টিকা সংকট ইস্যুতে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

টিকা সংকট ইস্যুতে সাক্ষাৎকার দেওয়ায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে প্রত্যাহারের ঘোষণা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর

বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে টিকার স্বল্পতার বিষয়টি তুলে ধরায় এক স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে ক্লোজ করা এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। একই সঙ্গে জেলার সিভিল সার্জনকেও প্রত্যাহার বা বরখাস্ত করার কথা বলেছেন তিনি।

শুক্রবার ঢাকার কাছের মুন্সীগঞ্জে গিয়ে হাসপাতালে ‘টিকা সংকটের দায়ে’ সিভিল সার্জন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক এবং একজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মন্ত্রীর এই ঘোষণাকে ঘিরে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

 

তবে শনিবার ( ২৫ এপ্রিল ) পর্যন্ত মুন্সীগঞ্জের সিভিল সার্জন জানিয়েছেন, তিনি এখনো প্রত্যাহার বা বরখাস্ত সংক্রান্ত কোনো চিঠি পাননি। এ ঘটনা নিয়ে শনিবার কয়েক দফা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে সরকারের এই ধরনের পদক্ষেপ নিয়ে একজন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করার দায়িত্ব যাদের, তাদের ব্যর্থতা মাঠপর্যায়ের সিভিল সার্জন বা অন্য কর্মকর্তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। তার মতে, এর নেতিবাচক প্রভাব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর পড়বে।

 

মুন্সীগঞ্জের ওই হাসপাতালে জলাতঙ্কের টিকার সংকট নিয়ে বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলেছেন সেখানে সেবা নিতে আসা ব্যক্তিরাও। তারা জানিয়েছেন, যে টিকা সরকারি ব্যবস্থায় বিনামূল্যে পাওয়ার কথা, সেটি অনেক ক্ষেত্রে বাইরে থেকে টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে।

 

এদিকে ‘টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার’ অভিযোগ তুলে মন্ত্রী একজন সিভিল সার্জনকে প্রকাশ্যে প্রত্যাহার বা বরখাস্তের কথা বললেও, জানা গেছে জেলাজুড়ে টিকার স্বল্পতার বিষয়টি আগেই জেলা পর্যায় থেকে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছিল।

 

শুধু তা-ই নয়, পর্যাপ্ত টিকা সরবরাহের ব্যবস্থা না করে কয়েক মাস আগে স্বাস্থ্য বিভাগ নিজেই জেলা অফিসগুলোকে অন্য মালামাল কেনার টেন্ডারের টাকা থেকে কিছু অংশ নিয়ে টিকা কেনার পরামর্শ দিয়েছিল। যদিও ওই অর্থের বড় অংশ ডিসেম্বরেই নির্ধারিত খাতে ব্যয় হয়ে গেছে।

 

মুন্সীগঞ্জের ঘটনাটি জলাতঙ্ক রোগের টিকাকে কেন্দ্র করে সামনে এলেও, বাংলাদেশে কার্যত সব ধরনের টিকার সংকট রয়েছে-এমন অভিযোগও উঠছে। বিশেষ করে সারা দেশে শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির আওতায় থাকা অন্যান্য টিকার মজুত নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

 

এমনকি রাজধানী ঢাকার কিছু টিকাদান কেন্দ্রেও পোলিও টিকা না পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছেন, অন্তত ছয় মাসের সব ধরনের টিকাই সরকারের হাতে রয়েছে।

“আমাদের স্টকে আছে। টিকার কোনো সংকট নেই। একটা টিকারও সংকট নেই। জলাতঙ্ক টিকার সংকট হয়েছিল। সেটা আমরা মোকাবিলা করেছি,” গণমাধ্যমের সামনে বলেছেন তিনি।

 

