অরণ্যের এক অদৃশ্য আত্মা! কেন বিজ্ঞানীরাও এই অর্কিডকে খুঁজে পেতে হিমশিম খান?

অরণ্যের এক অদৃশ্য আত্মা! কেন বিজ্ঞানীরাও এই অর্কিডকে খুঁজে পেতে হিমশিম খান?
ছবির ক্যাপশান, অরণ্যের এক অদৃশ্য আত্মা! কেন বিজ্ঞানীরাও এই অর্কিডকে খুঁজে পেতে হিমশিম খান?
  • Author,
  • Role, জাগরণ নিউজ বাংলা

নাম 'ঘোস্ট অর্কিড', কিন্তু তার রূপ আর দুর্লভতা কোনো কাল্পনিক গল্পকেও যেন হার মানায়। ফ্লোরিডার দুর্গম জলাভূমি আর কিউবার গভীর অরণ্য, যেখানে লুকিয়ে আছে প্রকৃতির এই রহস্যময় বিস্ময়। এটি যেন রাতের অন্ধকারে প্রেতাত্মার মতো সাদা আভা ছড়ানো এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। উদ্ভিদবিদ্যার জগতে একে খুঁজে পাওয়া লটারিতে জেতার চেয়েও কঠিন।

সাধারণত একটি গাছের পরিচয় হয় তার সবুজ পাতা দিয়ে, যা সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় খাবার তৈরি করে। কিন্তু Dendrophylax lindenii বা ঘোস্ট অর্কিডের কোনো পাতা নেই। এটি একটি 'এপিফাইট' (Epiphyte) উদ্ভিদ, যা অন্য গাছের, সাধারণত পপ বা সাইপ্রাস গাছের গায়ে লেগে থেকে বেঁচে থাকে। এর শিকড়গুলো দেখতে অনেকটা সবুজ মাকড়সার জালের মতো, যা গাছের বাকল আঁকড়ে থাকে। পাতা না থাকায় এই শিকড়গুলোই ক্লোরোফিলের সাহায্যে সূর্যের আলো থেকে সামান্য খাবার তৈরি করে।


এটি বিজ্ঞানীদের জন্য চ্যালেঞ্জ কেন?

ঘোস্ট অর্কিডকে খুঁজে পাওয়া এবং পর্যবেক্ষণ করা বেশ কঠিন। তার পেছনে রয়েছে বেশ কিছু বৈজ্ঞানিক ও ভৌগোলিক কারণ।

যখন এই অর্কিডে ফুল ফোটে না, তখন এটি গাছের বাকলের সাথে এমনভাবে মিশে থাকে যে অভিজ্ঞ চোখও একে আলাদা করতে পারে না। এর শিকড়গুলো বাকলের রঙের সাথে হুবহু মিলে যায়। এটি কেবল বছরে একবার, জুন-জুলাই মাসের দিকে ফুল ফোটায়। তাও প্রতি বছর ফুল ফুটবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

এই ফুলটি কোনো সাধারণ বাগানে জন্মায় না। এটি বাস করে ফ্লোরিডার 'এভারগ্লেডস' (Everglades) বা কিউবার গহীন জলাভূমিতে, যেখানে বিষাক্ত সাপ, কুমির আর মশার রাজত্ব। বিজ্ঞানীরা বুক সমান পানির নিচে নেমে, কাদা মাড়িয়ে এই ফুলের সন্ধান করেন। অনেক সময় মাইলের পর মাইল হেঁটেও একটি ফুলের দেখা পাওয়া যায় না।

ঘোস্ট অর্কিডের পরাগায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল ধরনের হয়ে থাকে। এর নেক্টার বা মধু এক দীর্ঘ নলের শেষ প্রান্তে থাকে, যেখানে পৌঁছানো সাধারণ পতঙ্গদের জন্য অসম্ভব। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ভাবতেন কেবল 'জায়ান্ট স্ফিংস মথ' (Giant Sphinx Moth) তার দীর্ঘ শুঁড় দিয়ে এর পরাগায়ন ঘটায়। তবে সাম্প্রতিক ইনফ্রারেড ক্যামেরা গবেষণায় দেখা গেছে, আরও কয়েক প্রজাতির মথ এই প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়। এই নির্দিষ্ট নির্ভরতার কারণে এর বংশবৃদ্ধি প্রচন্ড ধীর গতিতে হয়ে থাকে।


যেহেতু পাতা নেই, তাই এর শিকড়গুলো স্পঞ্জের মতো কাজ করে। এগুলো বাতাস থেকে আর্দ্রতা এবং বৃষ্টির পানি শুষে নেয়। শিকড়ের ওপরের 'ভেলামেন' (Velamen) নামক সাদা স্তরটি একে রোদে পুড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। দিনের বেলা এই ফুলের কোনো ঘ্রাণই থাকে না। কিন্তু সূর্য ডোবার পর এটি তীব্র সুগন্ধ ছড়ায় যাতে রাতের মথগুলো আকৃষ্ট হয়। এই কৌশলটি একে দিনের অন্যান্য ফুল থেকে আলাদা করে।


বিলুপ্তির মুখে এক অদৃশ্য সৌন্দর্য!

জলবায়ু পরিবর্তন, চোরাশিকারিদের উপদ্রব এবং বনাঞ্চল ধ্বংসের কারণে ঘোস্ট অর্কিড এখন বিলুপ্তপ্রায়। অনেকে একে জঙ্গল থেকে চুরি করে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, কিন্তু ৯৯% ক্ষেত্রেই বাড়ির পরিবেশে এই ফুল বাঁচে না। কারণ এটি বেঁচে থাকার জন্য বনের বিশেষ 'ছত্রাক' বা মাইকোরাইজা (Mycorrhiza)-র ওপর নির্ভরশীল, যা কেবল সেই গভীর অরণ্যেই পাওয়া যায়।

একারণেই একে 'অদৃশ্য' বলা হয়। এটি প্রকৃতপক্ষে মানুষের চোখের আড়ালে থাকতেই পছন্দ করে। একে রক্ষা করার অর্থ হলো পৃথিবীর সেই আদিম ও অস্পৃশ্য ইকোসিস্টেমকে রক্ষা করা, যা ছাড়া মহাবিশ্বের বৈচিত্র্য অপূর্ণ থেকে যাবে।


সম্পর্কিত নিউজ