{{ news.section.title }}
সংসদে আলোচনায় অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন, কি আছে এই আইনে?
বিয়ের অনুষ্ঠানে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করলে দেশে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ কমে আসবে বলে মন্তব্য করেছেন লক্ষ্মীপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন।
বিয়ে ও গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জাঁকজমক ও অপচয় রোধে অতীতে প্রচলিত ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন’ পুনরায় কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম। জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি দাবি করেন, সামাজিক অনুষ্ঠানে অপচয় কমানো গেলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সোমবার (২২ জুন) স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এ আহ্বান জানান শাহাদাত হোসেন সেলিম।
তিনি বলেন, ‘আমাদের এ বাংলাদেশে বিয়ে অনুষ্ঠানের নামে বিত্ত-বৈভবের যে অশ্লীল প্রদর্শনী, এটাকে বন্ধ করতে হবে মাননীয় স্পিকার। সাত দিন, আট দিন, দশ দিন, এক মাস আগে থেকে কোরিওগ্রাফার দিয়ে নৃত্য করে এই গায়েহলুদ অনুষ্ঠানে। এটা ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক বলেন শাহাদাত হোসেন। এ সময় বিয়ের অতিরিক্ত খরচ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়ে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করার দাবি জানান তিনি।
বিয়ে ও গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত ব্যয় এবং কোরিওগ্রাফার দিয়ে নাচের আয়োজনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, এসব আয়োজন ধর্মীয় অনুশাসনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘এটাকে বন্ধ করতে হবে। অতীতে যে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন ছিল এই আইনটাকে কার্যকর করতে হবে। আপনি দেখবেন মাননীয় স্পিকার যদি অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন কার্যকর করা যায়, যদি আমরা ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি, তাহলে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ কমে আসবে। একদিনে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অন্তত ১০ পারসেন্ট কমে আসবে।’
তার ভাষায়, “অতীতে যে অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন ছিল, সেটি কার্যকর করতে হবে। আমরা যদি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলি, তাহলে মুদ্রাস্ফীতির পরিমাণ কমে আসবে। এক দিনে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম অন্তত ১০ শতাংশ কমে আসবে।”
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মিতব্যয়িতার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, অপচয় প্রধানমন্ত্রী পছন্দ করেন না।
শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, “আমরা সাত সমুদ্র তেরো নদী পাড়ি দিয়ে যখন তাঁর কাছে লন্ডনে যেতাম, তিনি একটি রং চা খাওয়াতেন। কখনো একটি চিপস তিন-চারজন ভাগ করে খেতাম। এখন দেখছি, তাঁর খাদ্য বাজেট মাত্র ১৫০ টাকা। এটা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য, কারণ অপচয়কারী শয়তানের ভাই।”
বক্তব্যে তিনি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, ব্যয় বৃদ্ধি ও দুর্নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, প্রকল্প প্রণয়নে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, অনিয়ম রোধ এবং সময়মতো বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে প্রস্তাবিত বাজেট বাস্তবায়ন সম্ভব।
কি এই অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন
মূলত, বাংলাদেশে ১৯৮৪ সালের 'গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডিন্যান্স' (Guest Control Ordinance, 1984) অনুযায়ী সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের অপচয় রোধে কিছু কড়া নিয়ম করা হয়েছিল, যা বর্তমানেও কাগজে-কলমে কার্যকর রয়েছে।
