{{ news.section.title }}
নবীজি (সা.) যে ৫ ধরনের পশু কোরবানি করেছেন
কোরবানি ইসলামের অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ ও গুরুত্বপূর্ণ আমল। কোরবানির ইতিহাস প্রথম মানব ও নবী আদম (আ.)-এর যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। পবিত্র কোরআনের সুরা মায়িদায় আদম (আ.)-এর দুই সন্তানের কোরবানির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে একজনের কোরবানি কবুল হয় এবং অন্যজনের কোরবানি কবুল হয়নি। এ ঘটনা থেকে বোঝা যায়, কোরবানির মূল ভিত্তি শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি, তাকওয়া ও আন্তরিকতা।
পবিত্র কোরআনে কোরবানির উদ্দেশ্য আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে-কোরবানির পশুর মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; বরং মানুষের তাকওয়াই আল্লাহর কাছে পৌঁছে। তাই কোরবানি শুধু সামাজিক উৎসব বা গোশত বণ্টনের বিষয় নয়, এটি আল্লাহর হুকুম পালনের মাধ্যমে আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার শিক্ষা।
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। মাসিক আল কাওসারের মাসআলা অনুযায়ী, প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে কোরবানি ওয়াজিব হয়। তবে নাবালেগ, অসুস্থ মস্তিষ্কের ব্যক্তি এবং শরিয়তসম্মত মুসাফিরের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার পর কখনও এ আমল ত্যাগ করেননি। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় দশ বছর অবস্থান করেছেন এবং প্রতি বছর কোরবানি করেছেন। আল কাওসারের তথ্য অনুযায়ী, এই হাদিসটি জামে তিরমিজি ও মুসনাদে আহমাদে বর্ণিত।
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির জন্য দৃষ্টিনন্দন, সুস্থ, মোটাতাজা ও ভালো পশু নির্বাচন করতেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির ইচ্ছা করলে দুটি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধুসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২২)
হাদিসে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কোরবানিতে একাধিক ধরনের পশুর বর্ণনা পাওয়া যায়। এর মধ্যে উট, মেষ বা ভেড়া, দুম্বা, গরু ও ছাগলের কথা উল্লেখ আছে। ফিকহবিদদের আলোচনায় গৃহপালিত পশুর মধ্যে উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি জায়েজ বলা হয়েছে। তবে হরিণ, বন্য গরু বা অন্য বন্য প্রাণী দ্বারা কোরবানি জায়েজ নয়।
১. উট: বিদায় হজে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায়ের জন্য ১০০টি উট কোরবানি করেন। যার ৬৩টি তিনি নিজে জবাই করেন আর বাকিগুলো হযরত আলী (রা.) জবাই করেন। (ত্বহাবি: ৬২৩৬) সহিহ মুসলিমের বর্ণনাতেও এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে ৬৩টি উট জবাই করেন এবং বাকি উটগুলো জবাই করার দায়িত্ব আলী (রা.)-কে দেন।
২. মেষ বা ভেড়া: হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে,
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির ইচ্ছা করলে দুটি মোটাতাজা, মাংসল, শিংযুক্ত, ধূসর বর্ণের ও খাসি করা মেষ ক্রয় করতেন। (ইবনে মাজাহ: ৩১২২)
৩. দুম্বা: আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত,
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ হাতে দুম্বা কোরবানি করেন। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ২৭৯২) হাদিস বিডির বাংলা অনুবাদে এই বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিংযুক্ত একটি দুম্বা আনতে বলেন, ছুরি ধার করতে বলেন এবং নিজ হাতে সেটি কোরবানি করেন।
৪. গরু: হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে,
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় স্ত্রীগণের পক্ষ থেকে গাভি দ্বারা কোরবানি করেছেন। (বুখারি: ২৯৪) সহিহ বুখারির এই বর্ণনায় হজের সফরের প্রসঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রীদের পক্ষ থেকে গরু কোরবানির কথা এসেছে।
