কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে ‘কৃষি তথ্য সার্ভিস’

কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে ‘কৃষি তথ্য সার্ভিস’
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

দেশের কৃষি খাতের টেকসই উন্নয়ন, আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তার এবং কৃষকদের দোরগোড়ায় নির্ভরযোগ্য তথ্যসেবা পৌঁছে দিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক, অনলাইন এবং মাল্টিমিডিয়া গণমাধ্যমের সমন্বিত ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি মাঠপর্যায়ে কৃষকদের মধ্যে তথ্যভিত্তিক কৃষিচর্চা সম্প্রসারণে এক নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে।

১৯৬১ সালে ‘কৃষি তথ্য সংস্থা’ হিসেবে যাত্রা শুরু করা প্রতিষ্ঠানটি সময়ের সঙ্গে নানা পরিবর্তন ও আধুনিকায়নের মধ্য দিয়ে ১৯৮৮ সালে ‘কৃষি তথ্য সার্ভিস’ নামে রূপান্তরিত হয়। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী ফার্ম ম্যাগাজিন ‘মাসিক কৃষিকথা’, আধুনিক ‘কৃষি কল সেন্টার (১৬১২৩)’, ‘কৃষি তথ্য বার্তা’, ডিজিটাল ওয়েব পোর্টাল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক বিভিন্ন সেবার মাধ্যমে দেশের কোটি কৃষকের বিশ্বস্ত তথ্যসহযোগীতে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।

 

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়কালে কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) বিভিন্ন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ও প্রাচীন কৃষিবিষয়ক ম্যাগাজিন ‘মাসিক কৃষিকথা’র ৮ লাখ ৮৭ হাজার কপি বিতরণ করা হয়েছে। মাত্র ১০ টাকা মূল্যের এই প্রকাশনার বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা প্রায় ৯৬ হাজার, আর অনলাইন পাঠকসংখ্যা ১৫ লক্ষাধিক।

 

কৃষকদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ প্রদানের লক্ষ্যে পরিচালিত কৃষি কল সেন্টার (১৬১২৩) এ সময়ে ৬৯ হাজার ৫৫৫টি কল গ্রহণ করে তাৎক্ষণিক সেবা প্রদান করেছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ২০০টি কলের মাধ্যমে কৃষকরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও তথ্য পেয়েছেন।

 

এ সময় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা ও কৃষকদের মধ্যে এক লাখ তিন হাজার কৃষি ডায়েরি এবং ২৪ হাজার কপি ‘কৃষি তথ্য বার্তা’ বিনামূল্যে বিতরণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষকদের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি সম্পর্কে অবহিত করতে ২ লাখ ৫ হাজার কপি বিভিন্ন লিফলেট, ফোল্ডার, ফেস্টুন ও স্টিকার মাঠপর্যায়ে বিতরণ করা হয়েছে।

 

শুধু মুদ্রিত তথ্যসেবাই নয়, আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর প্রচার কার্যক্রমেও সক্রিয় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। আলোচ্য সময়ে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ওপর নির্মিত ৭৫০টি ফিল্ম ও সিনেমা শো প্রদর্শন করা হয়েছে। পাশাপাশি কৃষকদের তাৎক্ষণিক সমস্যা সমাধান ও সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৪২টি কৃষিভিত্তিক পডকাস্ট বা রিলস তৈরি ও প্রচার করা হয়েছে।

 

এছাড়াও এআইএস-এর নিজস্ব ওয়েবসাইট (ais.gov.bd) এবং ডিজিটাল ভিডিও পোর্টাল ‘এআইএস টিউব’ (www.aistube.com)-এর মাধ্যমে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সফল কৃষকদের অনুপ্রেরণামূলক গল্প এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্ভাবনী কার্যক্রম নিয়মিতভাবে প্রচার করা হচ্ছে।

 

আরও পড়ুন: শব্দে শব্দে কুরআন পাঠ করার সুবিধা কী?

 

গণমাধ্যমভিত্তিক কৃষি তথ্য প্রচারেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি। বাংলাদেশ বেতারের ১৮টি কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান প্রচার এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠান ‘বাংলার কৃষি’ সমন্বয়ের দায়িত্বও পালন করছে কৃষি তথ্য সার্ভিস।

 

কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এআইএস ইতোমধ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অসংখ্য মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার অর্জন করেছে। এর মধ্যে জাতীয় ডিজিটাল উদ্ভাবনী পদক (২০১০ ও ২০১১), ই-ডিজিটাল উদ্ভাবনী মেলা পুরস্কার (২০১১-১২), আন্তর্জাতিক ‘দি মন্থন অ্যাওয়ার্ড সাউথ এশিয়া’ (২০১২), এম-বিলিয়নথ অ্যাওয়ার্ড (২০১৮) এবং ডিজিটাল ওয়ার্ল্ড অ্যাওয়ার্ড (২০২০) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

 

কৃষি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের খাদ্য নিরাপত্তাকে আরও টেকসই ও শক্তিশালী করতে স্মার্ট কৃষির কোনো বিকল্প নেই। আর সেই লক্ষ্য অর্জনে কৃষি তথ্য সার্ভিসকে আরও আধুনিকায়ন, নিজস্ব কার্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বাজেট বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি।

 

এ বিষয়ে কৃষি তথ্য সার্ভিসের পরিচালক মো. মসীহুর রহমান বলেন, সীমাবদ্ধতা ও কিছু কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমাদের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাঠপর্যায়ে কৃষকদের তথ্যসেবা সচল রাখতে শতভাগ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছেন।

 

তিনি বলেন, সরকারের সদিচ্ছা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে আমরা ‘মাসিক কৃষিকথা’ ও ‘কৃষি কল সেন্টার’-এর মতো সেবাগুলোকে প্রান্তিক চাষিদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি। প্রযুক্তির এই যুগে আমরা ডিজিটাল ও স্মার্ট প্ল্যাটফর্মের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছি, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তের একজন কৃষক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর সমস্যার সমাধান পেতে পারেন।

 

পরিচালক আরও আশা প্রকাশ করে বলেন, চলমান শূন্যপদগুলো পূরণ করা গেলে এবং আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পেলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও স্মার্ট কৃষি রূপান্তরে আমরা আরও বড় অবদান রাখতে সক্ষম হব।

 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস) দেশের কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ। মাঠপর্যায়ে আমাদের কৃষি কর্মকর্তারা যে নতুন প্রযুক্তি বা উদ্ভাবন নিয়ে কাজ করেন, এআইএস তা গণমাধ্যম ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুততম সময়ে কোটি কোটি কৃষকের কাছে সহজবোধ্যভাবে পৌঁছে দিচ্ছে।

 

তিনি বলেন, ‘কৃষি কল সেন্টার’ এবং কৃষি ডায়েরি ও বিভিন্ন প্রকাশনা মাঠপর্যায়ের কাজের গতি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে।

 

মহাপরিচালক আরও বলেন, মাঠপর্যায়ের এই কার্যক্রমগুলো নিখুঁত সমন্বয়ের ফলেই বাংলাদেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা বজায় রাখতে সক্ষম হচ্ছে। উদ্ভূত যেকোনো চ্যালেঞ্জ কিংবা জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা এবং আগামী দিনের ‘স্মার্ট কৃষি’ বিনির্মাণে কৃষি তথ্য সার্ভিসের প্রচার কার্যক্রম ও আইসিটি সক্ষমতা আরও জোরদার করা হবে। এর মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক কৃষি খাতকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে।

 

তথ্যসূত্র: বাসস


সম্পর্কিত নিউজ