জলাতঙ্কের টিকা সংকট কীভাবে সামনে এল

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশে জাতীয় জলাতঙ্ক নির্মূল কর্মসূচি শুরু হয়েছিল ২০১১ সালে। সেই বছর থেকেই বিনামূল্যে এই টিকা দেওয়া শুরু হয়। কিন্তু ২০২৫ সালের শুরু থেকে জলাতঙ্ক প্রতিরোধে ব্যবহৃত সরকারি টিকা ‘র‌্যাবিক্স-ভিসি’-র সংকট দেখা দেয়। তখন থেকেই দেশের বিভিন্ন এলাকায় কুকুর, বিড়াল বা এ ধরনের প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ে আহত ব্যক্তিদের নিজ খরচে টিকা কিনতে বাধ্য হওয়ার ঘটনা সামনে আসতে থাকে।

 

কর্মকর্তারা বলছেন, স্বাস্থ্যের কৌশলগত পরিকল্পনা বা অপারেশনাল প্ল্যান (ওপি) না থাকায় এই সংকট তৈরি হয়েছে। অপারেশনাল প্ল্যান মূলত স্বাস্থ্যখাতে টিকা কার্যক্রমসহ বিভিন্ন কর্মসূচির পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা। এর মধ্যে থাকে পাঁচ বছরের কেনাকাটা, কার্যক্রম এবং প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দের বিষয়গুলো। এই ওপি নিয়ে অতীতে দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগ ছিল। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার ওপি কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসে। ফলে ওই ওপি-র অধীনে থাকা কর্মসূচিগুলোও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

 

এরপর সরকার কেন্দ্রীয় ঔষধাগার-সিএমএসডি’র মাধ্যমে বিশেষ বরাদ্দ দিয়ে টিকা কিনে আসছিল। কিন্তু গত বছরের শুরু থেকেই জলাতঙ্ক রোগের টিকার ঘাটতি স্পষ্ট হতে থাকে। জলাতঙ্ক এমন একটি রোগ, যেখানে মৃত্যুহার শতভাগ। একই সময়ে শিশুদের জন্য ইপিআইয়ের আওতায় দেওয়া ৯টি টিকার মধ্যে কয়েকটির মজুতও প্রয়োজনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। যদিও গত বুধবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিবিসি বাংলার প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী দাবি করেন, “টিকার কোনো সংকট নেই”।

 

বিবিসির প্রতিবেদন এবং মন্ত্রীর পরিদর্শন

তবে বৃহস্পতিবার রাতে বিবিসি বাংলার ‘প্রবাহ’ অনুষ্ঠানে প্রচারিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মুন্সীগঞ্জের একটি হাসপাতালে জলাতঙ্কের কোনো ভ্যাকসিন না থাকায় রোগীর স্বজনদের বাইরে থেকে টিকা কিনে আনতে হচ্ছে। মুন্সীগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. আহাম্মদ কবীর তখন বলেছিলেন, সংকটের কারণে সবাইকে টিকা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

 

বিবিসির সংবাদদাতা দেখেছেন, মুন্সীগঞ্জ শহরে কোনোভাবে কিছু টিকা পাওয়া গেলেও শহরের বাইরের উপজেলাগুলোতে কোনো টিকাই নেই। এরপর শুক্রবার মুন্সীগঞ্জ হাসপাতাল পরিদর্শনে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। পরে তিনি অভিযোগ করেন, হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ‘অ্যান্টি স্টেট অ্যাক্টিভিটিতে পা দিয়েছেন’ এবং তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

 

“সুপার সাহেব যেই সাক্ষাৎকার দিয়েছেন একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে- ইটস আ টোটাল ড্যামেজ টু দ্য গভর্নমেন্ট। টিকা নাই বলেছে, এটা একটা সাবোট্যাজ। শর্টেজ থাকলে আমাদের জানাবে, ডিজিকে জানাবে, ডিসিকে জানাবে। এমএসআর ফান্ড (ওষুধসহ চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনার ফান্ড) আছে। এমপিগণ আছেন। উনি এমন ইন্টারভিউ দিতে পারেন না। আমরা সুপারিটেন্ডেন্টকে ক্লোজ করেছি,” সাংবাদিকদের বলেছেন তিনি।

 

