{{ news.section.title }}
বাংলাদেশকে ৫ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার ঘোষণা এডিবির
বিনিয়োগ বাড়ানো, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক বৈষম্য কমিয়ে ভারসাম্যপূর্ণ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিতের লক্ষ্যে বাংলাদেশকে আগামী পাঁচ বছরে ৫ বিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ৬১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা সহায়তার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক-এডিবি। ‘ইন্টিগ্রেটেড গ্রোথ নেটওয়ার্ক ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ’ নামে নতুন কর্মসূচির আওতায় এই সহায়তা দেওয়া হবে।
সোমবার (২৫ মে) রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এডিবি সভাপতি মাসাতো কান্দা। সাক্ষাতে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার, অর্থনৈতিক সংস্কার, বৈদেশিক অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা এবং মধ্যমেয়াদি প্রবৃদ্ধি কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ইউএনবি জানিয়েছে, এডিবি সভাপতি সফরকালে বাংলাদেশকে ৫ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।
এডিবি সভাপতি মাসাতো কান্দা বলেন, বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করছে। অর্জিত স্থিতিশীলতা ধরে রাখা, নতুন প্রবৃদ্ধির উৎস তৈরি এবং আরও বহুমুখী ও সহনশীল অর্থনীতি গড়ে তুলতে এডিবি সহায়তা করবে। এডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, এই সহায়তা বাংলাদেশের জন্য আরও ভালো কর্মসংস্থান ও বিস্তৃত সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
পাঁচ বছরে বছরে গড়ে ১ বিলিয়ন ডলার
নতুন কর্মসূচির আওতায় আগামী পাঁচ বছরে বছরে গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ১২ হাজার ২৯০ কোটি টাকা করে অর্থায়ন দেওয়া হবে। এডিবি জানিয়েছে, এই পাঁচ বছর মেয়াদি প্যাকেজ বাংলাদেশের জন্য সংস্থাটির বর্ধিত বার্ষিক সার্বভৌম ঋণসহায়তা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এই অর্থায়ন বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়ন এবং অঞ্চলভিত্তিক উন্নয়ন বৈষম্য কমাতে ব্যবহার করা হবে।
বাংলাদেশ এখন বৈশ্বিক সংঘাত ও অভ্যন্তরীণ আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি তেল, এলএনজি, সার ও পণ্য পরিবহনের ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে এবং ব্যাংক খাতেও তারল্যচাপ আছে। এ প্রেক্ষাপটে এডিবির নতুন সহায়তা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
১.৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি সই
এডিবির সফরকালে ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিশ্রুতি কর্মসূচির আওতায় প্রায় ১.৪ বিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ১৭ হাজার ২০৬ কোটি টাকার ঋণচুক্তি সই হয়েছে। রয়টার্স জানিয়েছে, এই ঋণচুক্তির আওতায় জ্বালানি, পরিবহন, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সামাজিক উন্নয়ন খাতের প্রকল্পগুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এডিবি সফরকালে বাংলাদেশের জন্য ২০২৬ সালের বার্ষিক প্রতিশ্রুতি কর্মসূচির অংশ হিসেবে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সই করেছে। এই অর্থায়ন দেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সহায়ক হবে।
মধ্যপ্রাচ্য সংকট মোকাবিলায় বাড়তি ২৫০ মিলিয়ন ডলার
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে জ্বালানি তেল, এলএনজি, সার ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধিতে বাংলাদেশের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় এডিবি বাংলাদেশকে অতিরিক্ত ২৫০ মিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ৩ হাজার ৭৩ কোটি টাকা সহায়তা দেবে। ইউএনবি জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাবজনিত অর্থায়ন ঘাটতি মোকাবিলায় এই সহায়তা বাড়ানো হয়েছে। এই বাড়তি অর্থায়নের লক্ষ্য হলো আমদানিনির্ভর অর্থনীতির ওপর বৈশ্বিক পণ্যমূল্যের চাপ কিছুটা কমানো এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে সরকারকে সহায়তা করা।
বার্ষিক ঋণসহায়তা বাড়ানোর পরিকল্পনা
বর্তমানে বাংলাদেশে এডিবির বার্ষিক সার্বভৌম ঋণ প্রতিশ্রুতির পরিমাণ প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ২৪ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। মধ্য মেয়াদে এটি ২০ শতাংশ বাড়িয়ে প্রায় ২.৪ বিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ২৯ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকায় উন্নীত করার পরিকল্পনা করেছে সংস্থাটি। এডিবি জানিয়েছে, বর্ধিত অর্থায়ন বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান, অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণ, সুশাসন এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ প্রক্রিয়াকে সহায়তা করবে।
২০ লাখ ডলারের কারিগরি সহায়তা
বাংলাদেশের মধ্যমেয়াদি উন্নয়ন কাঠামো বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য ২ মিলিয়ন ডলার বা আনুমানিক ২৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকার কারিগরি সহায়তাও দেবে এডিবি। এই সহায়তা সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী উন্নয়ন কাঠামো প্রস্তুত ও বাস্তবায়ন এবং এডিবির পরবর্তী country partnership strategy বা দেশভিত্তিক অংশীদারিত্ব কৌশলকে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্য করতে ব্যবহার হবে।
এডিবি আরও জানিয়েছে, সরকার ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় করে তারা অতিরিক্ত অর্থায়ন ও বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে কাজ করবে। বিশেষ করে পুঁজিবাজার গভীর করা, ব্যাংকযোগ্য প্রকল্প তৈরি, সহ-অর্থায়ন আনা এবং বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
কেন এই সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশ এখন এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন একদিকে এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়, ব্যাংক খাতের চাপ এবং বিনিয়োগ ধীরগতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এডিবির এই সহায়তা যদি সঠিকভাবে উৎপাদনশীল খাত, যোগাযোগ অবকাঠামো, জ্বালানি নিরাপত্তা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ব্যবহার করা যায়, তাহলে তা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ঋণসহায়তা নয়-প্রকল্প বাস্তবায়নের দক্ষতা, স্বচ্ছতা, সুশাসন, সময়মতো কাজ শেষ করা এবং বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণের সক্ষমতাও এখানে বড় বিষয়। কারণ বড় অঙ্কের বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকৃত সুফল পেতে হলে তা উৎপাদনশীল ও কর্মসংস্থানমুখী খাতে কার্যকরভাবে ব্যবহার করা জরুরি।