শান্দুর পাস: পাকিস্তানের ‘রুফ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’- একসঙ্গে পাহাড়, হ্রদ, পোলো আর নীরবতার ভ্রমণ

শান্দুর পাস: পাকিস্তানের ‘রুফ অব দ্য ওয়ার্ল্ড’- একসঙ্গে পাহাড়, হ্রদ, পোলো আর নীরবতার ভ্রমণ
ছবির ক্যাপশান, শান্দুর পাস: পাহাড়-হ্রদ-পোলোতে নীরব ভ্রমণ | ছবি: সংগৃহীত

শান্দুর পাস পৃথিবীর অন্যতম উচ্চতম মালভূমি, যা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৭০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। এটি পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চলে অবস্থিত এবং প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত। চারদিকে তুষারাবৃত পাহাড়, সবুজ তৃণভূমি আর নির্মল আকাশ

পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে ভ্রমণের কথা উঠলে বেশিরভাগ মানুষ আগে হুনজা, স্কারদু বা ফেয়ারি মেডোজের নাম বলেন। কিন্তু যারা প্রকৃতি, উচ্চভূমির নিস্তব্ধতা, লেক, ঘাসভূমি আর লোকজ সংস্কৃতিকে একসঙ্গে দেখতে চান, তাদের জন্য শান্দুর পাস এক অন্যরকম গন্তব্য। হিন্দুকুশ পর্বতমালার কোলে অবস্থিত এই উচ্চভূমি গিলগিট-বালতিস্তান ও চিত্রালকে যুক্ত করেছে। সরকারি ও পর্যটন সূত্র অনুযায়ী, এটি বিশ্বের সর্বোচ্চ পোলো গ্রাউন্ডের জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত, আর এর উচ্চতা প্রায় ১২,৩০০ থেকে ১২,৫০০ ফুট।

 

শান্দুরকে শুধু একটি পাস বললে ভুল হবে। এটি একসঙ্গে একটি উঁচু মালভূমি, লেকঘেরা চারণভূমি, পোলো উৎসবের মাঠ এবং চিত্রাল-ঘিজার-ফান্দার অঞ্চলের মধ্যে একটি অসাধারণ প্রাকৃতিক করিডর। পাকিস্তানের সরকারি পর্যটন প্রচারপত্রে এটিকে এমন একটি জায়গা বলা হয়েছে, যেখানে প্রকৃতি, শান্ত পরিবেশ এবং স্থানীয় সংস্কৃতির ঝলক একসঙ্গে দেখা যায়। চিত্রালভিত্তিক সরকারি পর্যটন উপকরণে বলা হয়েছে, শান্দুর পাস চিত্রাল ও গিলগিটের মাঝামাঝি অবস্থানে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩,৭৯৮ মিটার ওপরে।

 

কোথায় অবস্থিত, কীভাবে যাওয়া যায়

শান্দুর পাস পাকিস্তানের চিত্রাল জেলা ও গুপিস-ইয়াসিন/ঘিজার অঞ্চলের সীমানার কাছাকাছি। চিত্রাল দিক থেকে এর দূরত্ব সরকারি পর্যটন সূত্রে প্রায় ১৫৫ কিলোমিটার বলা হয়েছে। গিলগিট-বালতিস্তান দিক থেকেও সড়কপথে যাওয়া যায়, তবে রাস্তা পাহাড়ি এবং সময়সাপেক্ষ। অনানুষ্ঠানিক ভ্রমণ গাইডগুলোতে দূরত্ব কিছুটা এদিক-সেদিক বলা হলেও, সাধারণভাবে ভ্রমণকারীরা চিত্রাল–মাস্তুজ–লাসপুর রুট অথবা গিলগিট–ঘিজার–ফান্দার রুট ব্যবহার করেন।

চিত্রাল দিক থেকে গেলে সাধারণত মাস্তুজ হয়ে লাসপুর ভ্যালির ভেতর দিয়ে শান্দুর পৌঁছাতে হয়। গিলগিট-বালতিস্তান দিক থেকে গেলে ঘিজার এবং ফান্দার ভ্যালি হয়ে উঠতে হয়। রাস্তা অনেক জায়গায় কাঁচা, সরু এবং মৌসুমি ক্ষতির শিকার হতে পারে। তাই স্থানীয় ড্রাইভার বা ফোর-হুইল ড্রাইভ গাড়ি নিলে যাত্রা আরামদায়ক হয়। বর্ষা বা দেরি-শীতকালে যাত্রার আগে রাস্তার অবস্থা জেনে নেওয়া জরুরি।

 

