পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ: জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী

পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীর ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ: জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

পাকিস্তানশাসিত আজাদ জম্মু ও কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবি করেছেন ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী। অবসরের আগমুহূর্তে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চলটি এখনো সন্ত্রাসী অবকাঠামো, জঙ্গি প্রশিক্ষণ ও ভারতীয় ভূখণ্ডে অনুপ্রবেশের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, ভারতের অবস্থান অপরিবর্তিত রয়েছে এবং পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীর ভারতের অংশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। তিনি দাবি করেন, সীমান্তের ওপার থেকে এখনো সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী তা মোকাবিলায় সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

 

ভারতীয় সেনাপ্রধানের বক্তব্য এমন এক সময়ে সামনে এলো, যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কাশ্মীর ইস্যু নিয়ে কূটনৈতিক উত্তেজনা আবারও বৃদ্ধি পেয়েছে। ইসলামাবাদ দীর্ঘদিন ধরে আজাদ কাশ্মীরকে স্বশাসিত অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করে এলেও নয়াদিল্লি অঞ্চলটিকে নিজেদের ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে।

 

জেনারেল দ্বিবেদী বলেন, ভারত-চীন প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি বরাবর পরিস্থিতি বর্তমানে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল হলেও সেটিকে পুরোপুরি স্বাভাবিক বলা যাবে না। তাঁর ভাষায়, সীমান্ত পরিস্থিতি এখনো সংবেদনশীল এবং ভারতীয় সেনাবাহিনী কোনো ধরনের আত্মতুষ্টিতে ভুগছে না।

 

তিনি জানান, গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে সামরিক ও কূটনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, সেনা প্রত্যাহার, উত্তেজনা কমানো এবং আস্থা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে পরিস্থিতির ওপর ভারতীয় সেনাবাহিনী নিবিড় নজর রাখছে।

 

দ্বিবেদীর মতে, কৈলাশ মানস সরোবর যাত্রা পুনরায় চালুর উদ্যোগ, সীমান্ত বাণিজ্য, সরাসরি বিমান যোগাযোগ এবং ভিসা সহজীকরণের মতো বিষয়গুলো ভারত-চীন সম্পর্কের ক্ষেত্রে ইতিবাচক সংকেত দিচ্ছে। তবুও সামরিক প্রস্তুতি কমানোর কোনো সুযোগ নেই।

 

তিনি আরও বলেন, সীমান্ত এলাকায় অবকাঠামো উন্নয়ন, নজরদারি ব্যবস্থা, রসদ সরবরাহ, সেনা চলাচলের সক্ষমতা এবং দ্রুত মোতায়েনের ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হচ্ছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত রয়েছে।

 

চীনের উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন জেনারেল দ্বিবেদী। তিনি বলেন, পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, সড়ক নির্মাণ, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং অন্যান্য কর্মকাণ্ডকে ভারত অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করছে।

 

বিশেষ করে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি) নিয়ে ভারতের আপত্তি নতুন নয়। নয়াদিল্লির দাবি, এই করিডরের একটি অংশ বিতর্কিত কাশ্মীর অঞ্চলের মধ্য দিয়ে গেছে, যা ভারতের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। অন্যদিকে বেইজিং ও ইসলামাবাদ প্রকল্পটিকে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অংশ হিসেবে তুলে ধরে আসছে।

 

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, ভারতীয় সেনাপ্রধানের এই বক্তব্য কেবল অবসরের আগের মন্তব্য নয়; বরং এটি ভারতের দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। বিশেষ করে পাকিস্তান, চীন এবং কাশ্মীরকে ঘিরে ভারতের নিরাপত্তা নীতির ধারাবাহিক অবস্থানই এতে ফুটে উঠেছে।

 

বিশ্লেষকদের আরেকটি অংশ বলছে, লাদাখ সীমান্তে কয়েক বছর ধরে ভারত ও চীনের মধ্যে যে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, তার প্রভাব এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি। দুই দেশের মধ্যে বেশ কয়েক দফা সেনা প্রত্যাহার হলেও সীমান্ত এলাকায় বিপুল সেনা মোতায়েন এখনো অব্যাহত রয়েছে।

 

পাকিস্তান বরাবরই ভারতের এ ধরনের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করে আসছে। ইসলামাবাদের দাবি, কাশ্মীর একটি আন্তর্জাতিক বিরোধপূর্ণ অঞ্চল এবং এর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে কাশ্মীরিদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ করে পাকিস্তান।

 

জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী আরও বলেন, শান্তি বজায় রাখার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও ভারতীয় সেনাবাহিনীর মূল লক্ষ্য হলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সে কারণে সীমান্তে সেনা মোতায়েন, গোয়েন্দা নজরদারি এবং প্রতিরক্ষা সক্ষমতা আরও জোরদার করা হচ্ছে।

 

অবসরের আগে দেওয়া এই সাক্ষাৎকারকে ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত অবস্থান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। বিশেষ করে কাশ্মীর, চীন এবং সীমান্ত নিরাপত্তা ইস্যুতে নয়াদিল্লির অবস্থান যে পরিবর্তন হয়নি, জেনারেল দ্বিবেদীর বক্তব্যে সেটিই আবারও স্পষ্ট হয়েছে।

 

সূত্র: এনডিটিভি


সম্পর্কিত নিউজ