পরে হাসপাতাল পরিদর্শন শেষে এক সভায় তিনি জেলার সিভিল সার্জন এবং আরও একজন কর্মচারীকে বরখাস্ত করার কথাও জানান। একজন কর্মকর্তা বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, মন্ত্রী সিভিল সার্জনকে উদ্দেশ করে বলেছেন-তিনি যখন ঘোষণা দিয়েছেন যে ভ্যাকসিন আছে, তারপরও কর্মকর্তারা “সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছেন”। ওই কর্মকর্তা আরও জানিয়েছেন, নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় টিকা কিনতে বলে চিঠি দেওয়ার পরও কেন কেনা হয়নি, সে বিষয়েও মন্ত্রী জানতে চেয়েছেন।

 

‘মন্ত্রী বলেছেন আপনি ব্যর্থ’

সিভিল সার্জন কামরুল জমাদ্দার বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, তিনি এখনো বরখাস্তের কোনো আদেশ হাতে পাননি। তবে মন্ত্রী তাকে সরাসরি টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করেছেন।

 

“টেন্ডারের টাকা থেকে টিকা কিনতে বলা হয়েছিল। কিন্তু সেইসব টেন্ডার ডিসেম্বরে হয়ে গেছে। তারপরেও জেলা ও উপজেলার হাসপাতালগুলো চেষ্টা করেছে। মন্ত্রী বলেছেন জলাতঙ্কের টিকার অভাব নেই। অথচ সদর হাসপাতালে ২৬ ভায়েল (প্রতি ভায়েলে চারটি টিকা থাকে) টিকা আছে। অন্য জায়গায় নেই। আমরা আগেই ডিজি অফিসকে জানিয়েছিলাম সব। প্রতিমাসে পুরো জেলায় ২৬০০ ভায়েল টিকা দরকার হয়,” বলছিলেন মি. জমাদ্দার।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, জলাতঙ্কের টিকার সংকট থাকলেও জেলায় হামসহ শিশুদের অন্যান্য টিকা এখন প্রয়োজন অনুযায়ী সরবরাহ করা যাচ্ছে।

 

এদিকে টিকা সংকটের বিষয়ে সংবাদমাধ্যমে কথা বলায় হাসপাতালের সুপারকে ক্লোজ করা এবং একই সঙ্গে টিকা ঘাটতির দায়ে সিভিল সার্জনকে প্রত্যাহার কিংবা বরখাস্ত করার ঘটনায় সরকারি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

কয়েকটি জেলার সিভিল সার্জনের সঙ্গে কথা বলে এমন ধারণা পাওয়া গেছে।

 

একজন সিভিল সার্জন বলেছেন, টিকার মতো জরুরি সামগ্রী জেলা পর্যায়ে সিভিল সার্জনদের দিয়ে কেনানো বাস্তবসম্মত নয়। বরং এসব টিকা কেন্দ্রীয়ভাবে সংগ্রহ করে সারাদেশে সরবরাহ নিশ্চিত করাই কর্তৃপক্ষের কাজ হওয়া উচিত।

“আমাদের কাজ হবে হাসপাতালগুলোতে মানুষ এসে যেন ঠিকমতো টিকা পায় সেটি নিশ্চিত করা। কেনার কাজ তো আমার হতে পারে না,” ঢাকার কাছাকাছি একটি জেলার একজন সিভিল সার্জন বিবিসি বাংলাকে বলেন। তিনি নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক বেনজির আহমদ বলছেন, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া একটি খারাপ দৃষ্টান্ত। “এমনিতে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা লোকবল, যন্ত্রপাতি, ঔষধ ও চিকিৎসা উপকরণের সংকটে থাকেন। টিকা কিনে পাঠানোর দায়িত্ব কেন্দ্রের। সেখানে ক্রয় বিষয়ে অভিজ্ঞ লোক থাকে। সিভিল সার্জন অফিস এটা করবে কেন?” “নিজের ব্যর্থতার দায় কর্মকর্তাদের ওপর চাপানোর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে ও কর্মকর্তারা জনস্বাস্থ্য কর্মসূচিতে কাজ করতে অনুৎসাহিত বোধ করবেন,” বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

 

সূত্র: বিবিসি বাংলা


সম্পর্কিত নিউজ