সুইজারল্যান্ডে হচ্ছে জনসংখ্যা সীমিত রাখার গণভোট

সুইজারল্যান্ডে হচ্ছে জনসংখ্যা সীমিত রাখার গণভোট
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ইউরোপের অন্যতম সমৃদ্ধ দেশ সুইজারল্যান্ডে জনসংখ্যা সীমিত রাখার প্রস্তাব নিয়ে আজ রোববার (১৪ জুন) অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল আলোচিত গণভোট। প্রস্তাবটি অনুমোদন পেলে দেশটির মোট জনসংখ্যা ১ কোটির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা তৈরি হবে। বিষয়টি ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্ক, প্রচারণা এবং জনমত বিভক্ত হয়ে পড়েছে।

বিতর্কিত এই গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে দেশটির উগ্র ডানপন্থি রাজনৈতিক দল সুইস পিপলস পার্টি (এসভিপি)। দলটির দাবি, গত দুই দশকে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে আবাসন সংকট, গণপরিবহনে চাপ, স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। তাই দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ জরুরি হয়ে পড়েছে।

 

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০২ সালে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৭৩ লাখ। গত দুই দশকে তা বেড়ে বর্তমানে ৯১ লাখ ছাড়িয়েছে। এই জনসংখ্যার প্রায় ২৭ শতাংশই বিদেশে জন্মগ্রহণকারী বা অভিবাসী পটভূমির মানুষ। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে দক্ষ কর্মী, পেশাজীবী এবং শ্রমিকদের আগমনের ফলে দেশটির অর্থনীতি শক্তিশালী হলেও একই সঙ্গে অবকাঠামোর ওপর চাপও বেড়েছে বলে দাবি করছেন গণভোটের সমর্থকরা।

 

এসভিপির নেতারা বলছেন, বড় শহরগুলোতে বাড়িভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, নতুন আবাসনের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে এবং ট্রেন ও গণপরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রীচাপ রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে। এছাড়া হাসপাতাল, স্কুল এবং সরকারি সেবাগুলোও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কারণে অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়ছে।

 

তবে গণভোটের বিরোধীরা এই উদ্যোগকে অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক প্রচারণা হিসেবে বর্ণনা করছেন। তাদের অভিযোগ, জনসংখ্যা বৃদ্ধির বিষয়টিকে সামনে এনে মূলত বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে জনমত তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, সুইজারল্যান্ডের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল এবং অভিবাসীদের অবদান ছাড়া অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাত সচল রাখা কঠিন হবে।

 

সুইজারল্যান্ডের কেন্দ্রীয় সরকার, অধিকাংশ প্রধান রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী সংগঠন এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলো গণভোটের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তাদের মতে, জনসংখ্যা কৃত্রিমভাবে সীমাবদ্ধ করার সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, পর্যটন, নির্মাণশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি এবং হোটেল খাতে বড় ধরনের শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

 

বিশ্লেষকদের মতে, সুইজারল্যান্ড বর্তমানে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর একটি হলেও দেশটির শ্রমবাজারে দক্ষ জনশক্তির চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে অভিবাসনের পথ সংকুচিত হলে অনেক প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় কর্মী সংকটে পড়তে পারে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

 

গণভোটকে ঘিরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী পক্ষের প্রচারণায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ছবি ব্যবহার করা হয়েছে। তাদের দাবি, এই প্রস্তাব অনুমোদিত হলে সুইজারল্যান্ড ধীরে ধীরে ইউরোপীয় মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

 

এছাড়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সুইজারল্যান্ডের সম্পর্ক নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। যদিও সুইজারল্যান্ড ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য নয়, তবুও বাণিজ্য, শ্রমবাজার এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় ইইউর সঙ্গে দেশটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জনসংখ্যা সীমিত করার নীতির ফলে ভবিষ্যতে শ্রমিক চলাচল ও দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো নিয়ে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হতে পারে।

 

সুইজারল্যান্ডের সরাসরি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কারণে দেশটির নাগরিকরা নিয়মিত বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে ভোট দেওয়ার সুযোগ পান। দেশটিতে কোনো গণভোট আয়োজনের জন্য মাত্র এক লাখ বৈধ স্বাক্ষর সংগ্রহ করলেই বিষয়টি জাতীয় ভোটাভুটিতে তোলা যায়। এ কারণেই রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা প্রশ্নে সুইস জনগণ সরাসরি মতামত দেওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকে।

 

ভোটের আগে প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার এই প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন। অন্যদিকে ৪৫ শতাংশ ভোটার গণভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তবে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন থাকায় শেষ মুহূর্তের ভোটই ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই গণভোট শুধু জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; বরং সুইজারল্যান্ড ভবিষ্যতে অভিবাসন, শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোন পথে এগোবে, সেটিও অনেকাংশে নির্ধারণ করে দিতে পারে। তাই দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটিকে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণভোট হিসেবে দেখা হচ্ছে।


সম্পর্কিত নিউজ