একই ছাদের নিচে থেকেও কেন বাড়ছে দূরত্ব? ভাঙনের মুখে সাজানো সংসার!

একই ছাদের নিচে থেকেও কেন বাড়ছে দূরত্ব? ভাঙনের মুখে সাজানো সংসার!
ছবির ক্যাপশান, একই ছাদের নিচে থেকেও কেন বাড়ছে দূরত্ব? ভাঙনের মুখে সাজানো সংসার!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

ঘরই হওয়ার কথা মানুষের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু সেই চার দেয়ালের আড়ালেই যখন নিরাপত্তার সংকট দেখা দেয়, তখন তা কেবল একটি আইনি অপরাধ নয়, পরিণত হয় এক নীরব মহামারিতে। নিভৃতে সওয়া এই যন্ত্রণার শেষ কোথায়? আমাদের আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে থাকছে অন্দরের সেই অদৃশ্য ক্ষত এবং এই সামাজিক সংকটের গভীরতা নিয়ে এক বিশেষ বিশ্লেষণ।

মানব সভ্যতার বিকাশের সাথে সাথে আমরা সাম্য ও অধিকারের বড় বড় বুলি আওড়াই। কিন্তু দিনের শেষে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের জন্য তাদের সবথেকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল, নিজের ঘরই হয়ে ওঠে এক বিভীষিকাময় কারাগার! গার্হস্থ্য সহিংসতা বা ‘ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স’ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজতাত্ত্বিক ব্যাধি। যখন ভালোবাসার বন্ধনটি ভয়ের শৃঙ্খলে পরিণত হয়, তখন একজন মানুষের আত্মবিশ্বাস, শারীরিক ক্ষমতা এবং মানসিক স্থিতিশীলতা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় আমরা একে পারিবারিক ঝগড়া বলে এড়িয়ে যাই। কিন্তু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী ট্রমা, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম বয়ে বেড়াতে হয়।

 

সাধারণত আমরা মনে করি শরীরে আঘাতের চিহ্ন থাকলেই বুঝি তাকে নির্যাতন বলা হয়। কিন্তু মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে গার্হস্থ্য সহিংসতা অনেক বেশি গভীর ও সূক্ষ্ম। একে প্রধানত চারটি ভাগে ভাগ করা যায়:

 

১.মনস্তাত্ত্বিক ও আবেগীয় নির্যাতন (Psychological Abuse): এটি সবথেকে ভয়ঙ্কর। কারণ এর কোনো দৃশ্যমান ক্ষত নেই। একজন মানুষকে মানসিকভাবে ছোট করা, সারাক্ষণ ভুল ধরা, তাকে একা করে দেওয়া এবং তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া এই পর্যায়ের অন্তর্গত। একে অনেক সময় গ্যাসলাইটিংও(Gaslighting) বলা হয়। এখানে নির্যাতিত ব্যক্তিকে বোঝানো হয় যে দোষ তার নিজেরই এবং সে মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন।


২.অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ (Financial Abuse): এটি হলো কৌশলে একজনকে পঙ্গু করে দেওয়া। সঙ্গীর উপার্জনের টাকা কেড়ে নেওয়া, তাকে হাতখরচ না দেওয়া বা কর্মক্ষেত্রে যেতে বাধা দেওয়ার মাধ্যমে তাকে পুরোপুরি পরনির্ভরশীল করে তোলা হয়। ফলে নির্যাতিত ব্যক্তি চাইলেও সেই বিষাক্ত সম্পর্ক থেকে বের হতে পারে না।


৩. যৌন নিপীড়ন (Sexual Coercion): দাম্পত্য জীবনে সম্মতির বিষয়টি প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। ইচ্ছার বিরুদ্ধে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা কেবল অনৈতিক নয়, এটি গুরুতর স্নায়বিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।


৪. শারীরিক সহিংসতা (Physical Violence): এটি সরাসরি আঘাত, যার ফলস্বরূপ দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক পঙ্গুত্ব বা এমনকি মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।


প্রভাব:

দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়া একজন মানুষের মস্তিষ্কে অভাবনীয় কিছু পরিবর্তন ঘটে। যখন কেউ সারাক্ষণ ভয়ের মধ্যে থাকে, তখন তার মস্তিষ্কের 'অ্যামিগডালা', যা ভয় নিয়ন্ত্রণ করে তা অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে। এর ফলে ব্যক্তি সবসময় অস্থিরতা বা 'হাইবার-ভিজিলেন্স'-এ ভোগেন।

অন্যদিকে, মস্তিষ্কের 'হিপোক্যাম্পাস', যা স্মৃতি ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে, তা নির্যাতনের প্রভাবে সংকুচিত হতে শুরু করে। দীর্ঘস্থায়ী কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়, যার ফলে নির্যাতিত ব্যক্তি হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা এবং অনিদ্রার মতো সমস্যায় ভোগেন। একে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় 'Complex PTSD' বা পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার বলা হয়।

 

'স্টকহোম সিনড্রোম' ও ট্রমা বন্ডিংয়ের জটিলতা:

সমাজের একটি সাধারণ প্রশ্ন হলো,"এত কষ্ট হলে কেন সে চলে যায় না?" উত্তরটি খুব সহজ নয়। এর পেছনে কাজ করে 'ট্রমা বন্ডিং' (Trauma Bonding)। গবেষণায় দেখা গেছে, যখন একজন নির্যাতনকারী আঘাতের পর আবার চরম ভালোবাসা বা অনুশোচনা দেখায়, তখন নির্যাতিতের মস্তিষ্কে ডোপামিন হরমোন নিঃসৃত হয়। এই বিরতিহীন অত্যাচার আর ভালোবাসার চক্রটি নেশার মতো কাজ করে।নির্যাতিত ব্যক্তি আশা করতে শুরু করেন যে হয়তো একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। এই অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদটিই তাকে সেই নরককুণ্ডে আটকে রাখে।

 

সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ও নীরবতার সংস্কৃতি:

আমাদের সমাজে পারিবারিক মর্যাদার দোহাই দিয়ে নির্যাতিতাকে চুপ থাকতে শেখানো হয়। "মানিয়ে নেওয়া" শব্দটিকে মহান করে তোলা হয়, যা আদতে অপরাধীকে আরও বেশি প্রশ্রয় দেয়। যখন সমাজ এই নীরবতাকে সমর্থন করে, তখন অপরাধী এক ধরণের 'সোশ্যাল ভ্যালিডেশন' পায়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু ছোটবেলা থেকে পরিবারে সহিংসতা দেখে বড় হয়, তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ার সম্ভাবনা সাধারণ শিশুদের তুলনায় ৪ গুণ বেশি। অর্থাৎ, আজকের ঘরের অশান্তি আগামীর সমাজের জন্য একটি বড় হুমকি।


আইনি সুরক্ষা ও উত্তরণের পথ:

গার্হস্থ্য সহিংসতা থেকে মুক্তি পাওয়া কেবল একটি ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি একটি দীর্ঘ লড়াই। আধুনিক আইনব্যবস্থায় এখন মানসিক ও অর্থনৈতিক নির্যাতনকেও অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। কিন্তু কেবল আইন দিয়ে এর সমাধান সম্ভব নয় প্রয়োজন সচেতনতাও।যেমন -

☞ নির্যাতিতের জন্য নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা।

☞  অপরাধী এবং শিকার, উভয়েরই মানসিক চিকিৎসার প্রয়োজন। অনেক সময় পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বা শৈশবের ট্রমা থেকে একজন ব্যক্তি নির্যাতনকারী হয়ে ওঠেন।

☞ নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন হওয়া এই চক্র ভাঙার প্রধান অস্ত্র।


একটি সুন্দর সমাজ গড়ার প্রথম ধাপই শুরু হয় ঘর থেকে। ডাল্টনের পরমাণুবাদের মতো সমাজও অসংখ্য ছোট ছোট পরিবার নামক একক দিয়ে গঠিত। যদি সেই এককগুলোই বিষাক্ত হয়, তবে পুরো জাতির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে। সহিংসতা কোনো পৌরুষের পরিচয় নয়, বরং এটি মানসিক দেউলিয়াত্বের লক্ষণ।


সম্পর্কিত নিউজ