ব্রাজিলকে টপকে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড জার্মানির

ব্রাজিলকে টপকে বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড জার্মানির
ছবির ক্যাপশান, ছবি: রয়টার্স

ফিফা বিশ্বকাপের দীর্ঘ ইতিহাসে নতুন একটি রেকর্ডের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। কুরাসাওকে ৭–১ গোলের বড় ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি গোল করা দলের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছে জার্মানি। চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা এতদিন ব্রাজিলের পেছনে থাকলেও এবারের আসরে দুর্দান্ত সূচনার মাধ্যমে নতুন মাইলফলক গড়ে ফেলেছে।

কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের আগে বিশ্বকাপে জার্মানির মোট গোলসংখ্যা ছিল ২৩২। এক ম্যাচেই সাত গোল করে সেই সংখ্যা ১১৩ ম্যাচে ২৩৯-এ পৌঁছেছে। এর ফলে ১১৫ ম্যাচে ২৩৮ গোল করা ব্রাজিলকে পেছনে ফেলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা দল হয়ে উঠেছে জার্মানি।

 

তবে এই লড়াই এখনো শেষ হয়ে যায়নি। কারণ ২০২৬ বিশ্বকাপের যাত্রা মাত্র শুরু হয়েছে। ব্রাজিলও তাদের প্রথম ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে এবং সামনের ম্যাচগুলোতে গোলসংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ফলে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা দলের লড়াই পুরো টুর্নামেন্টজুড়েই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে পারে।

 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে জার্মানির এই অর্জন মোটেও আকস্মিক নয়। ১৯৩৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপে অংশ নেওয়ার পর থেকেই দলটি ধারাবাহিকভাবে আক্রমণাত্মক ফুটবলের জন্য পরিচিত। জার্মানি শুধু চারবার বিশ্বকাপ জেতেনি, বরং সবচেয়ে বেশি সেমিফাইনাল, কোয়ার্টার ফাইনাল ও শেষ চারে ওঠা দলগুলোর মধ্যেও অন্যতম। তাদের ফুটবল দর্শনের কেন্দ্রবিন্দুতেই রয়েছে আক্রমণ, গতি এবং গোল।

 

এই রেকর্ড গড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন জার্মান ফুটবলের কিংবদন্তিরা। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা Miroslav Klose একাই বিশ্বকাপে ১৬ গোল করেছেন। এছাড়া Gerd Müller ১৪ গোল করে বহু বছর বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড ধরে রেখেছিলেন। বর্তমান প্রজন্মে Thomas Müller বিশ্বকাপ মঞ্চে জার্মানির হয়ে অন্যতম সফল গোলস্কোরার হিসেবে পরিচিত।

 

জার্মানির বিশ্বকাপ সাফল্যের ইতিহাসও সমৃদ্ধ। তারা ১৯৫৪, ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জিতেছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালে ব্রাজিলের মাটিতে স্বাগতিকদের ৭–১ গোলে হারিয়ে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় ম্যাচ উপহার দিয়েছিল জার্মানি। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, সেই ম্যাচই আধুনিক ফুটবলে জার্মানির আক্রমণাত্মক শক্তির সবচেয়ে বড় প্রতীক।

 

অন্যদিকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দল এখনো ব্রাজিলই। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ১৯৫৮, ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে শিরোপা জিতেছে। বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশ নেওয়া একমাত্র দলও ব্রাজিল। ফুটবল ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জয়, সবচেয়ে বেশি নকআউট ম্যাচ জয় এবং সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ অংশগ্রহণের রেকর্ডও তাদের দখলে রয়েছে।

 

ব্রাজিলের গোলের ইতিহাসও অসাধারণ। Pelé, Ronaldo Nazário, Romário, Rivaldo, Neymar এবং বর্তমান প্রজন্মের তারকারা মিলে বিশ্বকাপে ব্রাজিলের গোলসংখ্যাকে এতদূর নিয়ে গেছেন। একসময় বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলের ব্যবধানে অন্য সব দলকে ছাড়িয়ে ছিল সেলেসাওরা। তবে এবার প্রথমবারের মতো সেই অবস্থান হারাল তারা।

 

বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা দলগুলোর তালিকায় বর্তমানে তৃতীয় স্থানে রয়েছে Argentina। তিনবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের গোলসংখ্যা ৮৮ ম্যাচে ১৫২। যদিও গোলের হিসাবে তারা জার্মানি ও ব্রাজিল থেকে অনেকটাই পিছিয়ে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আর্জেন্টিনার ধারাবাহিক সাফল্য তাদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।

 

তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে France, যাদের বিশ্বকাপ গোলসংখ্যা ১৩৬। এরপর রয়েছে Italy (১২৮) এবং Spain (১০৮)। এই ছয়টি দেশই বিশ্বকাপ ইতিহাসে ১০০ বা তার বেশি গোল করা দল।

 

বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোল করা দলগুলোর বর্তমান তালিকা:

জার্মানি – ২৩৯ গোল (১১৩ ম্যাচ)

ব্রাজিল – ২৩৮ গোল (১১৫ ম্যাচ)

আর্জেন্টিনা – ১৫২ গোল (৮৮ ম্যাচ)

ফ্রান্স – ১৩৬ গোল

ইতালি – ১২৮ গোল

স্পেন – ১০৮ গোল

 

ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, জার্মানির এই রেকর্ড শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিশ্বকাপে তাদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্সের প্রতিফলন। তবে একই সঙ্গে এটিও সত্য যে ব্রাজিল খুব কাছেই রয়েছে। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের সঙ্গে সঙ্গে এই রেকর্ড হাতবদলের সম্ভাবনাও থাকছে।

 

গত দুই বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেওয়ার হতাশা নিয়ে এবারের আসরে মাঠে নেমেছে জার্মানি। কুরাসাওয়ের বিপক্ষে ৭–১ গোলের জয় শুধু তাদের আত্মবিশ্বাসই বাড়ায়নি, বরং বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ একটি রেকর্ডও এনে দিয়েছে। এখন তাদের লক্ষ্য শুধু গোলের রেকর্ড ধরে রাখা নয়, বরং ২০১৪ সালের পর আবারও বিশ্বকাপ ট্রফি জার্মানিতে ফিরিয়ে নেওয়া।

 

জার্মানি তাদের পরবর্তী ম্যাচ খেলবে ২১ জুন আইভরি কোস্টের বিপক্ষে। অন্যদিকে ব্রাজিলের সামনে রয়েছে গোলসংখ্যা বাড়িয়ে আবারও শীর্ষস্থান পুনর্দখলের সুযোগ। ফলে বিশ্বকাপের মাঠে শিরোপার পাশাপাশি ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা দলের লড়াইটিও হয়ে উঠেছে সমান আকর্ষণীয়।


সম্পর্কিত নিউজ