নতুন আইফোনে সমস্যা নিয়ে ব্যবহারকারীদের অভিযোগ

নতুন আইফোনে সমস্যা নিয়ে ব্যবহারকারীদের অভিযোগ
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী এআই জেনারেটেড ছবি

আইফোন ১৭, আইফোন ১৭ প্রো ও আইফোন এয়ার সিরিজের কিছু ব্যবহারকারী অদ্ভুত এক সমস্যার অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, ফোনের ব্যাটারি পুরোপুরি শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেলে সাধারণ ইউএসবি-সি কেবল দিয়ে চার্জে বসানোর পরও ফোন দ্রুত চালু হচ্ছে না। অনেক ক্ষেত্রে পর্দায় চার্জিং আইকন দেখা যাচ্ছে না, অ্যাপলের লোগোও ভেসে উঠছে না। ফলে ব্যবহারকারীরা প্রথমে ধারণা করছেন, ফোনটি হয়তো নষ্ট হয়ে গেছে বা ‘ব্রিক’ হয়ে গেছে।

প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট 9to5Mac-এর বেঞ্জামিন মায়ো নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে জানান, তার আইফোন এয়ারের ব্যাটারি রাতে পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়। পরে ফোনটি দ্রুত চার্জে বসানো হলেও কয়েক মিনিট সেটি কোনো সাড়া দেয়নি। এমনকি ম্যাকের সঙ্গে যুক্ত করলেও ফোনটি শনাক্ত হয়নি। একাধিক ইউএসবি-সি কেবল, চার্জার ও ফোর্স রিস্টার্ট চেষ্টা করেও তিনি প্রথমে ফোনটি চালু করতে পারেননি। পরে অনলাইন ফোরামে একই ধরনের ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতা দেখে তিনি ম্যাগসেফ চার্জার ব্যবহার করেন এবং কিছু সময় পর ফোনটি চালু হয়।

 

কোন মডেলে সমস্যা দেখা যাচ্ছে

প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমস্যাটি আইফোন এয়ারের পাশাপাশি আইফোন ১৭ ও আইফোন ১৭ প্রো সিরিজের কিছু ডিভাইসে দেখা যাচ্ছে। তবে এটি সব ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে ঘটছে না। আবার একই ফোনের ব্যাটারি প্রতিবার শূন্যে নামলেই যে এমন হবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। কারও ক্ষেত্রে একবার ঘটেছে, আবার কারও ক্ষেত্রে একই সমস্যা একাধিকবার দেখা গেছে। Digital Today-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, iPhone Air ও iPhone 17 লাইনআপে এমন অভিযোগ পাওয়া গেলেও সমস্যার বিস্তার কতটা বড়, তা এখনো পরিষ্কার নয়।

রেডিটের কয়েকটি আলোচনাতেও ব্যবহারকারীরা জানান, ফোন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ইউএসবি-সি চার্জিং কোনো সাড়া দিচ্ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অ্যাপল স্টোরে নেওয়ার পর টেকনিশিয়ানরা ম্যাগসেফ চার্জারে রেখে ফোনটি চালু করতে সক্ষম হন বলে ব্যবহারকারীরা দাবি করেছেন।

 

কী ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে

ব্যবহারকারীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সমস্যার লক্ষণগুলো বেশ মিল আছে। ব্যাটারি ০ শতাংশে নেমে ফোন বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তারযুক্ত চার্জারে যুক্ত করলেও ফোনে কম ব্যাটারির আইকন দেখা যায় না। অ্যাপল লোগোও দেখা যায় না। ফোর্স রিস্টার্ট করার চেষ্টা করলেও অনেক সময় কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায় না। ম্যাক বা কম্পিউটারে যুক্ত করলেও ফোনটি শনাক্ত নাও হতে পারে।

