গাজামুখী ত্রাণবহরে ইসরায়েলি বাধা, ৫০ নৌযান আটক

গাজামুখী ত্রাণবহরে ইসরায়েলি বাধা, ৫০ নৌযান আটক
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

গুলি চালানোর অভিযোগ অস্বীকার তেল আবিবের, ৪২৮–৪৩০ কর্মীকে ইসরায়েলে নেওয়া হচ্ছে।গাজায় ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করা আন্তর্জাতিক ত্রাণবহর গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার সব নৌযান পূর্ব ভূমধ্যসাগরে আটক করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। ফ্লোটিলা আয়োজকদের দাবি, মঙ্গলবার গাজার দিকে এগিয়ে যাওয়ার সময় অন্তত দুটি নৌযানের দিকে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালায়।

তবে ইসরায়েল বলছে, কোনো ধরনের জীবন্ত গুলি ব্যবহার করা হয়নি এবং কেউ আহত হয়নি। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভিডিও ফুটেজ ও আয়োজকদের বক্তব্যে গুলি চালানোর অভিযোগ উঠলেও ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তা অস্বীকার করেছে।

 

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বহরে থাকা ৫০টি নৌযানই আটক করা হয়েছে। তাদের দাবি, ৪০টির বেশি দেশ থেকে অংশ নেওয়া ৪২৮ জন কর্মীকে আটক করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ৭৮ জন তুর্কি নাগরিক। অন্যদিকে ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ৪৩০ জন কর্মীকে ইসরায়েলি নৌযানে তোলা হয়েছে এবং তাদের ইসরায়েলে নেওয়া হচ্ছে। কেন দুই পক্ষের সংখ্যায় অল্প পার্থক্য রয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে পরিষ্কার হয়নি।

 

‘লাইভ অ্যামুনিশন নয়’, দাবি ইসরায়েলের

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “কোনো পর্যায়েই লাইভ অ্যামুনিশন বা জীবন্ত গুলি ছোড়া হয়নি।” তাদের দাবি, একাধিক সতর্কবার্তার পর নৌযানগুলোর দিকে “নন-লেথাল” বা প্রাণঘাতী নয়- এমন ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ইসরায়েল বলেছে, ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে নৌযানগুলোর বিরুদ্ধে সতর্কতা হিসেবে, প্রতিবাদকারী বা কর্মীদের লক্ষ্য করে নয়। এতে কেউ আহত হয়নি বলেও দাবি করেছে তেল আবিব।

 

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার লাইভ ফিডে দেখা যায়, সশস্ত্র ইসরায়েলি সেনারা নৌযানে ওঠে এবং লাইফ জ্যাকেট পরা কর্মীরা হাত তুলে অবস্থান নেন। ইসরায়েল এই ফ্লোটিলাকে “আইনসম্মত নৌ অবরোধ ভাঙার চেষ্টা” হিসেবে দেখছে।

 

গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর নতুন চেষ্টা

গ্লোবাল সুমুদ ফ্লোটিলার নৌযানগুলো বৃহস্পতিবার দক্ষিণ তুরস্ক থেকে রওনা দেয়। এটি ছিল গাজায় ত্রাণ পৌঁছানোর আরেকটি বড় প্রচেষ্টা। এর আগেও কয়েক দফা গাজামুখী ত্রাণবহর আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলের হাতে আটক হয়েছে। আয়োজকদের ভাষ্য, তাদের লক্ষ্য ছিল গাজার অবরুদ্ধ মানুষের জন্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া এবং ইসরায়েলি অবরোধের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, তারা “গাজার ওপর আইনসম্মত নৌ অবরোধ ভাঙতে দেবে না।” ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে গাজার সমুদ্রপথ নিয়ন্ত্রণ করে আসছে এবং বলে আসছে, নিরাপত্তার কারণেই এই নৌ অবরোধ বজায় রাখা হয়েছে।

 

এরদোয়ানের নিন্দা

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান আঙ্কারায় দেওয়া বক্তব্যে ফ্লোটিলার কর্মীদের “আশার যাত্রী” হিসেবে আখ্যা দেন এবং তাদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি হস্তক্ষেপের নিন্দা জানান। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ইসরায়েলের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

 

তুরস্কের ৭৮ জন নাগরিক আটক হওয়ার তথ্য সামনে আসায় আঙ্কারা-তেল আবিব উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গাজা যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই তুরস্ক ইসরায়েলের সামরিক অভিযান ও অবরোধের কড়া সমালোচনা করে আসছে।

