ভারতে মুসলিম নারীদের টার্গেট করে অশ্লীল কনটেন্টের ছড়াছড়ি

ভারতে মুসলিম নারীদের টার্গেট করে অশ্লীল কনটেন্টের ছড়াছড়ি
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের ফ্রিল্যান্স মডেল সামরিন আইয়ুব প্রথম ভিডিওটি দেখে হতবাক হয়ে যান। গত বছর মোবাইল ফোনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্রাউজ করার সময় তার এক বন্ধু একটি ভিডিও ক্লিপ পাঠান। ভিডিওটি তখন দ্রুত ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে পড়ছিল এবং হাজারো মানুষের নজর কাড়ছিল।

প্রথম দেখায় ভিডিওটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল, যেন সেটি সামরিনের ব্যক্তিগত জীবনের বাস্তব গল্প তুলে ধরছে। সেখানে ছিল সংবাদ প্রতিবেদনধর্মী উপস্থাপনা, স্ক্রলিং ক্যাপশন, নাটকীয় শিরোনাম এবং একটি বর্ণনাকারীর কণ্ঠ। কিন্তু পুরো ভিডিওটিই ছিল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা মিথ্যা ও বানোয়াট কনটেন্ট।

 

২৪ বছর বয়সী সামরিন বলেন, “এটি ছিল এক ধরনের সাইবার হ্যারাসমেন্ট। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সেমিস্টার থেকে শেষ সেমিস্টার পর্যন্ত আমার পুরো জীবন যেন অনুসরণ করা হয়েছে।”

 

ভিডিওটিতে নয়াদিল্লির জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালের বিভিন্ন ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল। এসব ছবির মধ্যে ছিল গ্রুপ প্রজেক্ট, বিদায়ী অনুষ্ঠান, ক্যাম্পাসের সাধারণ মুহূর্ত এবং সহপাঠীদের সঙ্গে তোলা ব্যক্তিগত সেলফি।

 

এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি ভয়েসওভারে দাবি করা হয়, একজন মুসলিম নারী হিসেবে সামরিন হিন্দু পুরুষদের কাছে নিজের শরীর বিক্রি করছেন। শুধু তাই নয়, ছবিতে থাকা ব্যক্তিদের ভুল পরিচয়ে উপস্থাপন করা হয় এবং তার আপন ভাইকে ‘দালাল’ হিসেবে দেখানো হয়।

 

সামরিনের ভাষায়, “ভিডিওটি এতটাই বাস্তব মনে হচ্ছিল যে আমার বাবা-মাও যদি এটি দেখতেন, তাহলে সম্ভবত সত্যি বলে বিশ্বাস করতেন।”

 

গবেষকদের মতে, সামরিন এমন বহু মুসলিম নারীর একজন, যারা বর্তমানে এআই-নির্ভর যৌন হয়রানি ও রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডার শিকার হচ্ছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি যৌনতাপূর্ণ ছবি, ভুয়া ভিডিও এবং অপপ্রচারমূলক কনটেন্ট ক্রমেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।

 

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এই ধরনের ঘটনার শিকার হওয়া আরও কয়েকজন মুসলিম নারীর সঙ্গে কথা বললেও অধিকাংশই সামাজিক লজ্জা, মানসিক আঘাত ও নিরাপত্তাজনিত আশঙ্কার কারণে প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

 

যৌন কল্পনাকে দৃশ্যমান অস্ত্রে রূপান্তর

মুসলিম নারীদের যৌনতাপূর্ণ উপস্থাপনার এই প্রবণতা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন ভারত বিশ্বব্যাপী এআই নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামো নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলতি বছরের শুরুতে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় উচ্চপর্যায়ের এআই ইমপ্যাক্ট সামিট।

 

ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট (সিএসওএইচ) ২০২৩ সালের মে থেকে ২০২৪ সালের মে পর্যন্ত এক্স, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ২৯৭টি পাবলিক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত ১ হাজার ৩২৬টি এআই-নির্মিত ছবি ও ভিডিও বিশ্লেষণ করেছে।

 

গবেষণায় দেখা যায়, মুসলিম নারীদের যৌনতাপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা কনটেন্টগুলোই সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছে। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে এসব কনটেন্টে ৬৭ লাখেরও বেশি প্রতিক্রিয়া নথিভুক্ত হয়েছে।

 