৫. ছাগল: নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাগল দ্বারা তার নাতি হাসানের আকিকা করেছেন এবং সাহাবিদের ছাগল দ্বারা কোরবানি করার অনুমতি দিয়েছেন। এ ছাড়া ফকিহ আলেমরা গরু প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত এবং গৃহপালিত হওয়ায় মহিষ দ্বারা কোরবানি করা বৈধ বলেছেন।
কোরবানির পশুর বয়সের ক্ষেত্রেও শরিয়তের নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। আল কাওসারের মাসআলা অনুযায়ী, উট কমপক্ষে পাঁচ বছরের, গরু ও মহিষ কমপক্ষে দুই বছরের এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা এক বছরের কিছু কম হলেও যদি দেখতে এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট হয়, তাহলে তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ; তবে এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ছয় মাস বয়স হতে হবে। ছাগলের বয়স এক বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ নয়।
একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যায়। আর উট, গরু ও মহিষে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারেন। তবে প্রত্যেক শরিকের নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোরবানি হওয়া জরুরি। আল কাওসারের আলোচনায় বলা হয়েছে, উট, গরু বা মহিষে এক থেকে সাত পর্যন্ত যেকোনো ভাগে কোরবানি করা যায়।
কোরবানির পশু নির্বাচন করার সময় পশুর সুস্থতা ও ত্রুটিমুক্ত হওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুনানে আবু দাউদের হাদিসে চার ধরনের পশু কোরবানির ক্ষেত্রে পরিহার করতে বলা হয়েছে-যে পশুর এক চোখ স্পষ্টভাবে নষ্ট, যে পশু স্পষ্টভাবে অসুস্থ, যে পশু স্পষ্টভাবে খোঁড়া এবং যে পশু অত্যন্ত দুর্বল বা যার হাড়ে মজ্জা নেই।
কোরবানির সময় নিয়েও শরিয়তের নির্দিষ্ট নির্দেশনা আছে। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের পর কোরবানি করে, সে সঠিক সময়ে কোরবানি করে এবং মুসলমানদের সুন্নত অনুসরণ করে। আর যে ব্যক্তি ঈদের নামাজের আগে পশু জবাই করে, তার কোরবানি আদায় হয় না; তাকে আবার কোরবানি করতে হয়।
ফিকহি মাসআলা অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০ তারিখ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের আগ পর্যন্ত কোরবানির সময় থাকে। তবে সবচেয়ে উত্তম হলো প্রথম দিন কোরবানি করা। এরপর দ্বিতীয় দিন, এরপর তৃতীয় দিন।
কোরবানির গোশত বণ্টনের ক্ষেত্রেও ইসলাম দয়া, সহমর্মিতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়। পবিত্র কোরআনে কোরবানির পশুর গোশত নিজে খাওয়া এবং অভাবী মানুষকে খাওয়ানোর নির্দেশনা এসেছে। তাই কোরবানি শুধু ব্যক্তিগত ইবাদত নয়; বরং দরিদ্র, প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ারও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শনের বিষয়েও গুরুত্ব দিয়েছেন। কোরবানির পশুকে অযথা কষ্ট না দেওয়া, জবাইয়ের আগে ছুরি ধার করে নেওয়া এবং সুন্দরভাবে জবাই করা ইসলামের শিক্ষা। আল কাওসারের আলোচনায় আয়েশা (রা.)-এর বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা হয়েছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশুকে শোয়ানোর আগেই ছুরি ধার করার নির্দেশ দিতেন।
সব মিলিয়ে কোরবানি মুসলিম উম্মাহর জন্য শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাকওয়া, আত্মত্যাগ, দয়া ও সামাজিক সহমর্মিতার বড় শিক্ষা। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরবানির জন্য উত্তম পশু নির্বাচন করতেন, নিজ হাতে কোরবানি করতেন এবং উম্মতকে এ আমলের গুরুত্ব শিক্ষা দিয়েছেন। তাই সামর্থ্যবান মুসলমানের উচিত শরিয়তের বিধান মেনে সুস্থ, ত্রুটিমুক্ত ও উপযুক্ত বয়সের পশু দিয়ে কোরবানি আদায় করা।