গাজায় ইসরাইলি গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৯৯৬

গাজায় ইসরাইলি গণহত্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৯৯৬
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

গাজা উপত্যকায় চলমান যুদ্ধ ও সামরিক অভিযানের মধ্যে নিহত ফিলিস্তিনিদের সংখ্যা বেড়ে ৭২ হাজার ৯৯৬ জনে পৌঁছেছে। একই সময়ে আহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৩ হাজার ২৪৬ জনে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরাইলি হামলায় আরও ৩ জন নিহত এবং অন্তত ১৬ জন আহত হয়েছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গাজার বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষ চাপা পড়ে রয়েছেন। অনেক এলাকায় উদ্ধারকারী দল পৌঁছাতে না পারায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। অবকাঠামো ধ্বংস, চিকিৎসা ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং যোগাযোগ সংকটের কারণে অনেক মৃত্যুর তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে নথিভুক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না।

 

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের বিশ্লেষণ বলছে, সরকারি হিসাবের বাইরেও কয়েক হাজার মানুষ এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। চিকিৎসা সাময়িকী দ্য ল্যানসেট-এ প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে যুদ্ধের প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি হতে পারে। কিছু গবেষণায় মৃত্যুর সংখ্যা ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি হওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।

 

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে নিহতদের বড় অংশ নারী, শিশু ও বয়স্ক মানুষ। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণেও দেখা গেছে যে বেসামরিক জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

 

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর ইসরাইল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে। ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই হামলায় প্রায় ১,২০০ মানুষ নিহত হন এবং শতাধিক ব্যক্তিকে জিম্মি করা হয়। এরপর শুরু হওয়া যুদ্ধ দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান রয়েছে এবং এটি আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে।

 

আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের প্রচেষ্টায় যুদ্ধবিরতির একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। কায়রো, দোহা ও অন্যান্য কূটনৈতিক কেন্দ্রগুলোতে আলোচনা চললেও হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, জিম্মি বিনিময়, ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহার এবং যুদ্ধ-পরবর্তী গাজা প্রশাসন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে স্থায়ী সমঝোতা এখনও সম্ভব হয়নি।

 

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘ ও ত্রাণ সংস্থাগুলোর মতে, গাজার অধিকাংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং বহু পরিবার একাধিকবার আশ্রয় পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছে। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ এবং চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

 

স্বাস্থ্য খাতও প্রায় ভেঙে পড়ার অবস্থায় রয়েছে। বহু হাসপাতাল আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের একটি বড় অংশ নিহত, আহত বা বাস্তুচ্যুত হওয়ায় চিকিৎসাসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, স্বাস্থ্যসেবার সংকট অব্যাহত থাকলে যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

 

এদিকে গাজায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা অভিযোগ করেছে, ত্রাণ সংগ্রহ করতে গিয়ে বহু মানুষ হতাহত হয়েছেন। কিছু ঘটনায় ত্রাণকেন্দ্রের আশপাশে গোলাগুলি ও প্রাণহানির খবরও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উঠে এসেছে।

 

গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ বলছে, যুদ্ধের শেষ পরিণতি যাই হোক না কেন, হাজার হাজার পরিবার ইতোমধ্যে তাদের স্বজন হারিয়েছে এবং পুরো একটি প্রজন্ম যুদ্ধের মানসিক ও সামাজিক ক্ষত বহন করবে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও আটকে থাকা মানুষের সংখ্যা, নিখোঁজদের প্রকৃত হিসাব এবং বিধ্বস্ত অবকাঠামোর কারণে গাজায় মানবিক পরিস্থিতির পূর্ণ চিত্র এখনো স্পষ্ট নয়।


সম্পর্কিত নিউজ