উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি কি সত্যিই উড়তে পারে?জানুন অবাক করা তথ্য!

উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি কি সত্যিই উড়তে পারে?জানুন অবাক করা তথ্য!
ছবির ক্যাপশান, উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি কি সত্যিই উড়তে পারে?জানুন অবাক করা তথ্য!
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

বনের নির্জনতায় রাতের আঁধারে হঠাৎ যদি দেখেন কোনো ছায়া এক গাছ থেকে অন্য গাছে তীরের মতো ছুটে যাচ্ছে, তবে বুঝবেন আপনি প্রকৃতির এক অসাধারণ ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সাক্ষী হয়তে পেরেছেন! কাঠবিড়ালি বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে চঞ্চল এক প্রাণী, যে লাফিয়ে লাফিয়ে চলে। কিন্তু উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি সেই সংজ্ঞাকে এক ধাপ উঁচুতে নিয়ে গেছে। এরা কোনো জাদুকরী শক্তিতে ওড়ে না, বরং এদের শরীরের বিশেষ গঠন এদের বাতাসের ওপর ভেসে থাকার মতো ক্ষমতা দেয়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘গ্লাইডিং’ (Gliding)।

উড়ুক্কু কাঠবিড়ালির ভেসে থাকার মূল রহস্যই হলো তাদের শরীরের বিশেষ চামড়া, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘প্যাটাজিয়াম’ (Patagium)। এটি মূলত তাদের সামনের পা থেকে পেছনের পা পর্যন্ত বিস্তৃত একটি পাতলা কিন্তু অত্যন্ত মজবুত চামড়ার পর্দা। যখন এরা এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফ দেয়, তখন তারা তাদের হাত-পাগুলো চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়। ফলে এই বাড়তি চামড়াটি একটি প্যারাসুট বা গ্লাইডারের মতো টানটান হয়ে যায়।

অ্যারোডাইনামিকস বা বায়ুগতিবিদ্যার নিয়ম অনুযায়ী, এই চামড়াটি বাতাসের বাধা বাড়িয়ে দেয়। ফলে অভিকর্ষ বল তাদের নিচের দিকে টানলেও বাতাসের উর্ধ্বমুখী চাপ তাদের ওপরের দিকে ঠেলে দেয়। এই দুই বলের ভারসাম্যেই তারা বাতাসে ভেসে থাকতে পারে। এটি ঠিক তেমন, যেমনটি আমরা প্যারাগ্লাইডিং করার সময় দেখে থাকি।

 

পাখিরা তাদের ডানা নাড়িয়ে দিক পরিবর্তন করে, কিন্তু উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি তো ডানা ঝাপটাতে পারে না। তবে তারা দিক পরিবর্তন করে কীভাবে? এখানে তাদের লম্বা এবং চ্যাপ্টা লেজটি একটি ‘রাডার’ হিসেবে কাজ করে। বাতাসের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং ডানে বা বামে মোড় নিতে তারা লেজটিকে নিখুঁতভাবে ব্যবহার করে। এছাড়া তাদের কব্জিতে থাকে একটি বিশেষ তরুণাস্থি বা কার্টিলেজ, যা তাদের প্যাটাজিয়ামের কোণ পরিবর্তন করতে সাহায্য করে থাকে। যখন তারা কোনো নির্দিষ্ট ডালে নামতে চায়, তখন তারা তাদের শরীরের ভঙ্গি বদলে বাতাসের বাধা বাড়িয়ে দেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘এয়ার ব্রেক’। এর ফলে তাদের গতি কমে যায় এবং তারা খুব আলতোভাবে ল্যান্ড করতে সক্ষম হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটি এতটাই দ্রুত এবং গাণিতিকভাবে নিখুঁত যে, আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তিতেও এই কৌশল নিয়ে গবেষণা চলছে।

 

উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি মূলত নিশাচর প্রাণী। রাতের অন্ধকারে নির্ভুলভাবে ল্যান্ড করার জন্য এদের চোখের গঠন সাধারণ কাঠবিড়ালির চেয়ে অনেক বড় এবং সংবেদনশীল। এদের মস্তিষ্কের ‘ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স’ অত্যন্ত উন্নত, যা গভীর অন্ধকারেও দূরত্বের সঠিক ধারণা দিতে সক্ষম। সাম্প্রতিক গবেষণায় আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে! বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, অতিবেগুনী রশ্মির নিচে এই প্রাণীদের পেটের নিচের অংশ উজ্জ্বল গোলাপী বা ফ্লোরোসেন্ট রঙের মতো দেখায়। একে বলা হয় ‘বায়ো-ফ্লোরোসেন্স’। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, ঘন অরণ্যে রাতের বেলা একে অপরের সাথে যোগাযোগ করতে বা শত্রু থেকে বাঁচতে এই অনন্য রঙের খেলা ব্যবহার করে তারা। এটি বিবর্তনের এমন এক ধাপ যা আমাদের কল্পনারও অতীত।


কেন এই ওড়ার বিবর্তন?

প্রকৃতিতে কোনো পরিবর্তনই বিনা কারণে ঘটে না। উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি কেন ওড়ার এই ক্ষমতা অর্জন করল! বনভূমিতে তাদের প্রধান শত্রু হলো চিতা বা সাপ, যারা গাছে দ্রুত চড়তে পারে। এক গাছ থেকে অন্য গাছে লাফিয়ে যাওয়া সময়সাপেক্ষ এবং ঝুঁকিপূর্ণ। গ্লাইডিং করার মাধ্যমে তারা খুব দ্রুত শত্রু থেকে দূরে সরে যেতে পারে এবং খুব অল্প পরিশ্রমে বিশাল এলাকা জুড়ে খাবার সংগ্রহ করতে পারে। তাদের এই শক্তি সাশ্রয়ী যাতায়াত পদ্ধতি তাদের বাস্তুসংস্থানে এক অনন্য উচ্চতা দিয়েছে।

 

উড়ুক্কু কাঠবিড়ালি সাধারণ সব পাখির মতো ডানা ঝাপটায় না সত্য, কিন্তু তাদের গ্লাইডিং করার দক্ষতা কোনো দক্ষ বৈমানিকের চেয়ে কম নয়।


সম্পর্কিত নিউজ