{{ news.section.title }}
ভারতের ভিসা চালু, ফিরছে কি আন্তঃদেশীয় ট্রেন?
আকাশপথ ও সড়কপথের পাশাপাশি একসময় রেলপথেও বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের নিয়মিত যাত্রী যোগাযোগ ছিল। মৈত্রী এক্সপ্রেস, বন্ধন এক্সপ্রেস ও মিতালী এক্সপ্রেস-এই তিনটি আন্তঃদেশীয় ট্রেনের মাধ্যমে প্রতিবছর হাজারো যাত্রী দুই দেশের মধ্যে যাতায়াত করতেন। তবে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় বন্ধ হয়ে যাওয়া এই তিনটি ট্রেন প্রায় দুই বছর ধরে আর চালু হয়নি।
এদিকে গত ২৮ জুন থেকে বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের মেডিকেল ভিসার পাশাপাশি পর্যটন ভিসার আবেদনও পুনরায় চালু হওয়ায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে আন্তঃদেশীয় ট্রেন চলাচল। পর্যটন ও চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে যেতে আগ্রহী বাংলাদেশিদের মধ্যে ট্রেন চালুর প্রত্যাশাও বেড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে-কবে আবার চালু হবে বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগ?
ট্রেন চালুর বিষয়ে কী বলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে?
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, আন্তঃদেশীয় ট্রেন চালুর বিষয়ে ভারতীয় রেলওয়েকে সর্বশেষ যে চিঠি পাঠানো হয়েছিল, তার এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়া যায়নি। নতুন করে রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশনা এলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আবারও যোগাযোগ করা হবে।
অন্যদিকে রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বিষয়টি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, আলোচনা এগোলে ট্রেন চালুর বিষয়টিও সামনে আসবে।
ভিসা সহজ হলে ট্রেন চালুর সম্ভাবনাও বাড়বে
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে আন্তঃদেশীয় ট্রেন চালুর বিষয়টি মূলত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে-ভিসা প্রাপ্তি সহজ হওয়া, যাত্রীর সংখ্যা এবং সেবাটির বাণিজ্যিক লাভজনকতা। এটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের চেয়ে অর্থনৈতিক ও পরিচালনাগত বাস্তবতার সঙ্গে বেশি সম্পর্কিত। ভিসা সহজ হলে যাত্রী বাড়বে, আর যাত্রী বাড়লে ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই ট্রেন পুনরায় চালুর আগ্রহ তৈরি হবে।
কীভাবে শুরু হয়েছিল তিনটি আন্তঃদেশীয় ট্রেন?
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী আন্তর্জাতিক ট্রেন চলাচলের সূচনা হয় মৈত্রী এক্সপ্রেস দিয়ে। এরপর পর্যায়ক্রমে চালু হয় বন্ধন এক্সপ্রেস এবং মিতালী এক্সপ্রেস। এই তিনটি ট্রেন শুধু যাতায়াতের মাধ্যমই ছিল না; বরং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ, পর্যটন, চিকিৎসা, শিক্ষা, বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বিনিময়েও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মৈত্রী এক্সপ্রেস প্রথম চালু হয় ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল। ট্রেনটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত চলাচল করত। প্রায় ৪৩ বছর পর এই ট্রেনের মাধ্যমে দুই দেশের যাত্রীবাহী রেল যোগাযোগ পুনঃস্থাপিত হয়। এরপর ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর চালু হয় বন্ধন এক্সপ্রেস, যা খুলনা থেকে কলকাতা পর্যন্ত চলাচল করত।
সবশেষে ২০২১ সালের ২৭ মার্চ দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর ভার্চ্যুয়াল উদ্বোধনের মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে মিতালী এক্সপ্রেস। পরে ২০২২ সালের ১ জুন ট্রেনটির বাণিজ্যিক চলাচল শুরু হয়। এটি ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে ভারতের নিউ জলপাইগুড়ি (এনজেপি) পর্যন্ত চলাচল করত। বাংলাদেশের চিলাহাটি ও ভারতের হলদিবাড়ি রেলপথ ব্যবহার করে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করায় উত্তরবঙ্গের যাত্রীদের জন্য এটি বিশেষ সুবিধা সৃষ্টি করেছিল।
কেন বন্ধ হয়ে যায় ট্রেন চলাচল?
