{{ news.section.title }}
শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা করলেই কি সফলতা আসবে? ইসলাম কী শেখায়?
তাওয়াক্কুল মানে কি শুধু আল্লাহর ওপর ভরসা? রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি হাদিসেই মিলেছে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা
কোনো কাজে ব্যর্থ হলে অনেকেই বলেন, "আল্লাহর ওপর ভরসা ছিল।" আবার কেউ কেউ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বা চেষ্টা না করেই মনে করেন, শুধু আল্লাহর ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট। ইসলামি শিক্ষার আলোকে এই ধারণা সম্পূর্ণ নয়। কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুযায়ী, তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর ভরসা কখনোই কর্মবিমুখতা বা দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার নাম নয়। বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা, সঠিক পরিকল্পনা, বৈধ উপায় অবলম্বন এবং আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনার পর ফলাফল তাঁর হাতে সোপর্দ করাই প্রকৃত তাওয়াক্কুল।
এই বিষয়টি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু গভীরভাবে ফুটে উঠেছে রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর একটি সুপরিচিত হাদিসে। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, এক ব্যক্তি নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর কাছে এসে জানতে চান, "আমি কি আমার উটটিকে ছেড়ে রেখে আল্লাহর ওপর ভরসা করব, নাকি আগে বেঁধে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করব?"
উত্তরে রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন,
"আগে উটটি বেঁধে রাখো, তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো।"
(জামি' আত-তিরমিজি, হাদিস: ২৫১৭)
ইসলামি গবেষকদের মতে, এই একটি বাক্যের মধ্যেই তাওয়াক্কুলের পূর্ণাঙ্গ দর্শন নিহিত রয়েছে। মানুষের দায়িত্ব হলো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সব ধরনের বৈধ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এরপর ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছা ও ফয়সালার ওপর ছেড়ে দেওয়াই একজন মুমিনের পরিচয়।
তাওয়াক্কুল ও মানবিক দায়িত্ব
আরবি "তাওয়াক্কুল" শব্দটির অর্থ আল্লাহর ওপর নির্ভর করা বা তাঁর ওপর নিজের বিষয় সোপর্দ করা। তবে এই নির্ভরতা কখনোই নিষ্ক্রিয়তার সমার্থক নয়। ইসলাম মানুষকে কাজ করতে, পরিকল্পনা করতে, পরিশ্রম করতে এবং নিজের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে উৎসাহিত করে।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, মানুষ চেষ্টা করবে, আর সফলতা দান করবেন আল্লাহ। অর্থাৎ প্রচেষ্টা মানুষের দায়িত্ব, আর ফলাফল নির্ধারণ আল্লাহর এখতিয়ার।
কুরআনের আলোকে তাওয়াক্কুল
পবিত্র কুরআনেও আল্লাহর ওপর ভরসার পাশাপাশি দায়িত্ব পালনের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,
"অতঃপর যখন তুমি সিদ্ধান্ত গ্রহণ করো, তখন আল্লাহর ওপর ভরসা করো। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর ওপর ভরসাকারীদের ভালোবাসেন।"
(সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
তাফসিরবিদদের মতে, এই আয়াতে প্রথমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের কথা বলা হয়েছে, এরপর আল্লাহর ওপর ভরসার নির্দেশ এসেছে। অর্থাৎ ইসলামের শিক্ষা হলো পরিকল্পনা ও প্রচেষ্টার পর তাওয়াক্কুল।
শুধু ভরসা নয়, প্রয়োজন প্রস্তুতিও
ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ নিজেই প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন। হিজরতের সময় তিনি নিরাপদ পথ নির্বাচন করেন, দক্ষ পথপ্রদর্শক নিয়োগ দেন, প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং সব ধরনের বাস্তব ব্যবস্থা নিশ্চিত করেন। একই সঙ্গে আল্লাহর সাহায্যের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখেন।
বদর, উহুদ ও খন্দকের যুদ্ধসহ বিভিন্ন ঘটনাতেও তিনি কৌশলগত পরিকল্পনা, পরামর্শ এবং বাস্তব প্রস্তুতির মাধ্যমে সাহাবিদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, আল্লাহর ওপর ভরসা কখনোই দায়িত্ব পালনের বিকল্প নয়।
দৈনন্দিন জীবনে এই শিক্ষার প্রয়োগ
ইসলামি গবেষকদের মতে, তাওয়াক্কুলের শিক্ষা শুধু ধর্মীয় ইবাদতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এর বাস্তব প্রয়োগ রয়েছে।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফলের জন্য নিয়মিত পড়াশোনা করবেন, একজন কৃষক জমি চাষ করবেন ও ফসলের পরিচর্যা করবেন, একজন ব্যবসায়ী সততা ও পরিকল্পনার সঙ্গে ব্যবসা পরিচালনা করবেন, একজন রোগী চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন এবং ওষুধ সেবন করবেন। এরপর সবাই আল্লাহর কাছে উত্তম ফলের জন্য দোয়া করবেন এবং তাঁর সিদ্ধান্তের ওপর সন্তুষ্ট থাকবেন।
অহংকার নয়, হতাশাও নয়
ইসলামি পণ্ডিতরা বলেন, তাওয়াক্কুল মানুষের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ মানসিকতা তৈরি করে। সফল হলে সে অহংকার করে না, কারণ সে বিশ্বাস করে সফলতা আল্লাহর দান। আবার ব্যর্থ হলেও ভেঙে পড়ে না, কারণ সে জানে আল্লাহর প্রতিটি ফয়সালার পেছনেই রয়েছে প্রজ্ঞা ও কল্যাণ।
এ কারণেই তাওয়াক্কুল একজন মুমিনকে একই সঙ্গে কর্মঠ, বিনয়ী, ধৈর্যশীল এবং আশাবাদী হতে শেখায়।
ইসলাম যে ভারসাম্যের শিক্ষা দেয়
ইসলাম একদিকে ভাগ্যবাদকে সমর্থন করে না, অন্যদিকে মানুষকে নিজের শক্তির ওপর সম্পূর্ণ নির্ভর করতেও উৎসাহিত করে না। বরং ইসলাম এমন একটি ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থা শিক্ষা দেয়, যেখানে চেষ্টা ও দোয়া, পরিকল্পনা ও বিশ্বাস, দায়িত্ব ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতা একে অপরের পরিপূরক।
রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর "উট বেঁধে তারপর আল্লাহর ওপর ভরসা করো" এই সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা আজও মুসলিমদের জন্য একটি চিরন্তন নীতিমালা হিসেবে বিবেচিত। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা, কর্মজীবন কিংবা সমাজ, প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই শিক্ষা স্মরণ করিয়ে দেয় যে, একজন মুমিন সর্বোচ্চ চেষ্টা করবেন, বৈধ উপায় অবলম্বন করবেন, আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইবেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁর ফয়সালার ওপরই সন্তুষ্ট থাকবেন। ইসলামের দৃষ্টিতে এটিই প্রকৃত তাওয়াক্কুলের পরিচয়।