{{ news.section.title }}
ঈদে কুরবান
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরুদ ও সালাম আখেরি রাসূলের জন্য, তাঁর পরিবার ও সাহাবিদের জন্য নিবেদিত। আমরা আজ কুরবানি নিয়ে কথা বলব। ‘কুরবানি’ হচ্ছে আল্লাহর জন্য খুন প্রবাহিত করার ইবাদত, যা একটি প্রাচীন প্রথা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ বিষয়ে সাহাবারা প্রশ্ন করেন। জবাবে নবীজি বলেন, ‘এ কুরবানি হলো ইবরাহিম আলাইহিস সালামের সুন্নাহ।’ আবার জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের জন্যে এতে কি কল্যাণ আছে?’ নবীজি বলেন, ‘কুরবানির পশুর প্রতিটি পশমে রয়েছে।’ [মিশকাতুল মাসাবিহ : ১৪৭৬, ইবনে মাজাহ : ৩১২৭]
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, ‘কুরবানির দিন বনি আদমের কোনো আমল আল্লাহর নিকট কুরবানির পশুর রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে প্রিয় নয়। সে পশুর পশম, শিং, খুরাসহ কিয়ামতের দিন নেকির পাল্লায় ওজন হবে। কুরবানির পশুর খুন মাটিতে পড়ার আগে আল্লাহর আরশে আজিমে পৌঁছে যায়। তোমরা কুরবানিকে ঈদের আনন্দ বোঝো।’ [তিরমিজি : ১৪৯৩, হাকেম : ৭৫২৩]
পৃথিবীর সকল জাতি ভোগ ও উপভোগ করাকে আনন্দ ও ঈদ হিসেবে উৎসব করে। অন্যদিকে ত্যাগ ও কুরবানিকে ঈদ ও উৎসব হিসেবে পালন করে উম্মতে। এটিকে পশু হত্যা ও নিষ্ঠুরতা বলে যে গরুপূজারি এবং গোবর গোচনা পানকারীরা, তাদেরকে আমরা বনি আদম বলতে লজ্জা অনুভব করি। এ অধমেরা এখনও ধর্মের নামে হাজারো মাসুম মানবসন্তান ও কুমারীদেরকে নরবলি দেয় কল্পিত দেবীর সš‘ষ্টির নিমিত্তে। একটা সময় স্বামীর চিতায় অসংখ্য বিধবা নারীকে জ্বলন্ত আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে এ পাপিষ্ঠরা। এদের এক বিবেকবান ব্যক্তি রাজা রামমোহন রায় ত্যক্ত হয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘এটা কী করে ধর্ম হয়? নরবলি ও সতীদাহের নির্মম নিষ্ঠুরতা!’ আমি জানি না, দেব-দেবীদের অশ্লীল ব্যভিচার ও যৌনাচারের কুৎসিত লীলা ও শিব লিঙ্গের পূজা বিকৃত ভগবত গীতার মধ্যেও কি আছে? আসমানি সকল কিতাবের বিশেষজ্ঞ, সকল ধর্মের পণ্ডিতদের নিকট গ্রহণযোগ্য ডা. জাকির নায়েক এখনও জীবিত আছেন; যার হাতে হাজার মুশরিক তাওবা করে তাওহিদের দিকে ফিরে এসেছেন। ‘কুরবানি ও গো-হত্যা’ বিষয়ে তাঁর আলোচনা অন্ধদের জন্য দৃষ্টিদান তুল্য।
এবার আমি কুরবানি বিষয়ে আল্লাহ তায়ালার ওহীতে নজর দেবো। সেই ঘটনা বলব, যা মানবেতিহাসে একবারই সংগঠিত হয়েছিল। ইবরাহিম আলাইহিস সালাম যে কুরবানির উদ্বোধন করেন, তা আল্লাহর এক কঠিন পরীক্ষা। ইবরাহিমকে আল্লাহ তাঁর খলিল তথা ‘সুপ্রিয় বন্ধু’ বলেছেন। লক্ষ আম্বিয়ার মধ্যে পাঁচজন উলুল আজম রাসূলের তিনি একজন। তাঁকে মুসলিম মিল্লাতের পিতার মর্যাদায় আসীন করা হয়েছে।
‘তোমরা তোমাদের জাতির পিতা ইবরাহিমের মিল্লাতের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো। তিনি তোমাদের মুসলিম নামে অভিহিত করেছেন।’ [সূরা হজ : ৭৮]
ইবরাহিম আলাইহিস সালাম নমরুদের ভয়াল অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হলেন যুবক বয়সে হকের দাওয়াত দেওয়ার অপরাধে। জনবসতি প্রত্যক্ষ করল-চল্লিশ দিন পর্যন্ত বিবস্ত্র ইবরাহিম নতুন বস্ত্রে সজ্জিত হয়ে দাউ দাউ আগুনের মধ্যখানে আঙুর খা”েছ, পানীয় পান করছে, আল্লাহকে সেজদা দিচ্ছে। মুখে এক জিকির ছিল-
