আরাফার রোজা কবে রাখবেন, কী তার ফজিলত?

আরাফার রোজা কবে রাখবেন, কী তার ফজিলত?
ছবির ক্যাপশান, ছবি : সংগৃহীত

আরাফা আরবি শব্দ। এর অর্থ হলো চেনা, জানা বা উপলব্ধি করা। ইসলামী ঐতিহ্যে আরাফার দিনকে তওবা, ক্ষমা প্রার্থনা, দোয়া ও আল্লাহর নৈকট্য লাভের বিশেষ দিন হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বহু বর্ণনায় আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলনের কথাও উল্লেখ করা হয়, তবে এ বিষয়ে কোরআন ও সহিহ হাদিসে সরাসরি স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায় না। তাই নিশ্চিত আকিদার বিষয় হিসেবে নয়, বরং ঐতিহাসিক বর্ণনা হিসেবেই এটি উল্লেখ করা হয়।

জিলহজ মাসের ৯ তারিখ পবিত্র আরাফাতের দিন। এ দিনটি হজের অন্যতম প্রধান রুকন ‘উকুফে আরাফা’র দিন। সৌদি আরবের সর্বোচ্চ আদালতের ঘোষণার পর দেশটিতে ১ জিলহজ শুরু হয়েছে সোমবার, ১৮ মে। সে হিসাবে সৌদি আরবে এ বছরের আরাফাতের দিন মঙ্গলবার, ২৬ মে এবং ঈদুল আজহা বুধবার, ২৭ মে।

 

বাংলাদেশে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, জিলহজ মাস গণনা শুরু হয়েছে মঙ্গলবার, ১৯ মে। সে হিসাবে বাংলাদেশে ঈদুল আজহা হবে বৃহস্পতিবার, ২৮ মে। তাই বাংলাদেশের মুসলমানরা নিজ দেশের চাঁদ দেখার হিসাব অনুযায়ী ৯ জিলহজ অর্থাৎ বুধবার, ২৭ মে আরাফার রোজা রাখবেন।

 

আরাফার দিনের রোজা মূলত একটি। হাদিসে আরাফাতের দিনের একটি রোজার কথাই এসেছে। যারা বলেন, একদিন রোজা রাখলে হবে না-তাদের কথা সঠিক নয়। আল কাওসারের আলোচনায় বলা হয়েছে, ‘ইয়াওমে আরাফা’ দ্বারা মূলত ৯ জিলহজ উদ্দেশ্য। যে অঞ্চলে যেদিন ৯ জিলহজ হবে, ওই অঞ্চলের মানুষ সেদিনই আরাফার রোজা রাখবেন।

 

আরাফাতের দিনে একটি রোজা রাখলে বান্দার দুই বছরের গুনাহ মাফ হয় বলে হাদিসে এসেছে। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আরাফাতের দিনের রোজার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যে, তিনি আগের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন। (মুসলিম: ১১৬২)

 

আরেক হাদিসে এসেছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের স্ত্রী বর্ণনা করেন, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৯ জিলহজ তারিখে রোজা রাখতেন। (আবু দাউদ: ২৪৩৭)

 

তবে যারা হজ পালন করছেন, তাদের জন্য আরাফার ময়দানে রোজা না রাখাই উত্তম। কারণ হাজিদের ওই দিন দীর্ঘ সময় আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, দোয়া, জিকির ও হজের অন্যান্য আমলে ব্যস্ত থাকতে হয়। হাদিসে এসেছে, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজের সময় আরাফার দিনে রোজা রাখেননি; তিনি সবার সামনে দুধ পান করেছিলেন, যাতে মানুষ জানতে পারে তিনি রোজাদার নন।

 

আরাফার দিনের আরেক বড় ফজিলত হলো-এ দিন আল্লাহ বান্দাদের ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আরাফার দিনের চেয়ে এমন কোনো দিন নেই, যেদিন আল্লাহ বেশি সংখ্যক বান্দাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তিনি নিকটবর্তী হন এবং ফেরেশতাদের সামনে বান্দাদের নিয়ে গর্ব করেন।

 

এ দিন দোয়ারও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, সর্বোত্তম দোয়া হলো আরাফার দিনের দোয়া। আর আমি ও আমার পূর্ববর্তী নবীরা যে শ্রেষ্ঠ কথা বলেছেন তা হলো-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারিকা লাহু, লাহুল মুলকু ওয়া লাহুল হামদু ওয়া হুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদির।

 

আরাফার দিন ইসলামি ইতিহাসেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনেই নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর সুরা মায়িদার সেই আয়াত নাজিল হয়, যেখানে আল্লাহ বলেন-আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম, তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে মনোনীত করলাম। উমর (রা.) বলেছেন, এই আয়াত আরাফার দিন, শুক্রবার, নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাতে অবস্থান করার সময় নাজিল হয়।

 

তবে আরাফার দিনের ফজিলত বুঝতে হলে জিলহজের প্রথম দশ দিনের গুরুত্বও জানা জরুরি। মহান আল্লাহ সুরা ফজরের শুরুতে বলেন-

وَ الۡفَجۡر- وَ لَیَالٍ عَشۡرٍ

উচ্চারণ: ওয়াল ফাজর ওয়ালায়ালিন আশর।
অর্থ: শপথ ফজরের, শপথ দশ রাতের।

 

অধিকাংশ মুফাসসিরের মতে, এখানে দশ রাত বলতে জিলহজ মাসের প্রথম দশ রাত উদ্দেশ্য। তাফসিরে ইবনে কাসিরেও এ মতকে শক্তিশালী বলা হয়েছে।

নবীজি সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

জিলহজ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল আল্লাহর নিকট যত প্রিয়, আর কোনো দিনের আমল তত প্রিয় নয়। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, আল্লাহর পথে জিহাদও কি এর চেয়ে প্রিয় নয়? তিনি বললেন, না, আল্লাহর পথে জিহাদও এ দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে প্রিয়তর নয়। তবে ওই ব্যক্তির কথা ভিন্ন, যে নিজের প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে জিহাদে বেরিয়ে যান এবং কোনো কিছু নিয়ে আর ফিরে আসেন না। (বুখারি: ৯৬৯)

 

এ কারণে উত্তম হলো, যারা সক্ষম তারা জিলহজ মাসের ১ তারিখ থেকে ৯ তারিখ পর্যন্ত নফল রোজা রাখবেন। এতে আরাফাত দিবসের রোজা তো পাওয়া যাবেই, পাশাপাশি জিলহজের প্রথম দশকের বিশেষ ফজিলতও লাভ করা যাবে। ইসলামি ফিকহবিদদের মতে, এ সময় বেশি বেশি নফল নামাজ, রোজা, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা, তওবা-ইস্তেগফার, তাকবির, তাহলিল ও তাহমিদ পাঠ করা উচিত।

 

সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে, ইবনে উমর (রা.) ও আবু হুরায়রা (রা.) জিলহজের প্রথম দশ দিনে বাজারে বের হয়ে তাকবির পাঠ করতেন। তাদের তাকবির শুনে অন্য মানুষও তাকবির পাঠ করতেন। এ থেকে বোঝা যায়, এ দিনগুলোতে আল্লাহর জিকির প্রকাশ করা সাহাবিদের আমল ছিল।

 

আরাফার রোজা রাখা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি এ দিনের মূল শিক্ষা হলো তওবা, আত্মশুদ্ধি ও আল্লাহর কাছে ফিরে আসা। বান্দা যেন নিজের গুনাহের জন্য অনুতপ্ত হয়, আল্লাহর কাছে ক্ষমা চায়, ভবিষ্যতে পাপ থেকে বেঁচে থাকার অঙ্গীকার করে এবং নিজের আমলকে সংশোধনের চেষ্টা করে-আরাফার দিন সেই সুযোগ এনে দেয়।

 

সব মিলিয়ে আরাফার দিন মুসলিম উম্মাহর জন্য রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের এক বিশেষ দিন। যারা হজে নেই, তাদের জন্য এ দিনের সবচেয়ে বড় আমল হলো রোজা রাখা। আর যারা হজে আছেন, তাদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো আরাফাতের ময়দানে অবস্থান, দোয়া, জিকির ও আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করা। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত নিজ দেশের চাঁদ দেখার হিসাব অনুযায়ী ৯ জিলহজ আরাফার রোজা রাখা এবং দিনটি বেশি বেশি ইবাদত, দোয়া ও তওবার মাধ্যমে কাটানো।

 

তথ্যসূত্র: আল কাওসার


সম্পর্কিত নিউজ