BGR-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু ব্যবহারকারী USB power meter দিয়ে পরীক্ষা করে দেখেছেন, ফোন এই অবস্থায় তারযুক্ত চার্জারে যুক্ত থাকলেও পাওয়ার ইনপুট স্থিতিশীল ছিল না, কখনো শূন্য, কখনো অল্প মাত্রায় ওঠানামা করছিল। এতে ধারণা করা হচ্ছে, ফোনটি চার্জ নেওয়ার চেষ্টা করলেও কোনো কারণে ইউএসবি-সি চার্জিং প্রক্রিয়া ঠিকভাবে শুরু করতে পারছে না।

 

সম্ভাব্য কারণ কী হতে পারে

এখন পর্যন্ত অ্যাপল আনুষ্ঠানিকভাবে এই সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করেনি। তাই বিষয়টি নিশ্চিতভাবে হার্ডওয়্যার নাকি সফটওয়্যারজনিত, তা বলা যাচ্ছে না। তবে প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও ব্যবহারকারীদের আলোচনায় কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ উঠে এসেছে।

প্রথমত, ব্যাটারি পুরোপুরি শেষ হয়ে গেলে ফোনের পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম অত্যন্ত কম শক্তির অবস্থায় চলে যেতে পারে। সেই অবস্থায় ইউএসবি-সি পোর্ট দিয়ে চার্জিং শুরু করার জন্য ফোনকে নির্দিষ্ট মাত্রার ভোল্টেজ বা পাওয়ার নেগোসিয়েশন দরকার হতে পারে। কোনো কারণে সেটি ঠিকভাবে শুরু না হলে ফোনটি কালো পর্দায় আটকে থাকতে পারে।

দ্বিতীয়ত, ইউএসবি-সি চার্জিংয়ে চার্জার, কেবল ও ডিভাইসের মধ্যে পাওয়ার ডেলিভারি বা চার্জিং প্রোটোকল নিয়ে একটি প্রাথমিক যোগাযোগ দরকার হয়। ফোন যদি অত্যন্ত কম শক্তির অবস্থায় থাকে, সেই যোগাযোগ ঠিকমতো শুরু না-ও হতে পারে। তবে এগুলো এখনো অনুমানভিত্তিক ব্যাখ্যা, অ্যাপল কোনো নির্দিষ্ট কারিগরি কারণ নিশ্চিত করেনি।

 

ম্যাগসেফ বা ওয়্যারলেস চার্জারে কেন কাজ করছে

ব্যবহারকারীদের অভিজ্ঞতায় এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর সাময়িক সমাধান হিসেবে ম্যাগসেফ বা Qi ওয়্যারলেস চার্জিংয়ের কথা উঠে এসেছে। অনেকেই জানিয়েছেন, ফোনটি ম্যাগসেফ চার্জার বা ওয়্যারলেস চার্জিং প্যাডে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দিলে অ্যাপল লোগো দেখা যায় এবং ফোন চালু হতে শুরু করে। এরপর সাধারণ ইউএসবি-সি কেবল দিয়েও চার্জ করা যায়।

BGR-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অ্যাপলের অফিসিয়াল নির্দেশনায় সাধারণত ফোর্স রিস্টার্ট এবং অন্তত এক ঘণ্টা চার্জে রাখার কথা বলা হলেও এই নির্দিষ্ট সমস্যায় অনেক ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রে তারযুক্ত চার্জিং যথেষ্ট ছিল না। তাদের ক্ষেত্রে ম্যাগসেফ বা Qi ওয়্যারলেস চার্জিং ফোনটিকে আবার সচল করতে সাহায্য করেছে।

 

অ্যাপলের অফিসিয়াল পরামর্শ কী

অ্যাপলের নিজস্ব সাপোর্ট পেজে বলা হয়েছে, আইফোন চালু না হলে বা স্ক্রিন কালো থাকলে প্রথমে ফোর্স রিস্টার্ট করতে হবে। Face ID-যুক্ত আইফোনে এর জন্য ভলিউম আপ দ্রুত চাপতে হবে, এরপর ভলিউম ডাউন দ্রুত চাপতে হবে, তারপর সাইড বাটন ধরে রাখতে হবে যতক্ষণ না অ্যাপল লোগো দেখা যায়। অ্যাপল আরও বলেছে, এরপরও ফোন চালু না হলে এক ঘণ্টা চার্জে রেখে আবার চেষ্টা করতে হবে। তবু কাজ না করলে সার্ভিস নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে।