‘আমার জন্য মহান আল্লাহ তায়ালাই একমাত্র কার্যনির্বাহক।’ [সূরা আলে ইমরান : ১৭৩]
সে মহান রব আগুনকে নির্দেশ দেন-
‘আমি আগুনকে বললাম, “হে আগুন! তুমি ইবরাহিমের জন্য শান্তিময় শীতল হয়ে যাও”।’ [সূরা আম্বিয়া : ৬৯]
একটা সময় পর ইবরাহিম আলাইহিস সালাম অগ্নিপূজক বাদশাহ নমরুদের আগুনের কুণ্ডলী হতে সম্পূর্ণ সু¯’ অব¯’ায় বের হয়ে এলেন। জাতির মানুষ এ মুজিজা দেখল, অথচ একজনও ঈমান আনল না। এমনকি স্বয়ং ইবরাহিম আলাইহিস সালামের পিতা নমরুদের ধর্মমন্ত্রী আজর শুধু ঈমান আনেনি তা নয়, বরং সন্তানকে গৃহে প্রবেশ করতেও বাধা দিলো। ইবরাহিম তাঁর স্ত্রী সারা ও ভ্রাতুষ্পুত্রলুতকে নিয়ে জন্মভ‚মি ইরাক হতে আল্লাহর নির্দেশে ফিলিস্তিনের পথে হিজরত করলেন। কুরআনে আছে-
‘ইবরাহিম বলল, “আমি তো আমার রবের দিকে হিজরত করছি”।’ [সূরা আনকাবুত : ২৬]
বয়সের ভারে নুইয়ে পড়েছেন অথচ বৃদ্ধ ইবরাহিম তখনও নিঃসন্তান। আল্লাহকে বলললেন,
‘হে আমার প্রভু! আমাকে নেককার সন্তান বখশিস করুন।’ [সূরা সাফ্ফাত : ১০০-১০১]
‘আমি ইবরাহিমকে এক ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিলাম। সে পিতার সাথে দৌড়াদৌড়ি করার বয়সে উপনীত হলো। ইবরাহিম সাত/আট বছরের একমাত্র সন্তান ইসমাইলকে বলল, “হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি, তোমাকে আমি আল্লাহর ই”ছায় জবেহ করছি। তুমি কি মনে করো?” সে ছোটো ছেলে ইসমাইল এক অচিন্তনীয় ও বিজ্ঞতাপূর্ণ জবাব দিলো, “হে আব্বাজান! আপনার রবের হুকুমে আমাকে জবেহ করে দেন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন”।’ [সূরা সাফ্ফাত : ১০১-১০২]
লক্ষ করুন! নবুয়ত ঘোষণা, মূর্তি ভাঙা-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে নিজ পিতা আর নমরুদের সাথে প্রচণ্ড দ্ব›েদ্বর কারণে ইবরাহিমকে আগুনে নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছিল। এরপর ধারাবাহিকভাবে শুরু হলো ত্যাগ ও কুরবানির অবিশ্বাস্য অভিযান। লাখো আম্বিয়াদের মধ্যে একমাত্র ইবরাহিম আলাইহিস সালাম চল্লিশ দিন পর্যন্ত আগুনের মধ্যে বাস করেছেন জান্নাতি পরিবেশে। বের হয়ে আবার দাওয়াত দিলেন তাওহিদের। এবার পিতার ঘরে ঢোকার অনুমতি নেই। হিজরতের হুকুম এলো। জন্মভ‚মি, পিতার ভিটা হতেও নিঃস্ব হয়ে সারা আলাইহাস সালামসহ ফিলিস্তিনের পথে কুরবানি ও ত্যাগের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
এবার দৃশ্যপটে আসবেন হাজেরা আলাইহাস সালাম, যিনি ছিলেন মূলত সারা আলাইহাস সালামের সেবিকা। মিশরীয় জালেম রাজার পক্ষ হতে উপহার পেয়েছিলেন তিনি। হাজেরাকে স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করার জন্যে স্বামীকে দান করলেন সারা। এ ভাগ্যবতী রমণীর গর্ভেই জন্মগ্রহণ করেন ইসমাইল আলাইহিস সালাম। সারা আলাইহাস সালাম স্বাভাবিক মানবপ্রবৃত্তির বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই ব্যাপারটাকে কিছুটা ঈর্ষার চোখে দেখতে লাগলেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য শিশু ইসমাইলকে হাজার হাজার মাইল দূরে বৃক্ষ-লতাহীন পাথরের পাহাড়ঘেরা মক্কায় অব¯ি’ত কাবাগৃহের শূন্য ভিটার পাদদেশে রেখে এলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। এরপর ফিরে গেলেন ফিলিস্তিনে।
