বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বেতন পাচ্ছেন কোন কোচ?

বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বেতন পাচ্ছেন কোন কোচ?
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

শুরু হয়ে গেছে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মহাযজ্ঞ। ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ফুটবলের সবচেয়ে বড় এই আসর। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে মোট ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। তবে এবারের বিশ্বকাপ শুধু অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা বৃদ্ধির কারণেই নয়, কোচদের পেছনে ব্যয় হওয়া বিপুল অর্থের কারণেও নতুন এক মাইলফলক গড়তে যাচ্ছে।

আধুনিক ফুটবলে একজন কোচের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে। মাঠের কৌশল নির্ধারণ, প্রতিপক্ষ বিশ্লেষণ, খেলোয়াড় ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর ডেটা বিশ্লেষণ এবং বড় টুর্নামেন্টে মানসিক চাপ সামলানোর ক্ষেত্রে কোচই হয়ে উঠেছেন দলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একজন। ফলে বিশ্বকাপকে সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের ফুটবল ফেডারেশনগুলো বিশ্বসেরা কোচদের নিয়োগ দিতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে।

 

বিদেশি কোচদের আধিপত্য

এবারের বিশ্বকাপের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিদেশি কোচের আধিপত্য। অংশগ্রহণকারী ৪৮ দলের মধ্যে ৩১টি দলই নিজ দেশের বাইরে থেকে প্রধান কোচ নিয়োগ দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, আধুনিক ফুটবল দর্শন এবং বড় টুর্নামেন্ট পরিচালনার দক্ষতার কারণে বিদেশি কোচদের চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

 

বিশেষ করে দক্ষিণ আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার বেশ কয়েকটি দল ইউরোপের অভিজ্ঞ কোচদের দায়িত্ব দিয়েছে। অনেক ফেডারেশন মনে করছে, বিশ্বকাপে সফল হতে হলে এখন শুধু ভালো খেলোয়াড় থাকলেই হবে না, বিশ্বমানের কোচও প্রয়োজন।

 

সর্বোচ্চ বেতনের কোচ কার্লো আনচেলত্তি

বিশ্বকাপের কোচদের বেতন নিয়ে প্রকাশিত একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এবারের বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি বেতন পাওয়া কোচ হলেন ব্রাজিলের দায়িত্বে থাকা ইতালিয়ান কিংবদন্তি কার্লো আনচেলত্তি। ২০২৫ সালের মে মাসে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (সিবিএফ) তাকে জাতীয় দলের দায়িত্ব দেয়। পরবর্তীতে তার চুক্তির মেয়াদ ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূত্র অনুযায়ী, আনচেলত্তির বার্ষিক আয় ৯.৫ থেকে ১০ মিলিয়ন ইউরোর মধ্যে, যা ডলারে প্রায় ১ কোটি ১৩ লাখ ডলারের সমান।

 

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সফল কোচ হিসেবে পরিচিত আনচেলত্তি পাঁচবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জিতেছেন এবং ইউরোপের শীর্ষ পাঁচটি লিগেই শিরোপা জয়ের অনন্য কীর্তি গড়েছেন। ব্রাজিল তাকে নিয়োগ দিয়েছে মূলত ২০০২ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয়ের লক্ষ্য নিয়ে।

 

ইউরোপীয় কোচদের শক্ত অবস্থান

বেতনের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন জার্মানির কোচ জুলিয়ান নাগেলসমান। তার বার্ষিক আয় প্রায় ৭৯ লাখ ডলার। বয়সে তুলনামূলক তরুণ হলেও আধুনিক ফুটবলের অন্যতম মেধাবী কৌশলবিদ হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। তৃতীয় স্থানে রয়েছেন স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মাউরিসিও পোচেত্তিনো। আর্জেন্টাইন এই কোচের বার্ষিক আয় প্রায় ৬৮ লাখ ডলার। টটেনহ্যাম, পিএসজি ও চেলসির মতো ক্লাবে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও অন্যতম চাহিদাসম্পন্ন কোচে পরিণত করেছে।

 

ইংল্যান্ডের কোচ থমাস টুখেল বছরে প্রায় ৬৫ লাখ ডলার আয় করে তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছেন। চেলসি ও বায়ার্ন মিউনিখে সাফল্যের পর ইংল্যান্ড তাকে বিশ্বকাপ জয়ের মিশনে দায়িত্ব দিয়েছে।

 