তবে নতুন অভিযোগের ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা বলছেন, অ্যাপলের এই প্রচলিত পদ্ধতি সব সময় কাজ করছে না। বিশেষ করে ব্যাটারি সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার পর ফোনটি তারযুক্ত চার্জারে কোনো সাড়া না দিলে ম্যাগসেফ বা ওয়্যারলেস চার্জিংই আপাতত সবচেয়ে কার্যকর উপায় হিসেবে দেখা যাচ্ছে।

 

ব্যবহারকারীদের কী করা উচিত

যাদের আইফোন ১৭, ১৭ প্রো বা আইফোন এয়ার আছে, তাদের জন্য সবচেয়ে সহজ সতর্কতা হলো ফোনের ব্যাটারি একেবারে ০ শতাংশে নামতে না দেওয়া। ব্যাটারি ১০ থেকে ২০ শতাংশে নেমে এলে চার্জে বসানো ভালো। দীর্ঘ সময় বাইরে থাকলে পাওয়ার ব্যাংক বা ম্যাগসেফ চার্জার সঙ্গে রাখা যেতে পারে।

ফোন বন্ধ হয়ে গেলে এবং তারযুক্ত চার্জারে সাড়া না দিলে প্রথমে চার্জার ও কেবল বদলে দেখা যেতে পারে। এরপর অ্যাপলের নির্দেশনা অনুযায়ী ফোর্স রিস্টার্ট চেষ্টা করা যেতে পারে। তবুও কাজ না করলে ফোনটি ম্যাগসেফ বা অন্য Qi ওয়্যারলেস চার্জারে ১০ থেকে ১৫ মিনিট রেখে দেখা যেতে পারে। এতে ফোন চালু হলে পরে কেবল দিয়ে চার্জ করা যেতে পারে।

যদি ফোন বারবার একই সমস্যায় পড়ে, চার্জ নিতে অস্বাভাবিক সময় লাগে, ব্যাটারি দ্রুত শেষ হয় বা ম্যাগসেফেও চালু না হয়, তাহলে অ্যাপল সাপোর্ট বা অনুমোদিত সার্ভিস সেন্টারে যোগাযোগ করা উচিত। কারণ একই লক্ষণের পেছনে ব্যাটারি, চার্জিং পোর্ট, কেবল, চার্জার বা সফটওয়্যার-যে কোনো কারণ থাকতে পারে।

 

অ্যাপলের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নেই

এখন পর্যন্ত অ্যাপল এই নির্দিষ্ট অভিযোগ নিয়ে কোনো প্রকাশ্য বিবৃতি দেয়নি। তাই এটি সীমিত সংখ্যক ডিভাইসের সমস্যা, নির্দিষ্ট সফটওয়্যার বাগ, নাকি চার্জিং ব্যবস্থার কোনো গভীর ত্রুটি-তা নিশ্চিত নয়। তবে অনলাইন ফোরাম, প্রযুক্তি প্রতিবেদক ও বিভিন্ন প্রযুক্তি সাইটের রিপোর্টে একই ধরনের অভিজ্ঞতা উঠে আসায় বিষয়টি আইফোন ১৭ সিরিজ ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, যদি এটি সফটওয়্যার বা পাওয়ার ম্যানেজমেন্ট বাগ হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ iOS আপডেটে সমাধান আসতে পারে। তবে যদি সমস্যাটি চার্জিং সার্কিট বা হার্ডওয়্যার-সম্পর্কিত হয়, তাহলে অ্যাপলকে সার্ভিস বা রিপেয়ার প্রোগ্রামের মতো পদক্ষেপ নিতে হতে পারে। আপাতত ব্যবহারকারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পরামর্শ হলো-ব্যাটারি পুরোপুরি শেষ হতে না দেওয়া এবং জরুরি অবস্থায় ম্যাগসেফ বা ওয়্যারলেস চার্জার ব্যবহার করা।

 


সম্পর্কিত নিউজ