১. মূল আইনের উৎসএই আইনটি মূলত কোনো স্বাধীন বা একক আইন নয়। এটি 'দি কন্ট্রোল অফ এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট, ১৯৫৬' (The Control of Essential Commodities Act, 1956)-এর ৩(১) ধারার অধীনে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে তৎকালীন খাদ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি বিশেষ আদেশ (S.R.O. No. 320-L/84) হিসেবে ১৯৮৪ সালের ১ জুলাই জারি করা হয়েছিল। যেহেতু এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণের আইনের অধীনে তৈরি, তাই এর মূল উদ্দেশ্যই ছিল খাদ্যশস্যের অপচয় রোধ করে বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা।
২. ধর্মীয় ও পারিবারিক অনুষ্ঠানের পার্থক্য (২০০৩ সালের সংশোধন)২০০৩ সালের ৯ অক্টোবর (S.R.O. No. 291-L/2003) এই আদেশে একটি বড় সংশোধন আনা হয়। সেখানে স্পষ্ট করা হয় যে কোন অনুষ্ঠানগুলো এই আইনের আওতায় পড়বে এবং কোনগুলো ছাড় পাবে:
- আওতাভুক্ত অনুষ্ঠান (Function): যেকোনো সামাজিক উৎসব, বিয়ে বা বিয়ে-সংক্রান্ত অনুষ্ঠান এই আইনের কঠোর নিয়মের অধীনে থাকবে।
- ছাড়প্রাপ্ত ধর্মীয় অনুষ্ঠান: ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানগুলোকে এই অতিথির সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ বাইরে রাখা হয়। যেমন-মিলাদ মাহফিল, ইফতার পার্টি, কুলখানি, চেহলাম, ওরস, ধর্মসভা এবং শ্রাদ্ধ ইত্যাদি অনুষ্ঠানে অতিথি সংখ্যার কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
৩. যেভাবে তদারকি করা হতোঅতীতে যখন এই আইনটি দেশজুড়ে কড়াকড়িভাবে কার্যকর ছিল, তখন এটি বাস্তবায়নে স্থানীয় প্রশাসন কিছু নির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিত:
- ম্যাজিস্ট্রেটের অভিযান: বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠানের দিন জেলা প্রশাসনের ম্যাজিস্ট্রেট এবং খাদ্য পরিদর্শকরা আকস্মিক কমিউনিটি সেন্টার বা অনুষ্ঠানস্থলে হানা দিতেন।
- থালা গণনা ও অতিথি গণনা: ভ্রাম্যমাণ আদালত সরাসরি অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে কতটি খাবারের প্লেট প্রস্তুত করা হয়েছে বা কতজন অতিথি উপস্থিত আছেন তা গণনা করতেন। নিয়ম ভঙ্গ পাওয়া গেলে অনুষ্ঠান চলাকালীনই আয়োজক বা কমিউনিটি সেন্টারের মালিককে বড় অঙ্কের জরিমানা করা হতো।
৪. বর্তমান পরিস্থিতি ও আইনি নিষ্ক্রিয়তাকাগজে-কলমে এই আদেশ বা নিয়মটি এখনো বাতিল হয়ে যায়নি। তবে ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে এটি প্রয়োগের হার প্রায় শূন্যে নেমে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বা কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে এই আইনের কোনো বাস্তব তদারকি নেই বললেই চলে। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ মুদ্রাস্ফীতির কারণে এটি আবারও সংসদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে।
এই আইনটি ভঙ্গ করলে কি হতে পারে
'গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪' আইনটি মূলত 'দি কন্ট্রোল অফ এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট, ১৯৫৬'-এর অধীনে জারি করা হয়েছিল, তাই এই আদেশ বা বিধিমালা অমান্য করার শাস্তি সরাসরি মূল আইনের ৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্ধারিত হয়।
১. সর্বোচ্চ কারাদণ্ড ও জরিমানা (মূল আইনি ধারা)
আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যদি সামাজিক অনুষ্ঠানে নির্ধারিত অতিথির সংখ্যা বা খাবারের পদের নিয়ম লঙ্ঘন করে, তবে সেটি একটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এর শাস্তি:
- সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড: নিয়ম ভঙ্গকারী ব্যক্তি (অনুষ্ঠানের আয়োজক বা কমিউনিটি সেন্টারের মালিক) সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন।
- আর্থিক জরিমানা: কারাদণ্ডের পাশাপাশি আদালত অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ নগদ অর্থ জরিমানা (Fine) করতে পারবেন।
- উভয় দণ্ড: অপরাধ গুরুতর হলে আদালত একই সাথে কারাদণ্ড এবং আর্থিক জরিমানা-দুটি শাস্তিই একসাথে দিতে পারেন।
