{{ news.section.title }}
ভারতের নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব নিলেন জেনারেল ধীরাজ শেঠ
ভারতের নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন জেনারেল ধীরাজ শেঠ। মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি দেশটির ৩১তম সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্বভার নেন এবং অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর স্থলাভিষিক্ত হন। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এমন এক সময় তিনি সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে এলেন যখন দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা পরিস্থিতি, চীন সীমান্তের উত্তেজনা এবং আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন ভারতীয় সামরিক কৌশলকে নতুনভাবে সাজাতে বাধ্য করছে।
জেনারেল ধীরাজ শেঠ মহারাষ্ট্রের খড়কওয়াসলায় অবস্থিত ন্যাশনাল ডিফেন্স অ্যাকাডেমির সাবেক শিক্ষার্থী। ১৯৮৬ সালে তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া বাহিনীতে কমিশন লাভ করেন এবং প্রায় চার দশকের সামরিক জীবনে অপারেশনাল, কৌশলগত, প্রশিক্ষণ ও সামরিক পরিকল্পনার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।
ভারতের প্রতিরক্ষা মহলে তিনি একজন অভিজ্ঞ ট্যাংক কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। সামরিক বাহিনীর ভেতরে অনেকেই তাকে ‘স্পষ্টভাষী ট্যাংকম্যান’ হিসেবে উল্লেখ করেন। মরু অঞ্চলে সাঁজোয়া ইউনিট পরিচালনা, পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডে দায়িত্ব পালন এবং জম্মু-কাশ্মিরে সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়ার অভিজ্ঞতা তাকে সেনাবাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
জেনারেল শেঠ এর আগে ভারতের প্রধান স্ট্রাইক ফরমেশন ‘সুদর্শন চক্র কোর’-এর নেতৃত্ব দিয়েছেন। এছাড়া উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ, যুদ্ধ প্রস্তুতি এবং ভবিষ্যৎ সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
ভারতের নতুন সেনাপ্রধান এমন সময়ে দায়িত্ব নিলেন, যখন লাদাখ সীমান্তে চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা পুরোপুরি শেষ হয়নি। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত ও চীনের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে, তবুও সীমান্তে উভয় দেশই উল্লেখযোগ্য সেনা মোতায়েন বজায় রেখেছে।
পাকিস্তান সীমান্তেও নিরাপত্তা পরিস্থিতি ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে রয়েছে। জম্মু-কাশ্মিরে সন্ত্রাসবাদ, সীমান্ত অনুপ্রবেশ এবং ড্রোন ব্যবহারের মতো নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সেনাবাহিনীকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
ভারতের প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, জেনারেল শেঠের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে সেনাবাহিনীর প্রযুক্তিগত রূপান্তর। ড্রোন যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা এবং দীর্ঘপাল্লার নির্ভুল অস্ত্র ব্যবস্থার যুগে ভারতীয় স্থলবাহিনীকে নতুনভাবে প্রস্তুত করতে হবে।
নতুন সেনাপ্রধান দায়িত্ব গ্রহণের দিনই ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রদবদল হয়েছে। বিমানবাহিনীর নতুন উপপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এয়ার মার্শাল আশুতোষ দীক্ষিত। তিনি এয়ার মার্শাল নাগেশ কাপুরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
এছাড়া সেনাবাহিনীর নতুন উপ-সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সন্দীপ জৈন। সামরিক পরিকল্পনা, অপারেশন এবং ভবিষ্যৎ যুদ্ধ সক্ষমতা উন্নয়নের দায়িত্বে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন।
সেনাবাহিনীর বিভিন্ন কমান্ডেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় কমান্ডের দায়িত্ব পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহিত মালহোত্রা। দক্ষিণ কমান্ডের নতুন কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল রাজেশ পুষ্কর। অন্যদিকে লাদাখের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘ফায়ার অ্যান্ড ফিউরি কর্পস’-এর নতুন কমান্ডার হয়েছেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল মদনরাজ পান্ডে।
বিশ্লেষকদের মতে, জেনারেল ধীরাজ শেঠের নেতৃত্বে ভারতীয় সেনাবাহিনী আগামী কয়েক বছরে ‘থিয়েটার কমান্ড’, যৌথ সামরিক অভিযান এবং আধুনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির দিকে আরও দ্রুত অগ্রসর হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকার ইতোমধ্যে ‘আত্মনির্ভর ভারত’ কর্মসূচির আওতায় দেশীয় প্রতিরক্ষা শিল্পকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নিয়েছে এবং সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণে বড় বিনিয়োগ করছে।
ভারতের প্রায় ১৩ লাখ সক্রিয় সেনাসদস্যের এই বিশাল বাহিনীর নেতৃত্ব নিতে গিয়ে জেনারেল শেঠকে একদিকে যেমন সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, অন্যদিকে ভবিষ্যৎ যুদ্ধের জন্য বাহিনীকে প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করে তুলতে হবে। সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, তাঁর দীর্ঘ অপারেশনাল অভিজ্ঞতা এবং কৌশলগত নেতৃত্বের দক্ষতা আগামী বছরগুলোতে ভারতীয় সেনাবাহিনীর দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তথ্যসূত্র: দ্য হিন্দু