২০২৬ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া ১০ কোচ

১. কার্লো আনচেলত্তি (ব্রাজিল) – ১ কোটি ১৩ লাখ ডলার

২. জুলিয়ান নাগেলসমান (জার্মানি) – ৭৯ লাখ ডলার

৩. মাউরিসিও পোচেত্তিনো (যুক্তরাষ্ট্র) – ৬৮ লাখ ডলার

৪. থমাস টুখেল (ইংল্যান্ড) – ৬৫ লাখ ডলার

৫. রবার্তো মার্তিনেজ (পর্তুগাল) – ৪৫ লাখ ডলার

৬. ফাবিও কানাভারো (উজবেকিস্তান) – ৪৫ লাখ ডলার

৭. জেসি মার্শ (কানাডা) – ২৮ লাখ ডলার

৮. হাভিয়ের আগিরে (মেক্সিকো) – ২৮ লাখ ডলার

৯. গুস্তাভো আলফারো (প্যারাগুয়ে) – ২৮ লাখ ডলার

১০. লিওনেল স্কালোনি (আর্জেন্টিনা) – ২৬ লাখ ডলার

 

২০২২ বিশ্বকাপে কারা ছিলেন সর্বোচ্চ বেতনভোগী কোচ?

চার বছর আগের কাতার বিশ্বকাপেও কোচদের বেতন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। ২০২২ বিশ্বকাপের আগে প্রকাশিত বেতন তালিকায় শীর্ষে ছিলেন জার্মানির কোচ হান্সি ফ্লিক। তার বার্ষিক বেতন ছিল প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন ইউরো। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন ইংল্যান্ডের গ্যারেথ সাউথগেট, যার বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ৫.৮ মিলিয়ন ইউরো। তৃতীয় স্থানে ছিলেন ফ্রান্সের দিদিয়ের দেশম, যার আয় ছিল প্রায় ৩.৮ মিলিয়ন ইউরো।

 

২০২২ সালের শীর্ষ পাঁচ বেতনভোগী কোচের তালিকায় আরও ছিলেন ব্রাজিলের তিতে এবং নেদারল্যান্ডসের লুই ফন গাল। সেই সময় সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া কোচের আয় এবং বর্তমান বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ বেতন পাওয়া কোচের আয়ের মধ্যে পার্থক্য প্রায় দ্বিগুণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোচদের মূল্য কতটা বেড়েছে তারই প্রমাণ।

 

কেন এত অর্থ ব্যয় করছে ফুটবল ফেডারেশনগুলো?

বিশেষজ্ঞদের মতে, আধুনিক ফুটবলে সাফল্যের বড় অংশ নির্ভর করে কোচিং স্টাফের ওপর। উন্নত ডেটা অ্যানালাইসিস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ম্যাচ বিশ্লেষণ, খেলোয়াড়দের ফিটনেস ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিপক্ষের কৌশল ভাঙার পরিকল্পনা তৈরিতে কোচদের ভূমিকা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 

বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে একটি ভুল সিদ্ধান্ত পুরো দেশের স্বপ্ন ভেঙে দিতে পারে। আবার একজন দক্ষ কোচ তুলনামূলক দুর্বল দলকেও অনেক দূর নিয়ে যেতে পারেন। মরক্কোর সাম্প্রতিক বিশ্বকাপ সাফল্য কিংবা আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ জয়ে লিওনেল স্কালোনির ভূমিকা তার বড় উদাহরণ।

 

কোচিং বেঞ্চেও চলছে বিশ্বকাপের প্রতিযোগিতা

২০২৬ বিশ্বকাপের দিকে তাকালে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, প্রতিযোগিতা শুধু মাঠে নয়, কোচিং বেঞ্চেও চলছে। বিশ্বসেরা কোচদের নিয়ে দেশগুলোর এই বিপুল বিনিয়োগ প্রমাণ করে যে আধুনিক ফুটবলে একজন দক্ষ কোচ কেবল দল পরিচালনাই করেন না, বরং পুরো ফুটবল প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন।

 

তাই এবারের বিশ্বকাপে খেলোয়াড়দের পাশাপাশি আলোচনার কেন্দ্রেও থাকবেন আনচেলত্তি, টুখেল, নাগেলসমান, পোচেত্তিনো কিংবা স্কালোনির মতো তারকা কোচরা। শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপ ট্রফি কার হাতে উঠবে, তার পেছনে কোচিং বেঞ্চের অবদানও যে বড় ভূমিকা রাখবে, তা নিয়ে খুব কম মানুষেরই দ্বিমত রয়েছে।


সম্পর্কিত নিউজ