায় এসেছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে মোট ১ লাখ ১১ হাজার ৪৮০ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে পরীক্ষায় ১৩ হাজার ৫০০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছে। যদিও উপসর্গ নিয়ে আক্রান্তের প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

 

হাসপাতালভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, একই সময়ের মধ্যে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৯৪ হাজার ৩৪০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে চিকিৎসা শেষে ৯০ হাজার ৬০৫ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে এখনো দেশের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে কয়েক হাজার রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শিশু রোগীদের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেক হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে।

 

চিকিৎসকদের মতে, হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে এটি খুব সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। প্রথমে জ্বর, কাশি, সর্দি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে সারা শরীরে লালচে দানা দেখা দেয়। সময়মতো চিকিৎসা না হলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, মস্তিষ্কে সংক্রমণসহ নানা জটিলতা তৈরি হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা এবং পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বাদ পড়ে যাওয়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনা না গেলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং সংস্পর্শে আসা অন্য শিশুদের পর্যবেক্ষণে রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা।

 

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে, শিশুদের নির্ধারিত সময়েই হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিশুর জ্বরের সঙ্গে শরীরে লালচে দানা, কাশি, চোখ লাল হওয়া বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। নিজে নিজে ওষুধ সেবন বা চিকিৎসা বিলম্বিত করলে জটিলতা বাড়তে পারে।

 

স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্টরা আরও বলছেন, সংক্রমণ রোধে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা রাখা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখা, পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাবার খাওয়ানো এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ভিটামিন 'এ' সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

 

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলায় নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। আক্রান্ত এলাকার তথ্য সংগ্রহ, সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত, নমুনা পরীক্ষা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে টিকাদান কার্যক্রমের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগও অব্যাহত রয়েছে।

 

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। বর্তমান পরিস্থিতিতে শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো ধরনের অবহেলা না করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।


সম্পর্কিত নিউজ