মমতার বাড়ির বাইরে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান, পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের পথে বিজেপি

মমতার বাড়ির বাইরে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান, পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের পথে বিজেপি
ছবির ক্যাপশান, মমতার বাড়ির বাইরে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান, পশ্চিমবঙ্গে সরকার গঠনের পথে বিজেপি

দেড় দশকের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে প্রথমবারের মতো সরকার গঠনের পথে এগিয়ে যাচ্ছে ভারতীয় জনতা পার্টি, বিজেপি। সোমবার, ৪ মে সকাল থেকে শুরু হওয়া ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ভোট গণনার প্রাথমিক ফল ও প্রবণতায় এমন ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ফলাফলের এই প্রবণতা স্পষ্ট হতেই রাজ্যজুড়ে বিজেপি কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে।

নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ প্রবণতা অনুযায়ী, ২৯৪ আসনের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজন ১৪৮টি আসন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, বিজেপি ১৯০টিরও বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন তৃণমূল কংগ্রেস ১০০টির নিচে নেমে এসেছে। তবে চূড়ান্ত ফল ঘোষণা না হওয়া পর্যন্ত এই সংখ্যা পরিবর্তন হতে পারে।

 

ফলাফলের প্রবণতা প্রকাশের পর কলকাতার কালীঘাটে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবনের বাইরেও বিজেপি সমর্থকদের জড়ো হতে দেখা গেছে বলে স্থানীয় প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। সেখানে তারা ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দেন। তৃণমূল কংগ্রেসের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত কালীঘাটে এমন দৃশ্যকে বিজেপি শিবির বড় প্রতীকী সাফল্য হিসেবে দেখছে।

 

অন্যদিকে তৃণমূলের প্রধান কার্যালয়সহ বিভিন্ন এলাকায় দলটির সমর্থকদের মধ্যে হতাশা দেখা গেছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূল কংগ্রেস ছিল সবচেয়ে শক্তিশালী দল। ২০১১ সালে বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর টানা ১৫ বছর রাজ্যের ক্ষমতায় ছিল তৃণমূল।

 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহাসিক অগ্রগতির পথে রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ এমন একটি রাজ্য, যেখানে বিজেপি আগে কখনো ক্ষমতায় আসেনি। ২০২১ সালের আগ পর্যন্ত রাজ্য বিধানসভায় বিজেপির উপস্থিতি ছিল খুব সীমিত। এবার সেই দলই ক্ষমতার দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছে।

 

নির্বাচনী প্রচারে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ দলটির শীর্ষ নেতারা রাজ্যে ধারাবাহিক প্রচার চালান। বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ, অর্থনৈতিক সংকট এবং তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও শাসনব্যবস্থার অভিযোগকে প্রচারের বড় ইস্যু করা হয়।

 

ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর নিয়েও বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, এই প্রক্রিয়া নিয়ে সংখ্যালঘু মুসলিম ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয় এবং বহু মানুষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার অভিযোগ করেন। তৃণমূল কংগ্রেসও এই ইস্যুতে বিজেপি ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে সরব ছিল।

 

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভোট গণনার মধ্যে দলীয় কর্মী ও গণনা এজেন্টদের কেন্দ্র না ছাড়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, গণনার প্রাথমিক পর্যায়ে বিজেপির ফলাফল আগে দেখানো হচ্ছে। তিনি দলীয় কর্মীদের হতাশ না হয়ে শেষ রাউন্ড পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেছেন।

 

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রাথমিক প্রবণতা যদি চূড়ান্ত ফলাফলে রূপ নেয়, তাহলে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বড় পালাবদল ঘটবে। দীর্ঘ বাম শাসনের পর তৃণমূল যে পরিবর্তনের প্রতীক হয়ে ক্ষমতায় এসেছিল, এবার সেই তৃণমূলকেই চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বিজেপি নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করতে যাচ্ছে।

 

উত্তরবঙ্গ, জঙ্গলমহল এবং দক্ষিণবঙ্গের একাধিক আসনে বিজেপির শক্তিশালী অবস্থান তৃণমূলের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে তৃণমূলের কিছু ঐতিহ্যগত ঘাঁটিতেও বিজেপির অগ্রগতি রাজ্যের ভোটের মেজাজ বদলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

 

চূড়ান্ত ফলাফল এখনো ঘোষণা হয়নি। তবে বর্তমান প্রবণতায় স্পষ্ট, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মানচিত্রে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিজেপি শিবিরে উচ্ছ্বাস বাড়ছে, আর তৃণমূল অপেক্ষা করছে শেষ রাউন্ডের গণনার দিকে।
 


সম্পর্কিত নিউজ