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় শিক্ষার্থীদের ডাকা 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচিকে ঘিরে দেশজুড়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে ধাপে ধাপে বিভিন্ন রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এর ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেস, ১৭ জুলাই থেকে বন্ধন এক্সপ্রেস এবং ১৮ জুলাই থেকে মিতালী এক্সপ্রেস চলাচল বন্ধ রয়েছে।
বাংলাদেশে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর দেশীয় রেল চলাচল চালু হলেও আন্তঃদেশীয় ট্রেন আর চালু হয়নি। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে অবস্থান করা ভারতীয় রেলওয়ের কোচ ও ওয়াগনগুলোও পরে ভারতে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।

নতুন রুটে চলতে পারে মৈত্রী এক্সপ্রেস
বাংলাদেশ রেলওয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আন্তঃদেশীয় ট্রেন চালুর বিষয়ে শিগগিরই একটি বৈঠক হতে পারে। সেখানে শুধু ট্রেন চালুর বিষয় নয়, রুট পরিবর্তনের বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে। আগে মৈত্রী এক্সপ্রেস জয়দেবপুর, যমুনা সেতু, ঈশ্বরদী ও দর্শনা হয়ে চলাচল করত। তবে বর্তমানে পদ্মা সেতু হয়ে ট্রেনটি চালানো সম্ভব কি না, সেই সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হবে।
রেলওয়ের আরেকটি সূত্র জানিয়েছে, ভারতীয় রেলওয়ের কাছে পাঠানো আগের চিঠির কোনো উত্তর এখনও আসেনি। নতুন নির্দেশনা পেলে পুনরায় যোগাযোগ করা হবে। এ বিষয়ে শুধু রেলপথ মন্ত্রণালয় নয়, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সম্পৃক্ত রয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আফজাল হোসেন দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে রেলপথ প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ হাবিব সোমবার (২৯ জুন) সকালে ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হতে পারে। আলোচনা শুরু হলে ট্রেন চালুর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। অন্যদিকে একই দিন যোগাযোগ করা হলেও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট অনুবিভাগের কোনো কর্মকর্তা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আবারও বাড়তে পারে ট্রেনের ভাড়া
আন্তঃদেশীয় ট্রেন পুনরায় চালু হলে ভাড়া বাড়তে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০২৪ সালের ১৫ জুন ডলারের মূল্যবৃদ্ধির কারণ দেখিয়ে ঢাকা-কলকাতা, খুলনা-কলকাতা এবং ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটের তিনটি ট্রেনের ভাড়া বাড়ানো হয়েছিল। করোনা মহামারির পর এটি ছিল পঞ্চম দফা ভাড়া বৃদ্ধি। ওই সময় ট্রেনের ভাড়া অনেক ক্ষেত্রে বাসের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ এবং বিমান ভাড়ার কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
সর্বশেষ নির্ধারিত ভাড়া অনুযায়ী-
- মৈত্রী এক্সপ্রেস: এসি কেবিন ৫,১১০ টাকা এবং এসি চেয়ার ৩,৭৪০ টাকা।
- বন্ধন এক্সপ্রেস: এসি কেবিন ৩,০৫৫ টাকা এবং এসি চেয়ার ২,৩৭০ টাকা।
- মিতালী এক্সপ্রেস: এসি বার্থ ৭,০২৫ টাকা, এসি সিট ৪,৫২০ টাকা এবং এসি চেয়ার ৪,০১৫ টাকা।
মিতালী এক্সপ্রেসের এসি সিট ছাড়া অন্য সব শ্রেণির ভাড়ার সঙ্গে সরকারের ট্রাভেল ট্যাক্স অন্তর্ভুক্ত ছিল।