কখন গেলে সবচেয়ে ভালো

শান্দুর পাস সারা বছর খোলা থাকে না। বরফ, তুষারপাত এবং উচ্চতার কারণে বছরের বড় সময় এটি কঠিন বা অগম্য হয়ে পড়ে। সরকারি ও ভ্রমণসূত্রগুলো বলছে, মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সময় তুলনামূলক ভালো, আর জুনের শেষভাগ থেকে জুলাই হলো সবচেয়ে জনপ্রিয় মৌসুম। এই সময় আবহাওয়া তুলনামূলক সহনীয় থাকে, ঘাসভূমি সবুজ হয়, লেকের পানি স্বচ্ছ দেখায় এবং ভ্রমণকারীর সংখ্যা বাড়ে।

যদি আপনি উৎসবমুখর পরিবেশ চান, তাহলে শান্দুর পোলো ফেস্টিভ্যাল-এর সময় যাওয়া সবচেয়ে উপযুক্ত। গিলগিট-বালতিস্তান সরকারের পর্যটন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের শান্দুর পোলো ফেস্টিভ্যাল ২০ থেকে ২২ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। অন্য সরকারি উৎসে আবার ঐতিহ্যগতভাবে ৭ থেকে ৯ জুলাই-এর কথাও উল্লেখ আছে। বাস্তবে তারিখ বছরভেদে কিছুটা পরিবর্তিত হতে পারে, তাই যাওয়ার আগে সরকারি ট্যুরিজম আপডেট দেখে নেওয়া ভালো।

 

শান্দুরে কী দেখা যায়

শান্দুরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্যই এর বিশ্বখ্যাত পোলো গ্রাউন্ড। এটি “world’s highest polo ground” হিসেবে পরিচিত। এখানে চিত্রাল ও গিলগিট-বালতিস্তানের দলগুলোর মধ্যে ঐতিহ্যবাহী ফ্রিস্টাইল পোলো খেলা হয়। এই খেলায় সাধারণ পোলো ম্যাচের মতো কড়াকড়ি নিয়ম বা রেফারির আধিপত্য থাকে না-এ কারণেই এটি রুক্ষ, দ্রুতগতির এবং সাংস্কৃতিকভাবে খুবই আলাদা।

 

পোলো মাঠের পাশাপাশি শান্দুর লেক বা আশপাশের লেক-ঘেরা ঘাসভূমিও ভ্রমণকারীদের মূল আকর্ষণ। উঁচু পাহাড়, নীল জলরাশি, খোলা তৃণভূমি, ইয়াকের পাল, ঠান্ডা বাতাস-সব মিলিয়ে জায়গাটি একেবারে পোস্টকার্ডের মতো। লে মঁদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই জায়গাকে snow-capped peaks, green pastures, yak grazing এবং crystal-clear lake-এর অসাধারণ সমন্বয় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

 

এ ছাড়া এখানে ক্যাম্পিং, ফটোগ্রাফি, হর্স রাইডিং, ট্রাউট ফিশিং এবং স্বল্প দৈর্ঘ্যের ট্রেকিং খুব জনপ্রিয়। কিছু পর্যটন উৎসে শান্দুর ফেস্টিভ্যাল ঘিরে ফোক মিউজিক, ডান্স পারফরম্যান্স, প্যারাগ্লাইডিং এবং অ্যাংলিং প্রতিযোগিতার কথাও উল্লেখ আছে। অর্থাৎ আপনি চাইলে শান্দুরকে শুধু একটি “ভিউ পয়েন্ট” হিসেবে নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ আউটডোর অভিজ্ঞতা হিসেবেও দেখতে পারেন।

 

আশপাশে কোথায় কোথায় ঘোরা যায়

শান্দুর ভ্রমণের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একা নয়-এর সঙ্গে আরও কয়েকটি চমৎকার গন্তব্য জুড়ে দেওয়া যায়।

 

ফান্দার ভ্যালি ও ফান্দার লেক:


গিলগিট-বালতিস্তান দিক থেকে গেলে ফান্দার ভ্যালি প্রায় বাধ্যতামূলক এক স্টপ। শান্ত নদী, সবুজ উপত্যকা, নীলাভ লেক আর তুলনামূলক কম ভিড়ের জন্য এই এলাকা বিশেষভাবে পরিচিত। বহু ভ্রমণকারীর কাছে ফান্দার পাকিস্তানের সবচেয়ে সুন্দর, অথচ কম-আলোচিত উপত্যকাগুলোর একটি।

 

খালতি লেক:


ঘিজার অঞ্চলে আরেকটি জনপ্রিয় স্টপ হলো খালতি লেক। জেলা পর্যটন তথ্যে এটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ হিসেবে উঠে এসেছে। শীতকালে এখানে আইস হকি ফেস্টিভ্যালও হয়।