 

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞা

ফ্লোটিলা আটক হওয়ার একই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় চার ব্যক্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ওয়াশিংটনের দাবি, তারা “প্রো-হামাস” ফ্লোটিলার সঙ্গে যুক্ত। তবে ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীরা বলছেন, ফিলিস্তিনিদের অধিকার নিয়ে কথা বলা বা গাজায় ত্রাণ পাঠানোর উদ্যোগকে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ভুলভাবে হামাস-সমর্থন হিসেবে উপস্থাপন করছে।

 

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র যাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, তাদের মধ্যে ইউরোপভিত্তিক কয়েকজন কর্মী রয়েছেন। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট এ উদ্যোগকে “প্রো-টেরর” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

 

গাজার মানবিক সংকট এখনো গভীর

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি হলেও গাজায় মানবিক সংকট এখনো ভয়াবহ। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলো বলছে, গাজায় যে পরিমাণ সহায়তা পৌঁছাচ্ছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনও অনেক কম। খাবার, ওষুধ, পানি, আশ্রয় এবং স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি এখনো তীব্র।

 

গাজার ২০ লাখের বেশি মানুষের অধিকাংশই বাস্তুচ্যুত। অনেকেই ধ্বংসস্তূপের পাশে, খোলা জায়গায়, রাস্তার ধারে বা ভাঙা ভবনের ধ্বংসাবশেষের ওপর অস্থায়ী তাঁবুতে বসবাস করছেন। আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধবিরতির পর সহায়তা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি থাকলেও গাজার ভেতরে সরবরাহ পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল হয়নি।

 

ইসরায়েল অবশ্য গাজায় সরবরাহ আটকে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেল আবিবের দাবি, তারা গাজার বাসিন্দাদের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রবেশে বাধা দিচ্ছে না। তবে মানবিক সংস্থাগুলো বলছে, বাস্তব পরিস্থিতিতে প্রবেশপথ, নিরাপত্তা অনুমতি, ধীর তল্লাশি ও বিতরণ জটিলতার কারণে পর্যাপ্ত সহায়তা মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

 

আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন সামনে

ফ্লোটিলা আটক ঘিরে নতুন করে আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্ন সামনে এসেছে। ইসরায়েল বলছে, গাজার ওপর তার নৌ অবরোধ আইনসম্মত এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি ঠেকাতে এটি বজায় রাখা প্রয়োজন। অন্যদিকে ফ্লোটিলা আয়োজক ও ফিলিস্তিনপন্থী কর্মীরা বলছেন, গাজায় মানবিক বিপর্যয়ের মধ্যে ত্রাণবাহী নৌযান আটকে দেওয়া অনৈতিক এবং অবরুদ্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।

 

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েল এই ফ্লোটিলাকে প্রকৃত ত্রাণ কার্যক্রমের চেয়ে “উসকানিমূলক পদক্ষেপ” হিসেবে দেখছে। তবে আয়োজকরা বলছে, তাদের উদ্দেশ্য ছিল গাজার বেসামরিক মানুষের কাছে সাহায্য পৌঁছানো এবং অবরোধের মানবিক প্রভাব বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা।

 

সামনে কী হতে পারে

আটক কর্মীদের ইসরায়েলে নেওয়ার পর তাদের কনস্যুলার প্রতিনিধিদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ইসরায়েল। এরপর তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে- তা এখনও স্পষ্ট নয়। এই ঘটনার পর তুরস্ক, ইউরোপীয় দেশগুলো এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর প্রতিক্রিয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। বিশেষ করে আটক ব্যক্তিদের মধ্যে বহু দেশের নাগরিক থাকায় ঘটনাটি কূটনৈতিক ইস্যুতে রূপ নিতে পারে।

গাজায় ত্রাণ প্রবেশ, অবরোধ, আন্তর্জাতিক জলসীমায় ইসরায়েলি হস্তক্ষেপ এবং ফিলিস্তিনপন্থী নাগরিক উদ্যোগ- সব মিলিয়ে এই ঘটনা আবারও দেখিয়ে দিল, যুদ্ধবিরতি থাকলেও গাজা সংকটের রাজনৈতিক ও মানবিক অচলাবস্থা এখনো শেষ হয়নি।


সম্পর্কিত নিউজ