তুলার বাজারে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

তুলার বাজারে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
ছবির ক্যাপশান, তুলার বাজারে বাংলাদেশকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র

মার্কিন তুলা রপ্তানি বাড়ানোর নতুন পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে দেখছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির কৃষি বিভাগ সম্প্রতি ‘গ্রেট আমেরিকান কটন প্ল্যান’ ঘোষণা করেছে, যার অন্যতম লক্ষ্য হলো মার্কিন তুলা খাতকে চাঙা করা, তুলাভিত্তিক পণ্যের চাহিদা বাড়ানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি সুযোগ সম্প্রসারণ করা।

বাংলাদেশকে এই পরিকল্পনায় বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পেছনে বড় কারণ দেশের তৈরি পোশাক খাত। যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক, আর পোশাক উৎপাদনের জন্য তুলা ও সুতা দেশের টেক্সটাইল খাতের অন্যতম প্রধান কাঁচামাল। ফলে বাংলাদেশ যদি মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে পোশাক তৈরি করে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

চলতি বছরের ৯ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে নির্দিষ্ট কিছু বাংলাদেশি বস্ত্র ও পোশাকপণ্যের জন্য শূন্য ‘রেসিপ্রোকাল’ শুল্ক সুবিধার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। তবে এই সুবিধা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে এবং তা নির্ভর করবে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কী পরিমাণ তুলা ও কৃত্রিম তন্তু আমদানি করছে তার ওপর।

 

মার্কিন পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ইন্দোনেশিয়ার কাছ থেকে এমন প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে, যা ভবিষ্যতে মার্কিন তুলা ক্রয় এবং মার্কিন তুলা ব্যবহার করে টেক্সটাইল পণ্য উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা উৎপাদক, রপ্তানিকারক ও টেক্সটাইল সরবরাহকারীরা নতুন বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ দেখছেন।

 

বাংলাদেশ বছরে প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের তুলা আমদানি করে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ বর্তমানে প্রায় ৯ শতাংশ। তবে স্থানীয় টেক্সটাইল মিল মালিকদের মধ্যে মার্কিন তুলা ব্যবহারে আগ্রহ বাড়ছে। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত যদি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক সুবিধা কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারে, তাহলে মার্কিন তুলার আমদানি আরও বাড়তে পারে।

 

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল জানিয়েছেন, স্থানীয় সুতা ও বস্ত্রকল মালিকেরা আগের তুলনায় মার্কিন সরবরাহকারীদের কাছ থেকে বেশি তুলা কিনছেন। তবে মার্কিন তুলার ব্যবহার বাড়াতে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রুলস অব অরিজিন বা পণ্যের উৎপত্তি–সংক্রান্ত শর্ত এবং দীর্ঘ পরিবহন সময়।

 

তিনি বলেন, মার্কিন তুলার মান ভালো হলেও বাংলাদেশি রপ্তানিকারকেরা ঠিক কী ধরনের শুল্ক সুবিধা পাবেন, সে বিষয়ে আরও স্পষ্টতা দরকার। বিশেষ করে পোশাকে কত শতাংশ মার্কিন তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করতে হবে, কীভাবে উৎপত্তি নির্ধারণ হবে এবং সুবিধাটি সব রপ্তানির ক্ষেত্রে নাকি নির্দিষ্ট কোটার মধ্যে সীমিত থাকবে এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন।

 

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আনতে সাধারণত ৪৫ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে। অন্যদিকে ভারতসহ প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে তুলা আনা যায় তুলনামূলক কম সময়ে। ফলে সরবরাহ সময়, অর্থায়ন, গুদাম সুবিধা এবং লজিস্টিক ব্যবস্থাকে শক্তিশালী না করলে মার্কিন তুলা ব্যবহার বাড়ানো কঠিন হতে পারে।

 

বাংলাদেশে মার্কিন তুলা সংরক্ষণের জন্য গুদাম সুবিধা তৈরির প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এসেছে। ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, দেশে পর্যাপ্ত মজুতব্যবস্থা থাকলে আমদানিকারক, স্পিনিং মিল এবং পোশাক রপ্তানিকারকেরা দ্রুত কাঁচামাল পেতে পারবেন। এতে উৎপাদন সময় কমবে এবং রপ্তানি প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়বে।

 

বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও মার্কিন তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে রুলস অব অরিজিনের শর্ত নিয়ে আরও স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইছেন। কারণ নীতিমালা চূড়ান্ত না হলে রপ্তানিকারকদের পক্ষে বিনিয়োগ, কাঁচামাল পরিকল্পনা ও ক্রয়াদেশ ব্যবস্থাপনা ঠিক করা কঠিন।

 

২০২৫ সালে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পণ্য বাণিজ্য প্রায় ১১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর কথা বলা হয়েছে। ওই বছর বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। অন্যদিকে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি ছিল ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। ফলে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়ায় ৭ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে।

 

বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের মোট রপ্তানির বড় অংশই তৈরি পোশাক। তাই মার্কিন তুলা ব্যবহার করে শুল্ক সুবিধা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হলে তা বাংলাদেশের পোশাক খাতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে সুবিধাটি কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে শর্ত, কোটার পরিমাণ, উৎপত্তি নিয়ম, সরবরাহ সময় এবং ব্যয় কাঠামোর ওপর।

 

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পরিকল্পনা একদিকে মার্কিন তুলা খাতকে নতুন বাজার দেবে, অন্যদিকে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানিকারকদের জন্য শুল্ক সুবিধার সম্ভাবনা তৈরি করবে। তবে নীতিমালা অস্পষ্ট থাকলে এবং লজিস্টিক সমস্যা সমাধান না হলে এই সম্ভাবনা বাস্তবে পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হতে পারে।

 

সব মিলিয়ে মার্কিন তুলা ঘিরে বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যে নতুন আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। এখন রুলস অব অরিজিন, সুবিধার পরিমাণ এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্পষ্ট হলেই বোঝা যাবে বাংলাদেশের পোশাক খাত এই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারবে।


সম্পর্কিত নিউজ