গবেষণার সহ-লেখক এবং সিএসওএইচের ডিজিটাল গবেষণা বিশ্লেষক জেনিথ খান বলেন, “জেনারেটিভ এআই যৌন কল্পনাকে খুব দ্রুত এবং প্রায় বিনা খরচে দৃশ্যমান ছবিতে রূপান্তর করা সম্ভব করেছে। ডিপফেক ও ইমেজ জেনারেশন প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিদ্বেষমূলক বয়ানকে বাস্তবসম্মত কনটেন্টে রূপ দেওয়া এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ।”

 

মুম্বাইভিত্তিক রাটি ফাউন্ডেশন পরিচালিত অনলাইন নিরাপত্তা হেল্পলাইন ‘মেরি ট্রাস্টলাইন’ও একই প্রবণতা পর্যবেক্ষণ করছে। সংস্থাটির ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেবল সেলিব্রিটি বা রাজনীতিবিদ নন, জনপরিসরে অপরিচিত সাধারণ নারীরাও এআই-নির্মিত কনটেন্টের শিকার হচ্ছেন।

 

২০২২ সালে কার্যক্রম শুরুর পর থেকে মেরি ট্রাস্টলাইন ৪৮২টিরও বেশি অভিযোগ নিয়ে কাজ করেছে। এর প্রায় ১০ শতাংশই ছিল ডিজিটালি বিকৃত ছবি ও ভিডিও সংক্রান্ত। সংস্থাটির পরামর্শক সালমান মুজাওয়ার বলেন, “লজ্জা, ভয় এবং মানসিক আঘাতের কারণে অধিকাংশ ঘটনা প্রকাশই পায় না।”

 

রাজনৈতিক অশ্লীলতার নতুন রূপ

ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর সামরিনের জীবনে শুরু হয় চরম দুর্ভোগ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে কনটেন্টটি। এরপর শুরু হয় হুমকিমূলক ফোনকল, গালিগালাজ এবং চরিত্রহননের অপচেষ্টা।

 

তিনি বলেন, “এটা ছিল ডিজিটাল লিঞ্চিং। একাধিক অ্যাকাউন্ট ভিডিওটি ছড়িয়ে দিচ্ছিল এবং শত শত মানুষ তা শেয়ার করছিল।”

 

সিএসওএইচের তথ্যভান্ডারে এমন অসংখ্য এআই-নির্মিত ছবি রয়েছে যেখানে ধর্মীয় পোশাক পরিহিত মুসলিম নারীদের যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ অবস্থায় দেখানো হয়েছে। এমনকি নারী সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের লক্ষ্য করেও তৈরি করা হয়েছে ভুয়া পর্নোগ্রাফিক ছবি।

 

গবেষকেরা এসব কনটেন্টে একটি সাধারণ ধারা লক্ষ্য করেছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রে একজন ‘মুসলিম দেখতে নারী’কে একজন ‘হিন্দু দেখতে পুরুষ’-এর সঙ্গে উপস্থাপন করা হয়। মুসলিম পুরুষদের দেখানো হয় সহিংস বা নৈতিকভাবে অধঃপতিত হিসেবে, আর মুসলিম নারীদের উপস্থাপন করা হয় অনুগত কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের পুরুষদের মাধ্যমে ‘উদ্ধারপ্রাপ্ত’ ব্যক্তি হিসেবে।

 

মিউনিখের লুডভিগ ম্যাক্সিমিলিয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গণমাধ্যম নৃবিজ্ঞানী সাহানা উদুপা এই ঘটনাকে নারী ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বৃহত্তর রাজনৈতিক অশ্লীলতার অংশ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

 

তার মতে, “কট্টরপন্থি ডিজিটাল সংস্কৃতি নির্যাতনকে স্বাভাবিক করতে হাস্যরস, মিম এবং যৌনতাপূর্ণ কনটেন্ট ব্যবহার করে। এগুলো এমন একটি ইকোসিস্টেম তৈরি করে, যা দলগত আগ্রাসন ও অপমানকে উৎসাহিত করে।”

 

মুসলিম নারীর শরীর রাজনীতির যুদ্ধক্ষেত্র

গবেষক সোমা বসুর মতে, মুসলিম নারীদের শরীরকে সাম্প্রদায়িক আধিপত্যের প্রতীকী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করা হয়েছে। এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ ছিল ‘সুলি ডিলস’ এবং ‘বুলি বাই’ বিতর্ক, যেখানে মুসলিম নারীদের ছবি ব্যবহার করে তাদের ভুয়া অনলাইন নিলামে তোলা হয়েছিল।

