কোরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি শুদ্ধ হয় না

কোরবানির পশুতে যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি শুদ্ধ হয় না
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

কোরবানি ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এ ইবাদত বিশুদ্ধভাবে আদায় করার জন্য কোরবানির পশু শরিয়তসম্মত, উপযুক্ত বয়সের এবং দোষ-ত্রুটিমুক্ত হওয়া জরুরি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি সব জাতির জন্য কোরবানির বিধান রেখেছি, যেন আমি তাদের জীবনোকরণ হিসেবে যে চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি তাতে (জবাই করার সময়) আল্লাহর নাম স্মরণ করে।(সুরা হজ, আয়াত : ৩৪)

 

কোরবানির মূল উদ্দেশ্য শুধু পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়া অর্জন। সুরা হজের আরেক আয়াতে বলা হয়েছে, কোরবানির পশুর মাংস বা রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না; বরং বান্দার তাকওয়াই আল্লাহর কাছে পৌঁছে। তাই পশু কেনা থেকে শুরু করে জবাই পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নিয়ত, সতর্কতা ও শরিয়তের বিধান মানা জরুরি।

 

ইসলামি ফিকহের আলোচনায় কোরবানির পশুর জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে। পশুটি গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হতে হবে, নির্ধারিত বয়সে পৌঁছাতে হবে, কোরবানিদাতার মালিকানাধীন হতে হবে এবং এমন বড় ত্রুটি থেকে মুক্ত হতে হবে, যা কোরবানির শুদ্ধতার পথে বাধা হয়। ইসলাম কিউএ-র আলোচনাতেও কোরবানির পশুর জন্য এসব মৌলিক শর্ত উল্লেখ করা হয়েছে।

 

কোরবানির পশু সব ধরনের শারীরিক ত্রুটিমুক্ত হওয়া জরুরি। গুণগত দিক থেকে উত্তম হলো, পশুটি দেখতে সুন্দর, নিখুঁত বা দোষত্রুটি মুক্ত ও হৃষ্টপুষ্ট। যে পশু দেখলে পছন্দ হয়। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) শিংবিশিষ্ট ও মোটাতাজা একটি মেষ কোরবানি করেছেন।এর চেহারা, পা ও চোখ ছিল মিটমিটে কালো। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ৩১২৮)

 

হাদিসের আলোকে ফকিহ আলেমরা বলেছেন, এমন পশু নির্বাচন করা উত্তম, যা সুস্থ, সবল, সুন্দর ও গোশতসমৃদ্ধ। কারণ কোরবানি আল্লাহর নামে নিবেদিত ইবাদত; তাই সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো পশু নির্বাচন করা তাকওয়ার পরিচায়ক। ইসলাম কিউএ-র আলোচনায়ও বলা হয়েছে, কোরবানির জন্য উত্তম পশু হলো হৃষ্টপুষ্ট, গোশতসমৃদ্ধ, শারীরিকভাবে পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর পশু।

 

পশুর যেসব ত্রুটি থাকলে কোরবানি শুদ্ধ হয় না

এ বিষয়ে ইসলামী শরিয়তের বিধান নিম্নরূপ :

১. অন্ধ : যে গরু চোখে দেখতে পায় না, তা স্পষ্ট।

২. রোগাগ্রস্ত : রোগ-বালাইয়ে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট।

৩. পঙ্গু : যে পশু হাঁটাচলা করতে পারে না।৪. আহত : যার কোনো অঙ্গ ভেঙে গেছে তা স্পষ্ট। (সুনানে তিরমিজি, হাদিস : ১৪৯৭)

এই চার ধরনের ত্রুটির মূল ভিত্তি হাদিসে এসেছে। বারা ইবনে আজিব (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এক চোখ স্পষ্ট নষ্ট, প্রকাশ্য অসুস্থ, স্পষ্ট খোঁড়া এবং অতি দুর্বল-এমন পশু কোরবানির জন্য অগ্রহণযোগ্য বলা হয়েছে। আল কাওসারেও এই হাদিসটি সহিহ ইবনে হিব্বান, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসায়ি ও জামে তিরমিজির সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

৫. যে পশুর একটি দাঁতও নেই বা এত বেশি দাঁত পড়ে গেছে যে ঘাস বা খাদ্য চিবাতে পারে না-এমন পশু দ্বারা কোরবানি করা জায়েয নয়। (বাদায়িউস সানায়ে : ৪/২১৫; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি ৫/২৯৮)

তবে দাঁত পড়ে যাওয়ার বিষয়টি সব অবস্থায় একই নয়। ফিকহি আলোচনায় বলা হয়েছে, অধিকাংশ দাঁত না থাকলেও যদি পশুটি বাকি দাঁত দিয়ে স্বাভাবিকভাবে ঘাস বা খাদ্য চিবিয়ে খেতে পারে, তাহলে তার কোরবানি সহিহ হবে। কিন্তু দাঁত পড়ে যাওয়ার কারণে যদি খাদ্য চিবিয়ে খেতে না পারে, তাহলে সে পশু কোরবানির উপযুক্ত নয়।