রেল ভবনের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গত প্রায় দুই বছরে ডলারের দাম ১৪ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের মূল্যসহ পরিচালন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে ট্রেন পুনরায় চালু হলে নতুন করে ভাড়া সমন্বয়ের সম্ভাবনা রয়েছে।
ভারতের পর্যটন ভিসা চালু হলেও আবেদনকারীর ভিড় কম
দীর্ঘ প্রায় দুই বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসার আবেদন গ্রহণ শুরু করেছে ভারতীয় ভিসা আবেদন কেন্দ্র (আইভ্যাক)। তবে প্রথম দুই দিন অর্থাৎ ২৮ ও ২৯ জুন প্রত্যাশিত সংখ্যক আবেদনকারী দেখা যায়নি।
সোমবার রাজধানীর যমুনা ফিউচার পার্কে অবস্থিত আইভ্যাকে গিয়ে দেখা যায়, আবেদনকারীদের উপস্থিতি স্বাভাবিক। অধিকাংশই মেডিকেল ভিসার আবেদন বা পাসপোর্ট সংগ্রহের জন্য এসেছেন। এছাড়া দিল্লি হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের দূতাবাসে ভিসার আবেদন করতে ইচ্ছুক কয়েকজন প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছেন। পর্যটন ভিসার আবেদনকারীর সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল।
পর্যটন ভিসার আবেদনকারী ইন্দ্রজিৎ বলেন, দীর্ঘদিন পর ভ্রমণ ভিসা চালু হওয়ায় তারা আনন্দিত। তবে স্লটভিত্তিক আবেদন ব্যবস্থা দীর্ঘ প্রক্রিয়ায় পরিণত হওয়ায় আবেদনকারীদের কিছুটা ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। আরেক আবেদনকারী শফিকুল ইসলাম বলেন, ভ্রমণ ভিসা চালু হওয়া ইতিবাচক হলেও স্লট ব্যবস্থা আবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াকে আগের তুলনায় জটিল করে তুলেছে। অনেককেই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই ট্রেন চালু হবে: আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে যাত্রীবাহী ট্রেন চালুর ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত যাত্রী ও বাণিজ্যিক লাভজনকতা। তার ভাষ্য, ভিসা সহজ না হলে যাত্রী বাড়বে না। আবার যাত্রী না থাকলে ট্রেন পরিচালনা লাভজনক হবে না। কোনো দেশই দীর্ঘদিন লোকসান দিয়ে এ ধরনের সেবা চালাতে চাইবে না।

তিনি বলেন, ট্রেন চালুর বিষয়টিকে রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার প্রয়োজন নেই। এটি মূলত ব্যবসা, পরিবহন এবং দুই দেশের পারস্পরিক স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। মানুষ যদি সহজে ভিসা পায়, তাহলে তারা ট্রেনে যাবে নাকি বিমানে যাবে, সেটি পরিবহন ব্যবস্থার বিষয়।
ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, বর্তমানে ভিসা নীতিতে কিছুটা শিথিলতা এসেছে। ফলে যাত্রী সংখ্যা বাড়লে দুই দেশই ট্রেন চালুর বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। কারণ, পর্যাপ্ত যাত্রী থাকা সত্ত্বেও ট্রেন বন্ধ থাকলে উভয় দেশেরই আর্থিক ক্ষতি হবে।
তিনি আরও বলেন, গত দুই বছরে জ্বালানির দাম বেড়েছে, যার প্রভাব বিমান ভাড়াতেও পড়েছে। ট্রেন পুনরায় চালু হলে ভাড়াও নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে। তবে ট্রেন চালু হলে তুলনামূলক কম খরচে যাতায়াতের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং সাধারণ মানুষের দাবিও আরও জোরালো হবে। ভিসা আরও সহজ হলে এবং যাত্রীর সংখ্যা বাড়লে ব্যবসায়িক প্রয়োজনেই বাংলাদেশ ও ভারত আন্তঃদেশীয় ট্রেন পুনরায় চালু করতে আগ্রহী হবে।