 

জেনিথ খান বলেন, “দক্ষিণ এশিয়ার বহু সংস্কৃতিতে নারীকে পরিবারের সম্মানের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়। তাই মুসলিম নারীদের দৃশ্যমানভাবে অপমান করা মুসলিম সম্প্রদায়কে হেয় করার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।”

 

২০১৯ সালে ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার পর থেকে অনলাইন হয়রানির শিকার হয়ে আসছেন গবেষক ও অধিকারকর্মী আফরিন ফাতিমা। ‘সুলি ডিলস’-এ যাদের ছবি ব্যবহার করা হয়েছিল, তিনি ছিলেন তাদের একজন।

 

আফরিন বলেন, “প্রতি কয়েকদিন পরপরই কোনো না কোনো ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে ধর্ষণ বা হত্যার হুমকি আসে।”

 

এআই-নির্মিত যৌনতাপূর্ণ কনটেন্টের বিস্তার সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, “এসব ছবি নিয়ে পড়লে বিষয়টি খুব ব্যক্তিগত মনে হয়। এগুলো এক ধরনের ভয়-মনস্তত্ত্ব তৈরি করে।”

 

তার ভাষায়, “আমি একা ভ্রমণ করতে অস্বস্তি বোধ করি। যখন মুসলিম নারীদের নিয়ে এ ধরনের কল্পনা অনলাইনে ছড়িয়ে পড়তে দেখি, তখন মনে হয় বাস্তব জীবনেও কেউ হয়তো আমাকে আক্রমণ করতে পারে।”

 

‘আমি আর নিরাপদ বোধ করি না’

এই ঘটনার প্রভাব সামরিন আইয়ুবের পেশাগত জীবনেও পড়েছে। একজন ফ্রিল্যান্স মডেল হিসেবে তার সুনাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেতিবাচক মন্তব্য ও অপপ্রচারের কারণে বিভিন্ন ব্র্যান্ড তার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দেয়।

 

তিনি বলেন, “চার-পাঁচ মাস ধরে ভুয়া অ্যাকাউন্টগুলো আমার প্রোফাইলে অপমানজনক মন্তব্য করেছে। ফলে সম্ভাব্য ক্লায়েন্টরা দূরে সরে গেছে।”

 

একসময় যে ইনস্টাগ্রাম তার কাছে নিরাপদ ও স্বাভাবিক একটি প্ল্যাটফর্ম ছিল, এখন সেটি ভয়ের জায়গায় পরিণত হয়েছে। “কী পোস্ট করি, কীভাবে পোস্ট করি-সবকিছু সীমিত করে ফেলেছি,” বলেন তিনি।

 

সামরিন নয়াদিল্লির সাইবার অপরাধ দমন ইউনিটে লিখিত অভিযোগ দায়ের করলেও এখন পর্যন্ত তদন্তে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি হয়নি।

 

তার দাবি, বন্ধুদের সমন্বিত অভিযোগের পরই কেবল বেশিরভাগ আপত্তিকর কনটেন্ট সরানো হয়।

 

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান আইন এআই-নির্মিত কনটেন্টের দ্রুত বিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না। ইন্টারনেট ফ্রিডম ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও আইনজীবী অপার গুপ্তা বলেন, “ছবিটি ভুয়া হলেও এর ক্ষতি বাস্তব। অনেক ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ এআই-নির্মিত কনটেন্ট বর্তমান আইনের আওতায় স্পষ্টভাবে পড়ে না। কিন্তু তার প্রভাব ভুক্তভোগীর জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ক্ষত তৈরি করে।”

 

তিনি সতর্ক করে বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম, প্ল্যাটফর্মের নকশা এবং আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন না এলে এআই-নির্ভর হয়রানি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার প্রতিক্রিয়ার চেয়েও দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পড়বে।

 

সবশেষে সামরিন আইয়ুবের কণ্ঠে উঠে আসে একটি প্রশ্ন-“আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, ওই অ্যাকাউন্টগুলোর পেছনে কারা আছে। তারা আমাকে না চিনেই আমার সুনাম ধ্বংস করে দিয়েছে।”


সম্পর্কিত নিউজ