২. মালামাল বাজেয়াপ্তকরণ (Forfeiture of Property)আইনের ৬(১) ধারা অনুযায়ী, আদালত যদি মনে করে কোনো অনুষ্ঠানে সরকারি আদেশ অমান্য করে অতিরিক্ত বা বিলাসবহুল খাবার সামগ্রী মজুত বা প্রস্তুত করা হয়েছে, তবে সেই সমস্ত খাদ্যদ্রব্য বা মালামাল সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত (Forfeiture) করার নির্দেশ দিতে পারেন।
৩. শুনানির নোটিশ ও প্রশাসনিক জরিমানা (পেনাল ফি)
১৯৮৪ সালের আদেশের কার্যপ্রণালী অনুযায়ী, তাৎক্ষণিক বড় শাস্তির আগে একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতো:
- ১০ দিনের কারণ দর্শানোর নোটিশ: আইন লঙ্ঘনের প্রতিবেদন পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট ডেপুটি কমিশনার (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ১০ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর (Show Cause) নোটিশ দেবেন।
- প্রশাসনিক পেনাল ফি: সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হলে, অতিরিক্ত আমন্ত্রিত অতিথির সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হারে প্রশাসনিক জরিমানা বা ট্যাক্স (Penal Fee) ধার্য করা হতো।
৪. ভ্রাম্যমাণ আদালতের (Mobile Court) তাৎক্ষণিক সাজাবাস্তব ক্ষেত্রে, এই আইনটি বাস্তবায়নে মাঠে কাজ করে 'মোবাইল কোর্ট' বা ভ্রাম্যমাণ আদালত। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হয়ে অপরাধ হাতেনাতে প্রমাণ পেলে 'মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯'-এর আওতায় তাৎক্ষণিকভাবে স্পটেই আর্থিক জরিমানা অনাদায়ে নির্দিষ্ট মেয়াদের কারাদণ্ড দিতে পারেন।
গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪
১. অতিথির সংখ্যার ওপর আইনি সীমাবদ্ধতা
- সর্বোচ্চ ১০০ জন অতিথি: বিয়ে, জন্মদিন বা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে সর্বোচ্চ ১০০ জন পর্যন্ত অতিথিকে বিনামূল্যে আপ্যায়ন করা যাবে।
- অনুমতি ও অতিরিক্ত ফি: অতিথি ১০০ জনের বেশি হলে স্থানীয় প্রশাসন থেকে বিশেষ অনুমতি নিতে হবে এবং অতিরিক্ত প্রতি জনের জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি বা ট্যাক্স জমা দিতে হবে।
২. খাবারের মেনু ও পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ
- খাবারের পদের সীমাবদ্ধতা: খাবারের অপচয় রোধে পদের সংখ্যা নির্দিষ্ট থাকবে। সাধারণত পোলাও/বিরিয়ানি, একটি মাংসের পদ, একটি সবজি/ডাল এবং একটি মিষ্টি বা দই পরিবেশন করা যাবে।
- দামি পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা: একসাথে অতিরিক্ত মাছ, মুরগি, খাসি বা গরুর মাংসের একাধিক ভারী পদ রান্না করে অপচয় করা আইনত দণ্ডনীয়।
৩. নাচ-গান ও প্রাক-অনুষ্ঠান উৎসব বন্ধ (নতুন প্রস্তাবনা)
- কোরিওগ্রাফার দিয়ে নাচ শেখা নিষিদ্ধ: বিয়ের ৭ থেকে ১০ দিন আগে থেকে ভাড়াটে নৃত্যশিল্পী বা কোরিওগ্রাফার রেখে নাচ প্র্যাকটিস করা এবং এর পেছনে টাকা ওড়ানো বন্ধ করতে হবে।
- গায়েহলুদের জাঁকজমক হ্রাস: গায়েহলুদের অনুষ্ঠানের নামে ডিজে পার্টি, উচ্চশব্দে গান-বাজনা এবং অর্থের "অশ্লীল প্রদর্শনী" সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
৪. ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ছাড় (২০০৩ সালের সংশোধন)
- ছাড়প্রাপ্ত অনুষ্ঠান: মিলাদ মাহফিল, ইফতার পার্টি, কুলখানি, চেহলাম, ওরস এবং শ্রাদ্ধের মতো ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক অনুষ্ঠানগুলো এই অতিথির সীমাবদ্ধতা থেকে সম্পূর্ণ বাইরে থাকবে।
৫. আইন অমান্যের শাস্তি ও জরিমানা
- সর্বোচ্চ ৩ বছরের কারাদণ্ড: নিয়ম ভঙ্গ করলে আয়োজক বা কমিউনিটি সেন্টারের মালিকের সর্বোচ্চ ৩ বছর পর্যন্ত সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
- আর্থিক জরিমানা ও উভয় দণ্ড: কারাদণ্ডের পাশাপাশি আদালত অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী যেকোনো পরিমাণ নগদ অর্থ জরিমানা বা উভয় দণ্ডই দিতে পারেন।
- মালামাল বাজেয়াপ্তকরণ: সরকারি আদেশ অমান্য করে অতিরিক্ত খাবার সামগ্রী মজুত বা প্রস্তুত করা হলে, সেই খাদ্যদ্রব্য সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে।