{{ news.section.title }}
বিচ্ছেদের বালাই নেই, এক সঙ্গীতেই জীবন পার! পেঙ্গুইনের অদ্ভুত প্রেমের গল্প
প্রেমের প্রতীক হিসেবে আমরা অনেক প্রাণীর নাম শুনলেও পেঙ্গুইন সেখানে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। প্রজনন ঋতুতে মাইলের পর মাইল বরফ পেরিয়ে তারা ফিরে আসে সেই পুরনো সঙ্গীর কাছেই। বিজ্ঞানের ভাষায় এই একনিষ্ঠতাকে বলা হয় সোশ্যাল মনোগ্যামি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির এই যুগেও কেন পেঙ্গুইনরা তাদের আদিম নিয়ম মেনে চলে! কীভাবে তারা বরফের মরুভূমিতেও পথ হারায় না! আজকের বিশদ আলোচনায় থাকছে পেঙ্গুইনদের রোমাঞ্চকর দাম্পত্য জীবন এবং যেভাবে তারা প্রতিটি মৌসুমে তাদের সম্পর্কের পুনর্নবীকরণ করে!
অ্যান্টার্কটিকার হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় একটি ডিম রক্ষা করা এবং বাচ্চা বড় করে তোলা একা কোনো পেঙ্গুইনের পক্ষেই সম্ভব নয়। পেঙ্গুইনদের এই মনোগ্যামির প্রধান কারণ হলো 'কো-অপারেটিভ ব্রিডিং'।
যখন মা পেঙ্গুইন ডিম পাড়ে, তখন সে খাবারের সন্ধানে সমুদ্রে চলে যায়। এই দীর্ঘ সময় বাবা পেঙ্গুইনকে সেই ডিম নিজের পায়ের ওপর আগলে রেখে তা দিতে হয়। যদি প্রতি বছর সঙ্গী পরিবর্তন করতে হতো, তবে নতুন সঙ্গীর ওপর বিশ্বাস স্থাপন এবং কাজের সমন্বয় করতে অনেক সময় নষ্ট হতো। পুরোনো সঙ্গীর সাথে কাজ ভাগ করে নেওয়ার দক্ষতা বেশি থাকে, যা বাচ্চার বেঁচে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অ্যান্টার্কটিকার প্রজনন মৌসুম অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত। বরফ গলার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তাদের বাসা তৈরি, ডিম পাড়া এবং বাচ্চা বড় করার কাজ শেষ করতে হয়।
পেঙ্গুইনরা সাধারণত পাথর দিয়ে বাসা তৈরি করে। প্রতি বছর তারা একই জায়গায় ফিরে আসে। ফলে পুরোনো সঙ্গীর সাথে দেখা হলে তাদের নতুন করে একে অপরকে চেনার বা মানিয়ে নেওয়ার পেছনে সময় ব্যয় করতে হয় না।
পুরোনো সঙ্গীর সাথে তারা সরাসরি ডিম পাড়া এবং লালন-পালনের কাজে মন দিতে পারে, যা তাদের প্রজনন সাফল্য নিশ্চিত করে।
একটি কলোনিতে কয়েক হাজার পেঙ্গুইন একসাথে থাকে। সবাই দেখতে অনেকটা একই রকমের হয়। তাহলে তারা কীভাবে তাদের নির্দিষ্ট সঙ্গীকে খুঁজে পায়? বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, পেঙ্গুইনরা একে অপরকে চিনে নেয় তাদের কণ্ঠস্বরের (Unique Vocalizations)মাধ্যমে। প্রতিটি পেঙ্গুইনের ডাকের একটি নিজস্ব সুর বা ফ্রিকোয়েন্সি থাকে। যখন একটি পেঙ্গুইন সমুদ্র থেকে ফিরে আসে, সে একটি নির্দিষ্ট সুরে ডাক দেয় এবং তার সঙ্গী সেই ডাক শুনে ভিড়ের মধ্য থেকে সাড়া দেয়। একে বলা হয় 'অডিশনাল রিকগনিশন'।
উপহার হিসেবে পাথর!
পেঙ্গুইনদের মধ্যে 'জেন্টু' প্রজাতির পুরুষরা তাদের পছন্দের সঙ্গিনীকে একটি মসৃণ পাথর উপহার দেয়। এটি অনেকটা মানুষের হীরা বা আংটি দেওয়ার মতো। যদি স্ত্রী পেঙ্গুইন সেই পাথরটি গ্রহণ করে এবং নিজের বাসায় রাখে, তবেই তাদের 'সম্পর্ক' শুরু হয়। আসলে এই পাথরটি কেবল উপহার নয়, এটি একটি ভালো বাসা তৈরির উপকরণ, যা প্রমাণ করে যে পুরুষ পেঙ্গুইনটি একজন দায়িত্বশীল বাবা হওয়ার যোগ্য।
পেঙ্গুইন সমাজে কি বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে?
মানুষের মতো পেঙ্গুইনদের মধ্যেও মাঝে মাঝে বিচ্ছেদ ঘটে। যদি কোনো দম্পতি গত বছর সফলভাবে বাচ্চা বড় করতে না পারে, তবে তারা পরের বছর নতুন সঙ্গী খুঁজতে পারে। একে বিজ্ঞানীরা 'ব্রীডিং ফেইলিওর' বলে থাকেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে, যদি আগের বছরের অভিজ্ঞতা ভালো থাকে, তবে তারা বছরের পর বছর একে অপরের প্রতি অনুগত থাকে।
চরম প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার সেরা উপায় মূলত পারস্পরিক বিশ্বাস এবং সহযোগিতা। তাদের এই 'এক সঙ্গী' বেছে নেওয়ার প্রবণতা কোনো রোমান্টিক উপন্যাসের গল্প নয়, এটি প্রকৃতির এক অমোঘ নিয়ম, যেখানে একজনের ত্যাগ আর অন্যজনের নিষ্ঠা মিলে জন্ম দেয় নতুন এক প্রজন্মের।