ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে কেমন ক্ষতি হলো যুক্তরাষ্ট্রের?

ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে কেমন ক্ষতি হলো যুক্তরাষ্ট্রের?
ছবির ক্যাপশান, এআই ছবি

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৪২টি সামরিক বিমান ও ড্রোন হারিয়েছে বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে মার্কিন কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস বা সিআরএস। সংস্থাটির সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি, গোপনীয় তথ্য, দুর্ঘটনা নাকি শত্রুপক্ষের হামলা-এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ যাচাই শেষ না হওয়ায় প্রকৃত সংখ্যা পরে সংশোধিত হতে পারে।

সিআরএসের প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে এমন সময়ে, যখন মার্কিন কংগ্রেসের আইনপ্রণেতারা পেন্টাগনের কাছে অপারেশন এপিক ফিউরি নিয়ে সময়সীমা, ব্যয়, সামরিক ক্ষয়ক্ষতি এবং কৌশলগত ফলাফল সম্পর্কে আরও স্পষ্ট তথ্য চাইছেন। USNI News ১৩ মে ২০২৬ তারিখের CRS রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ছিল U.S. Aircraft Combat Losses in Operation Epic Fury: Considerations for Congress।

 

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় রয়েছে চারটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান, একটি এফ-৩৫এ লাইটনিং ২ যুদ্ধবিমান, একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২ স্থল-আক্রমণকারী বিমান, সাতটি কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার আকাশপথে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান, একটি ই-৩ সেন্ট্রি আকাশপথে আগাম সতর্কীকরণ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বিমান, দুটি এমসি-১৩০জে কমান্ডো ২ বিশেষ অভিযানকারী বিমান, একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন ২ যুদ্ধকালীন অনুসন্ধান ও উদ্ধার হেলিকপ্টার, ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন। India Today–এর প্রতিবেদনে একই তালিকা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, CRS বিভিন্ন সংবাদ প্রতিবেদন, পেন্টাগন ও মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের বিবৃতি বিশ্লেষণ করে এই তালিকা তৈরি করেছে।

 

তবে সিআরএস নিজেই সতর্ক করেছে, এই সংখ্যা চূড়ান্ত নয়। যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো বিমান শত্রুপক্ষের হামলায় ধ্বংস হয়েছে, দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে, বন্ধুসুলভ আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, নাকি উদ্ধার অভিযানে পরিত্যক্ত বা নষ্ট করা হয়েছে-এসব বিষয় আলাদা করে যাচাই করা সময়সাপেক্ষ। ফলে “হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত” শব্দটি ব্যবহার করাই সবচেয়ে নির্ভুল।

 

Stars and Stripes জানিয়েছে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর পর যুক্তরাষ্ট্র ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন হারিয়েছে। প্রতিটি রিপারের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৩০ মিলিয়ন ডলার এবং এগুলো হেলফায়ার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, এপ্রিল মাসে ইরানে একটি এফ-১৫ই যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হওয়ার পর উদ্ধার অভিযানের সময় আরও কয়েকটি বিমান ও হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

তালিকার মধ্যে কয়েকটি ঘটনা বিশেষভাবে আলোচিত। CRS রিপোর্টের বরাতে Stars and Stripes জানায়, একটি এ-১০ থান্ডারবোল্ট ২ এবং দুটি এমসি-১৩০জে কমান্ডো ২ বিশেষ অভিযানকারী বিমান ইরানের মাটিতে অভিযানের সময় পরে ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস করা হয়। একটি এইচএইচ-৬০ডব্লিউ জলি গ্রিন ২ হেলিকপ্টার উদ্ধার অভিযানের সময় ছোট অস্ত্রের গুলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

 

যুদ্ধের শুরুর দিকে ইরাকের আকাশসীমায় একটি কেসি-১৩৫ জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান বিধ্বস্ত হয়, এতে ছয়জন ক্রু নিহত হন। ওই দুর্ঘটনার কারণ এখনো তদন্তাধীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রাথমিক গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিমানবিধ্বংসী আগুন এড়াতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে থাকতে পারে-এমন ধারণা করা হয়েছিল। তবে সেন্ট্রাল কমান্ড এই প্রাথমিক ধারণা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, আর বিমানবাহিনীর তদন্তে এটি ব্যস্ত আকাশসীমায় এড়ানো যেত এমন দুর্ঘটনা হিসেবেও উঠে আসতে পারে।

