মুকেশ আম্বানিকে পেছনে ফেলে আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি

মুকেশ আম্বানিকে পেছনে ফেলে আবারও এশিয়ার শীর্ষ ধনী গৌতম আদানি
ছবির ক্যাপশান, গৌতম আদানি | ছবি: সংগৃহীত

ভারতের শিল্পগোষ্ঠী আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রতিষ্ঠাতা গৌতম আদানি আবারও এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির স্থান দখল করেছেন। আদানি গ্রুপের বিভিন্ন তালিকাভুক্ত কোম্পানির শেয়ারের দামে বড় উত্থানের ফলে মাত্র একদিনের ব্যবধানে তার সম্পদ প্রায় ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে তিনি ভারতের আরেক শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানি এবং জাপানের প্রযুক্তি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান সফটব্যাংক গ্রুপ-এর প্রতিষ্ঠাতা মাসায়োশি সন-কে ছাড়িয়ে এশিয়ার ধনীদের তালিকার শীর্ষে উঠে এসেছেন।

মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস-এর রিয়েল-টাইম বিলিয়নিয়ার্স সূচক অনুযায়ী, বর্তমানে গৌতম আদানির মোট সম্পদের পরিমাণ ৮ হাজার ৯২০ কোটি মার্কিন ডলার। একই সময়ে মুকেশ আম্বানির সম্পদ ৮ হাজার ৮০০ কোটি ডলার এবং মাসায়োশি সনের সম্পদ প্রায় ৮ হাজার ৭০০ কোটি ডলার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

আদানির সম্পদ বৃদ্ধির প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে তার মালিকানাধীন বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ারের দাম বৃদ্ধিকে। বিশেষ করে আদানি গ্রিন এনার্জি-এর শেয়ারের দাম একদিনেই ৬ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া আদানি এন্টারপ্রাইজেস, আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন, আদানি পাওয়ার এবং আদানি এনার্জি সলিউশন্স-এর শেয়ারেও উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গেছে।

 

ফোর্বসের তথ্য অনুযায়ী, আদানি গ্রুপের ছয়টি প্রধান তালিকাভুক্ত প্রতিষ্ঠানের সম্মিলিত বাজারমূল্য বর্তমানে প্রায় ১৯১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান হিসেবে রয়েছে আদানি পাওয়ার, যার বাজারমূল্য প্রায় ৪৭ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। প্রতিষ্ঠানটি ভারতের ঝাড়খণ্ডে অবস্থিত ১ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিচালনা করে এবং বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে থাকে।

 

বিতর্ক থেকে প্রত্যাবর্তন

গৌতম আদানির এই প্রত্যাবর্তন বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে কারণ গত কয়েক বছরে তার ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য একাধিক বড় বিতর্কের মুখোমুখি হয়েছিল। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক শর্ট-সেলার প্রতিষ্ঠান হিন্ডেনবার্গ রিসার্চ আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে শেয়ারবাজারে কারসাজি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তোলে। সে সময় আদানি গ্রুপের বাজারমূল্যে বড় ধস নামে এবং তার ব্যক্তিগত সম্পদও ব্যাপকভাবে কমে যায়। তবে ভারতের বাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা অভিযোগগুলো তদন্ত করে পরে সেগুলোকে প্রমাণিত নয় বলে জানায়।

 

এরপর ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো আদানি গ্রুপের বিরুদ্ধে একটি কথিত ২৫০ মিলিয়ন ডলারের ঘুষ কেলেঙ্কারির অভিযোগ আনে। অভিযোগ ছিল, ভারতে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের চুক্তি পেতে সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দেওয়ার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল এবং এ তথ্য গোপন রেখে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছিল। আদানি এবং তার সহযোগীরা শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

 

ফোর্বসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে আইনি চাপ কিছুটা কমে আসা এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরে পাওয়ার ফলে আদানি গ্রুপের শেয়ারগুলোতে নতুন করে গতি এসেছে। শুধু গত মাস থেকেই আদানির সম্পদ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে।

 

অবকাঠামো, জ্বালানি ও প্রযুক্তিতে বিস্তার

বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্যাস, সিমেন্ট এবং ডিজিটাল অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে আদানি গ্রুপের বিস্তৃতি রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডেটা সেন্টার এবং সবুজ জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির পরিকল্পনাও নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের অবকাঠামো ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনাকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীরা আবারও আদানি গ্রুপের প্রতি আস্থা দেখাচ্ছেন।

 

সব মিলিয়ে আইনি বিতর্ক, বাজারের ধাক্কা এবং রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকার পরও শেয়ারবাজারে শক্তিশালী প্রত্যাবর্তনের মাধ্যমে গৌতম আদানি আবারও এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তির আসনে ফিরেছেন। তবে বৈশ্বিক বাজার পরিস্থিতি এবং চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কারণে এই অবস্থান কতটা স্থায়ী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা কঠিন।


সম্পর্কিত নিউজ