দেশীয় তৈলবীজে ভোজ্যতেল উৎপাদনে ১০ বছর পর্যন্ত করছাড়

দেশীয় তৈলবীজে ভোজ্যতেল উৎপাদনে ১০ বছর পর্যন্ত করছাড়
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

দেশীয় কৃষি উৎপাদনকে উৎসাহিত করা, ভোজ্যতেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং স্থানীয় শিল্পখাতকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বড় ধরনের কর-সুবিধা ঘোষণা করেছে সরকার। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত ধাপে ধাপে আয়কর অব্যাহতি দেওয়া হবে। আগামী ১ জুলাই থেকে এই সুবিধা কার্যকর হবে।

সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব মো. আব্দুর রহমান খান। সরকারের এই উদ্যোগকে কৃষি ও শিল্প খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৭৬-এর উপধারা (১) অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে আয়কর অব্যাহতির সুবিধা পাবে। এর মাধ্যমে সরিষা, সয়াবিন, সূর্যমুখী, তিলসহ বিভিন্ন দেশীয় তৈলবীজ উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধিতে নতুন প্রণোদনা তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

 

ঘোষিত সুবিধা অনুযায়ী, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রমের প্রথম পাঁচ বছর শতভাগ আয়কর অব্যাহতি পাবে। এরপর ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম বছরে অর্জিত আয়ের ওপর ৫০ শতাংশ কর অব্যাহতি দেওয়া হবে। নবম ও দশম বছরে কর অব্যাহতির হার হবে ২৫ শতাংশ।

 

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি এই কর-সুবিধা স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের ভোজ্যতেল উৎপাদন খাতে নতুন বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে। একই সঙ্গে দেশে উৎপাদিত তৈলবীজের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় কৃষকরাও সরাসরি লাভবান হতে পারেন।

 

তবে এই সুবিধা পেতে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করতে হবে। প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই আয়কর আইন, ২০২৩-এর সব বিধান অনুসরণ করতে হবে এবং কোম্পানি আইন, ১৯৯৪-এর অধীনে নিবন্ধিত হতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজকে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করে ভোজ্যতেল উৎপাদনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

 

সরকার স্পষ্ট করেছে যে, কর অব্যাহতির সুবিধা শুধু ভোজ্যতেল উৎপাদন কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয়ের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ভোজ্যতেল উৎপাদন সংক্রান্ত আয় ও ব্যয়ের পৃথক হিসাব সংরক্ষণ করতে হবে, যাতে কর সুবিধার অপব্যবহারের সুযোগ না থাকে।

 

এ ছাড়া প্রতি আয়বর্ষে নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী জমা দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজ ব্যবহারের বিস্তারিত তথ্যও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাখিল করতে হবে। এর মাধ্যমে সরকার নিশ্চিত করতে চায় যে ঘোষিত সুবিধা প্রকৃত উৎপাদনকারীরাই পাচ্ছে।

 

প্রজ্ঞাপনে আরও বলা হয়েছে, অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে আয়কর আইনের বিধান অনুযায়ী প্রযোজ্য উৎস কর (টিডিএস) কর্তন করে নির্ধারিত সময়ে সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হবে। এ শর্ত লঙ্ঘন করলে কর অব্যাহতির সুবিধা বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে।

 

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বাংলাদেশ প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল আমদানি করে থাকে, যার ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ তৈরি হয়। স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত তৈলবীজের ব্যবহার বাড়লে একদিকে যেমন আমদানি নির্ভরতা কমবে, অন্যদিকে কৃষি, প্রক্রিয়াজাত শিল্প এবং কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।

 

সরকারের আশা, কর অব্যাহতির এই উদ্যোগ দেশীয় ভোজ্যতেল শিল্পের বিকাশে নতুন গতি আনবে এবং দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।


সম্পর্কিত নিউজ