৬. যে পশুর শিং একেবারে গোড়া থেকে ভেঙে গেছে, যে কারণে মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; সে পশুর কোরবানি জায়েজ নয়। পক্ষান্তরে যে পশুর অর্ধেক শিং বা কিছু শিং ফেটে বা ভেঙে গেছে বা শিং একেবারে ওঠেনি সে পশু কোরবানি করা জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার : ৬/৩২৪; ফাতাওয়ায়ে আলমগিরি : ৫/২৯৭)

এ বিষয়ে অনেকের ভুল ধারণা থাকে যে, শিং সামান্য ভাঙা থাকলেও কোরবানি হবে না। অথচ ফিকহি মাসআলা হলো, শিং ভাঙার কারণে যদি মাথা বা মস্তিষ্ক ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, তাহলে সে পশু দ্বারা কোরবানি জায়েজ। এমনকি জন্মগতভাবে শিং না উঠলেও কোরবানি শুদ্ধ হবে।

৭. যে পশুর লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তারও বেশি কাটা, সে পশুর কোরবানি জায়েজ নয়।আর যদি অর্ধেকের বেশি থাকে তাহলে তার কোরবানি জায়েজ। তবে জন্মগতভাবেই যদি কান ছোট হয় তাহলে অসুবিধা নেই। (সুনানে তিরমিজি : ১/২৭৫; হেদায়া : ৪/৪৪৭)

কান ও লেজের ত্রুটির ক্ষেত্রেও পরিমাণ বিবেচ্য। আল কাওসারের মাসআলায় বলা হয়েছে, লেজ বা কোনো কান অর্ধেক বা তার বেশি কাটা হলে কোরবানি জায়েজ নয়। আর অর্ধেকের কম কাটা হলে কোরবানি জায়েজ। তবে পূর্ণাঙ্গ ও সুন্দর পশু নির্বাচন করাই উত্তম।

 

কোরবানির পশু ক্রয়ে যাচাই-বাছাই গুরুত্বপূর্ণ

কোরবানির পশু কেনার ক্ষেত্রে শুধু দাম, আকার বা বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখলেই চলবে না; বরং চোখ, কান, দাঁত, পা, শিং, লেজ, চলাফেরা, খাওয়া-দাওয়া ও স্বাভাবিক আচরণ ভালোভাবে যাচাই করতে হবে। কারণ অনেক সময় পশু বাইরে থেকে সুস্থ দেখালেও চলাফেরায় খোঁড়ামি, চোখে সমস্যা বা খাদ্য চিবাতে অক্ষমতা থাকতে পারে।

 

কোরবানির পশু ক্রয়ের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আলী (রা.) বলেন, আমাদের রাসুল (সা.) আদেশ করেছেন, আমরা যেন কোরবানির পশুর চোখ ও কান ভালো করে দেখে নিই এবং কান কাটা, কান ছেঁড়া বা কানে গোলাকার ছিদ্র করা পশু দ্বারা কোরবানি না করি। (সুনানে আবি দাউদ, হাদিস : ২৮০৪)

 

ফকিহদের আলোচনায় আরও বলা হয়েছে, যে পশু জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারে না, অতিরিক্ত দুর্বল, গুরুতর অসুস্থ বা এমন আঘাতপ্রাপ্ত যে তার স্বাভাবিকতা নষ্ট হয়ে গেছে-এমন পশু কোরবানির জন্য গ্রহণযোগ্য নয়। তবে সামান্য দাগ, ছোটখাটো আঁচড় বা এমন ত্রুটি, যা পশুর গোশত, স্বাস্থ্য ও স্বাভাবিক চলাচলে প্রভাব ফেলে না, তা সাধারণত কোরবানির শুদ্ধতার পথে বাধা নয়।

 

কোরবানির পশুর বয়সও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সাধারণভাবে উট কমপক্ষে পাঁচ বছর, গরু ও মহিষ কমপক্ষে দুই বছর এবং ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছর বয়সী হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা ছয় মাসের বেশি বয়সী হয়ে যদি এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট দেখা যায়, তাহলে তা দ্বারা কোরবানি জায়েজ বলা হয়েছে।

 

ইসলাম পশুর প্রতি দয়া ও সুন্দর আচরণের শিক্ষাও দিয়েছে। তাই পশুকে অযথা কষ্ট দেওয়া, এক পশুর সামনে অন্য পশু জবাই করা, ধারালো অস্ত্র ছাড়া জবাই করা বা জবাইয়ের পর নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া ছাড়ানো-এসব কাজ থেকে বিরত থাকা উচিত। আল কাওসারের মাসআলায়ও জবাইয়ের সময় পশুকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত কষ্ট না দেওয়ার নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে। মহান আল্লাহ! আমাদের আমল করার তাওফিক দিন। আমিন।


সম্পর্কিত নিউজ