কলকাতার বাসে ত্রিপুরার তরুণীকে ‘বাংলাদেশি’ বলে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দার ঝড়

কলকাতার বাসে ত্রিপুরার তরুণীকে ‘বাংলাদেশি’ বলে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দার ঝড়
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

কলকাতার একটি চলন্ত বাসে ত্রিপুরার এক তরুণীকে ‘বাংলাদেশি’ বলে কটাক্ষ ও হেনস্তার অভিযোগকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরাজুড়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘটনার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিভিন্ন মহল এ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তুলেছে।

জানা গেছে, কর্মসূত্রে কয়েক বছর ধরে কলকাতায় বসবাস করছেন ত্রিপুরার ওই তরুণী। সম্প্রতি তিনি শহরের একটি গণপরিবহনে যাত্রা করার সময় নিজের পরিচিতজনের সঙ্গে ত্রিপুরার আঞ্চলিক টানে বাংলা ভাষায় কথা বলছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তার কথাবার্তা শুনে বাসের কয়েকজন যাত্রী তাকে ‘বাংলাদেশি’ বলে মন্তব্য করতে শুরু করেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি বিব্রতকর হয়ে উঠলে তিনি এর প্রতিবাদ জানান এবং নিজের পরিচয় স্পষ্ট করেন।

 

পরে ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ভিডিওতে দেখা যায়, তরুণী শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে নিজের অবস্থান তুলে ধরছেন। তিনি জানান, তিনি ভারতের নাগরিক এবং দীর্ঘদিন ধরে কলকাতায় বসবাস ও কাজ করছেন। শুধু ভিন্ন উচ্চারণে বাংলা বলার কারণে কাউকে বিদেশি বা ‘বাংলাদেশি’ বলে আখ্যা দেওয়া কতটা যৌক্তিক-সেই প্রশ্নও তোলেন তিনি।

 

তরুণী আরও বলেন, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রাজ্য, বিশেষ করে ত্রিপুরা ও আসামের বহু মানুষ শিক্ষা, চাকরি ও ব্যবসার কারণে পশ্চিমবঙ্গে বসবাস করেন। তারা নিজেদের আঞ্চলিক ভাষার বৈশিষ্ট্য বজায় রেখেই বাংলা ভাষায় কথা বলেন। ভাষার টান বা উচ্চারণের পার্থক্যকে কেন্দ্র করে কাউকে অপমান করা বা তার জাতীয় পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

 

ভিডিওটি প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। নেটিজেনদের একটি বড় অংশ ওই তরুণীর পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, ভারতের মতো বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক দেশে ভাষাগত বৈচিত্র্যকে সম্মান করা উচিত। শুধু উচ্চারণ বা আঞ্চলিক ভাষার কারণে কাউকে সন্দেহের চোখে দেখা দেশের সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থী বলেও মত দিয়েছেন অনেকে।

 

ভিডিওর মন্তব্যের ঘরেও অসংখ্য মানুষ নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেছেন। কেউ কেউ দাবি করেছেন, ত্রিপুরা, আসাম কিংবা উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে কলকাতায় এসে তারা অতীতেও একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। আঞ্চলিক বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে তাদেরও ‘বাংলাদেশি’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন।

 

এ ঘটনায় অনেকেই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ভাষাগত পরিচয় ও আঞ্চলিক বৈচিত্র্য সম্পর্কে সচেতনতার অভাব থেকে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। কেউ কেউ মনে করছেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের সংস্কৃতি ও ভাষা সম্পর্কে পারস্পরিক বোঝাপড়া বাড়ানো জরুরি।

 

বিশ্লেষকদের মতে, ভাষা ও পরিচয়কে ঘিরে বৈষম্যমূলক আচরণের অভিযোগ ভারতে নতুন নয়। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নাগরিকরা দেশের অন্যান্য অঞ্চলে চেহারা, ভাষা বা সাংস্কৃতিক পরিচয়ের কারণে বৈষম্য ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন। মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, এ ধরনের ঘটনা সামাজিক বিভাজনকে আরও গভীর করে এবং জাতীয় সংহতির জন্যও ক্ষতিকর।

 

উল্লেখ্য, গত বছরের ডিসেম্বরে দেরাদুনে ত্রিপুরার তরুণী এঞ্জেল চাকমার মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরেও ভাষা ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ভিত্তিক বৈষম্যের অভিযোগ সামনে এসেছিল। সে সময় দেশজুড়ে প্রতিবাদ ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কলকাতার বাসে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক এই ঘটনা আবারও ভাষাগত ও আঞ্চলিক পরিচয়কে কেন্দ্র করে বৈষম্যের প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে।

 

ঘটনার পর সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই দাবি জানিয়েছেন, শুধু এই নির্দিষ্ট ঘটনার তদন্তই নয়, বরং ভাষা ও পরিচয়ভিত্তিক বিদ্বেষমূলক আচরণ রোধে সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, ভারতের বৈচিত্র্যময় সাংস্কৃতিক বাস্তবতায় পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতাই হতে পারে এমন ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।


সম্পর্কিত নিউজ