{{ news.section.title }}
হাড় ছাড়াই কীভাবে বেঁচে থাকে চিংড়ি ও কাঁকড়া? জানুন!
বাঙালির রসনাবিলাসে চিংড়ি বা কাঁকড়া মানেই উৎসব। আমরা অবলীলায় এদের মাছ বলে ডাকি। কিন্তু প্রাণিবিজ্ঞানের চোখে এরা মাছের সংজ্ঞার ধারেকাছেও নেই! আশ্চর্যজনক হলেও সত্যি, সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ে টিকে থাকা এই প্রাণীদের শরীরে নেই কোনো হাড় বা কেন্দ্রীয় কঙ্কাল। হাড়হীন এই শরীর নিয়ে তারা কীভাবে আত্মরক্ষা করে! তাদের এই অদ্ভুত শরীরের শক্ত আবরণের রহস্য নিয়েই আমাদের আজকের এই আয়োজন।
মানুষ বা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের কঙ্কাল থাকে শরীরের চামড়া ও মাংসের নিচে, যাকে বলা হয় 'এন্ডোস্কেলেটন'। কিন্তু চিংড়ি এবং কাঁকড়ার ক্ষেত্রে প্রকৃতি ঠিক উল্টো কৌশল অবলম্বন করেছে। এদের কোনো অভ্যন্তরীণ হাড় নেই। এদের পুরো শরীর ঢাকা থাকে একটি অত্যন্ত শক্ত ও মজবুত আবরণে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'এক্সোস্কেলেটন' বা বহিঃকঙ্কাল। এই এক্সোস্কেলেটন মূলত 'কাইটিন' নামক এক ধরণের জটিল শর্করা বা পলিস্যাকারাইড দিয়ে তৈরি। কাইটিন নিজে থেকেই বেশ শক্ত, কিন্তু সমুদ্রের পানিতে থাকা ক্যালসিয়াম কার্বোনেট যখন এই কাইটিনের সাথে মিশে যায়, তখন তা ইস্পাতের মতো শক্ত বর্মে পরিণত হয়। এটি কেবল একটি আবরণ নয়, এটি তাদের পেশিকে ধরে রাখে, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে সুরক্ষা দেয় এবং পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করে।
কাঁটা নেই কেন?
আমরা যখন মাছ খাই, তখন আমাদের মূল ভয় থাকে তার সূক্ষ্ম কাঁটা বা হাড় নিয়ে। বিবর্তনীয় প্রেক্ষাপট থেকে দেখলে, মাছের কাঁটা বা হাড় হলো তাদের শরীরের কাঠামো যা পেশিকে নড়াচড়া করতে সাহায্য করে। কিন্তু চিংড়ি বা কাঁকড়ার ক্ষেত্রে এই কাঠামোর দায়িত্ব নেয় তাদের বাইরের খোলস। বিজ্ঞানীদের মতে, অগভীর সমুদ্র বা পাথুরে পরিবেশে বাস করার জন্য এদের শরীরের ভেতরে হাড় থাকার চেয়ে বাইরে শক্ত বর্ম থাকা বেশি জরুরি ছিল। হাড়ের বদলে এদের শরীরের ভেতরে থাকে এক ধরণের তরল পূর্ণ গহ্বর, যাকে বলা হয় 'হাইড্রোস্ট্যাটিক স্কেলেটন'। এই তরল চাপ এবং বাইরের শক্ত খোলসের সমন্বয়ে তারা অত্যন্ত দ্রুতগতিতে সাঁতার কাটতে বা বালুর নিচে লুকিয়ে পড়তে পারে। এদের শরীরে কোনো কেন্দ্রীয় মেরুদণ্ড না থাকায় এরা অত্যন্ত নমনীয় হয়, যা তাদের শিকার ধরতে বা শত্রু থেকে বাঁচতে সাহায্য করে।
চিংড়ি বা কাঁকড়ার এই শক্ত খোলসের একটি বড় সমস্যা হলো, এটি প্রাণীর সাথে সাথে আকারে বড় হয় না। মানুষ যেমন বড় হলে ছোট হয়ে যাওয়া জামা বদলে ফেলে, এই প্রাণীদেরও ঠিক তাই করতে হয়। এই প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় 'মোল্টিং' বা 'একডাইসিস'। যখন প্রাণীটির শরীর খোলসের তুলনায় বড় হয়ে যায়, তখন সে পুরোনো খোলসটি ভেঙে বেরিয়ে আসে। এই সময় তাদের নতুন খোলসটি থাকে অত্যন্ত নরম। বিজ্ঞানীদের মতে, এটি তাদের জীবনের সবথেকে ঝুঁকিপূর্ণ সময়। এই নরম অবস্থায় তারা প্রায় অসহায় হয়ে পড়ে এবং শত্রুর হাত থেকে বাঁচতে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে থাকে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সমুদ্রের পানি থেকে খনিজ শোষণ করে তাদের নতুন খোলসটি আবার পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে।
চিংড়ি ও কাঁকড়ার এই 'ক্লদ' বা বিশেষায়িত অঙ্গগুলো সমুদ্রের তলদেশের বাস্তুসংস্থান রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাদের এই শক্ত খোলস বা এক্সোস্কেলেটন মৃত্যুর পর সমুদ্রের তলদেশে জমা হয় এবং সেখান থেকে ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য খনিজ পুনরায় পানিতে মিশে যায়, যা সামুদ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। এছাড়া, কাঁকড়ার রক্ত নিয়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ব্যাপক গবেষণা চলছে। বিশেষ করে 'হর্সশু ক্র্যাব' বা রাজ কাঁকড়ার নীল রক্ত ব্যাকটেরিয়া শনাক্তকরণে এক অনন্য ভূমিকা পালন করে, যা আধুনিক ভ্যাক্সিন তৈরির অন্যতম প্রধান ভিত্তি।