 

এ ছাড়া CRS রিপোর্টে আরও বলা হয়েছে, কুয়েতের আকাশসীমায় বন্ধুসুলভ আগুনে তিনটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় পার্ক করা পাঁচটি কেসি-১৩৫ ট্যাঙ্কার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই ঘাঁটির অরক্ষিত ট্যাক্সিওয়েতে থাকা একটি ই-৩ সেন্ট্রি বিমানও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একটি এফ-৩৫এ লাইটনিং ২ ইরানি স্থলভিত্তিক গোলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন দুর্ঘটনায় বিধ্বস্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।

 

এদিকে পেন্টাগন এখনো পূর্ণাঙ্গ সামরিক ক্ষয়ক্ষতির আনুষ্ঠানিক হিসাব প্রকাশ করেনি। তবে ১২ মে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস সাবকমিটির শুনানিতে পেন্টাগনের ভারপ্রাপ্ত কম্পট্রোলার জুলস ডব্লিউ হার্স্ট তৃতীয় জানান, ইরানে সামরিক অভিযানের আনুমানিক ব্যয় বেড়ে ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তাঁর ভাষায়, ক্ষতিগ্রস্ত সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও প্রতিস্থাপনের ব্যয়ের উন্নত হিসাব যুক্ত হওয়ায় মোট ব্যয় বেড়েছে।

 

Stars and Stripes–এর প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এই ২৯ বিলিয়ন ডলারের হিসাবের মধ্যে সামরিক সরঞ্জাম মেরামত ও প্রতিস্থাপন ব্যয় অন্তর্ভুক্ত, তবে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের পাল্টা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অবকাঠামোগত ক্ষতি এতে ধরা হয়নি। ফলে মোট আর্থিক চাপ আরও বেশি হতে পারে।

 

এদিকে মার্কিন রাজনীতিতেও বিষয়টি চাপ তৈরি করেছে। New York Post–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিনেট ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা সীমিত করার একটি war powers resolution এগিয়ে নিয়েছে। চারজন রিপাবলিকান সিনেটর হোয়াইট হাউসের অবস্থান থেকে সরে এসে প্রস্তাবটির পক্ষে ভোট দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, অপারেশন এপিক ফিউরি নিয়ে প্রশাসনের স্বচ্ছতার অভাব আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে CRS রিপোর্ট শেয়ার করে বলেন, যুদ্ধ থেকে ইরান গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে আরও বড় ধরনের জবাবের মুখোমুখি হতে হবে। তবে আরাঘচির বক্তব্য ইরানের রাজনৈতিক অবস্থান ও কৌশলগত বার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা; CRS রিপোর্ট নিজে ইরানের দাবি প্রমাণ করে না, বরং মার্কিন সামরিক ক্ষয়ক্ষতির তালিকা তুলে ধরেছে।

 

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতির তালিকায় সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হলো ড্রোন ও ট্যাঙ্কার ক্ষতি। MQ-9 Reaper ও MQ-4C Triton গোয়েন্দা নজরদারি, লক্ষ্য শনাক্তকরণ ও দূরপাল্লার অপারেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে KC-135 Stratotanker ছাড়া মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘ আকাশ অভিযানে যুদ্ধবিমান টিকিয়ে রাখা কঠিন। তাই সরাসরি যুদ্ধবিমান ক্ষতির পাশাপাশি জ্বালানি সরবরাহকারী ও নজরদারি প্ল্যাটফর্মের ক্ষতিও অপারেশনাল সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।

 

এফ-৩৫এ লাইটনিং ২ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও সামরিক মহলে আলোচিত। এটি বিশ্বের অন্যতম উন্নত স্টেলথ যুদ্ধবিমান। তবে CRS রিপোর্টে এটি “damaged” বা ক্ষতিগ্রস্ত হিসেবে উল্লেখ হয়েছে; “ভূপাতিত” বা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে-এমন ভাষা ব্যবহার করা হয়নি। তাই এফ-৩৫ নিয়ে ইরানি বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দাবিগুলো সংবাদে সতর্কভাবে উপস্থাপন করা দরকার।


সম্পর্কিত নিউজ