 

লাসপুর ভ্যালি:


চিত্রাল দিক থেকে শান্দুরে গেলে লাসপুর ভ্যালি আপনার পথে পড়বে। শান্দুর পোলো উৎসবের সঙ্গে এই উপত্যকার সাংস্কৃতিক সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। প্রকৃতি, খোলা ভ্যালি আর ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ পরিবেশের জন্য এটি আলাদা আকর্ষণ।

 

মাস্তুজ:


চিত্রালের আপার অংশে অবস্থিত মাস্তুজ শান্দুর যাওয়ার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্টপওভার। অনেক ট্রাভেলার এখানেই রাত কাটিয়ে পরদিন ভোরে শান্দুরের দিকে ওঠেন। এতে উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াও সহজ হয়।

 

ইশকোমান, হুন্দরাপ ও ল্যাঙ্গার ভ্যালি:


ঘিজার জেলার পর্যটন তথ্য অনুযায়ী, এসব উপত্যকা ট্রেকিং, ক্যাম্পিং, ট্রাউট ফিশিং ও হিমবাহ-দৃশ্যের জন্য পরিচিত। শান্দুর ট্রিপ একটু বাড়িয়ে নিলে এগুলোও ধরা যায়।

 

আবহাওয়া, উচ্চতা ও সতর্কতা

শান্দুরে ভ্রমণের সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ হলো উচ্চতা। ৩,৭০০ মিটারের কাছাকাছি উচ্চতায় বাতাস পাতলা, রাত ঠান্ডা, আর অনেকের মাথাব্যথা, ক্লান্তি বা হালকা altitude sickness হতে পারে। তাই সেখানে একদিনে দ্রুত উঠে না গিয়ে, মাঝপথে মাস্তুজ বা ফান্দার-এ এক রাত থাকা ভালো। পর্যাপ্ত পানি পান করা, ভারী দৌড়ঝাঁপ এড়ানো এবং ঠান্ডার জন্য জ্যাকেট রাখা জরুরি। লে মঁদের প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে, এমনকি পোলো খেলার ঘোড়াগুলোকেও thin air-এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে কয়েক দিন আগে পৌঁছানো হয়।

 

এ ছাড়া ভ্রমণকারীদের মনে রাখতে হবে, শান্দুরের ইকোসিস্টেম নাজুক। পর্যটনের চাপ বাড়ায় পরিবেশগত ক্ষতির আশঙ্কার কথাও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে এসেছে। শান্দুর লেকের দূষণ, বর্জ্য ফেলা, পশুখাদ্যের ক্ষতি-এসব নিয়ে পরিবেশবিদরা উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাই সেখানে গেলে প্লাস্টিক বা আবর্জনা ফেলে না আসা, ক্যাম্পিংয়ের পর পরিষ্কার রাখা এবং স্থানীয় প্রকৃতির প্রতি সম্মান দেখানো গুরুত্বপূর্ণ।

 

ভ্রমণকারীর জন্য বাস্তব পরামর্শ

শান্দুর পাসে যাওয়ার আগে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার। প্রথমত, আবহাওয়া দ্রুত বদলে যেতে পারে-দিনে রোদ, বিকেলে ঠান্ডা বাতাস, রাতে তীব্র ঠান্ডা। তাই layered clothing নিন। দ্বিতীয়ত, মোবাইল নেটওয়ার্ক সবসময় স্থিতিশীল নাও থাকতে পারে। তৃতীয়ত, উৎসবের সময় গেলে আগাম বুকিং বা তাঁবু/ক্যাম্পের প্রস্তুতি দরকার হতে পারে। আর যদি একেবারে শান্ত প্রকৃতি দেখতে চান, তাহলে উৎসবের ভিড়ের বাইরে জুনের শুরু বা সেপ্টেম্বরে যাওয়া তুলনামূলক ভালো হতে পারে।

 

শান্দুর পাস এমন এক গন্তব্য, যেখানে ভ্রমণ মানে শুধু একটি জায়গা “দেখা” নয়-বরং একটি সম্পূর্ণ উচ্চভূমির অভিজ্ঞতার ভেতর ঢুকে যাওয়া। এখানে পাহাড় আছে, লেক আছে, নীরবতা আছে, আবার উৎসবের দিনে হাজার মানুষের উচ্ছ্বাসও আছে। আপনি যদি পাকিস্তানের উত্তরাঞ্চলে এমন কোনো জায়গা খুঁজে থাকেন, যেখানে প্রকৃতি ও সংস্কৃতি সমান শক্তিতে উপস্থিত, তাহলে শান্দুর পাস আপনার তালিকায় উপরের দিকেই থাকবে।


সম্পর্কিত নিউজ