এতদিন পর পাওয়া বার্ধক্য বয়সের সন্তানটিকে আল্লাহ তাঁর মা-সহ মরুভ‚মির বিরানভ‚মিতে রেখে আসতে বলা যে কত বড়ো পরীক্ষা, তা আমার-আপনার পক্ষে আজ কল্পনা করাও কঠিন! অথচ আল্লাহর প্রিয়তম পয়গম্বর এ আদেশের ওপর কোনো অভিযোগের বাক্য তো দূরের কথা, একটি শব্দও উ”চারণ করলেন না। বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার সময় হাজেরা আলাইহাস সালাম স্বামীকে কেবল জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটি কি আল্লাহর নির্দেশ?’ ইবরাহিম বললেন, ‘হ্যাঁ, আল্লাহর হুকুমে রেখে যা”িছ।’ হাজেরা বললেন, ‘যদি আল্লাহর নির্দেশ হয়ে থাকে, তাহলে আমার কোনোই আপত্তি নেই। আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট হবেন।’
মক্কায় ফেলে আসা শিশুপুত্র ইসমাইল ও তাঁর মাকে দেখে আসার জন্য কোনো হুকুম হয়নি ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রতি। হুকুম হয়েছে তখন, যখন ছেলে ইসমাইল বাবার হাত ধরে হাঁটার ও খেলাধুলা করার বয়সে পৌঁছেছে। এতদিন পরে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম হাজেরা ও ইসমাইলকে দেখতে এলেন। সকলেই খুশি! কিš‘ ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ইসমাইলের জন্য যে বার্তা নিয়ে এলেন, আপাতদৃষ্টিতে তা ছিল নির্মম ও নিষ্ঠুর। এতদিন কীভাবে ছিল, কী সুবিধা-অসুবিধা হয়েছে ইত্যাদি যেন কোনো বিষয়ই নয়! এসেই শিশুপুত্রকে কুরবানি করার স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করলেন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম। যে মা তাঁর সন্তানকে ৭ বছর বিজন নির্বাসনে বুকের মধ্যে আঁকড়ে রেখে বড়ো করেছেন, সেই মায়ের সামনেই সে ছেলেকে জবেহ করার প্রস্তাবনার প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? আল্লাহর কালাম না হলে বিশ্বাস করা কঠিন।
পাঠক! ইবরাহিম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের ত্যাগ-কুরবানির এ জ্বলন্ত আদর্শের সামনে ইতিহাসে সত্যের জন্য যত ত্যাগ মানুষেরা দিয়েছে, সবকিছুকে একত্র করলেও যেন তু”ছ মনে হবে। এটা বোঝার জন্য ইবরাহিম আলাইহিস সালামের অশ্রæসিক্ত ও হৃদয়ক্ষরা সে মোনাজাত, এর প্রতিটি শব্দ চার হাজার বছর পর আগমনকারী ইসমাইলের সন্তান মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ওপর নাজিল হওয়া কিতাবে উদ্ধৃত হয়েছে :
‘হাজেরা ও দুগ্ধপোষ্য তার শিশু ইসমাইলকে রেখে একটু দূরে আড়াল হয়ে যাবার পর অশ্রæঝরা চোখে কাবার দিকে ফিরে বলে, “হে আমার প্রভু! আমি আমার স্ত্রী ও শিশু ইসমাইলকে তোমার কাবার ভিটার পাশে পাথুরে পাহাড়ের থলিতে, যেখানে একটি দানাও উদ্ধত হয় না; এমন অনুর্বর মরুতে তোমার নির্দেশেই রেখে যা”িছ। প্রভু! তুমি তাদেরকে সালাত কায়েমকারী রূপে গড়ো। কিছু মানুষের অন্তর তাদের প্রতি দয়ার্দ্র করে দাও। ফল-ফলাদি হতে তাঁদের রিজিক দাও, যাতে তারা তোমার শোকরগুজার হতে পারে”।’ [সূরা ইবরাহিম : ৩৭]
ফিরে যাই ইবরাহিম আলাইহিস সালামের প্রস্তাবের দিকে। পিতার প্রস্তাবনার জবাবে সাত বছরের শিশু ইসমাইল যে জবাব দেন, আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং কুরআনে তা উদ্ধৃত করছেন-
‘হে আমার আব্বাজান! (আপনি উলুল আমর রাসূল) আল্লাহ আপনাকে স্বপ্নে যে ওহি করেছেন, সে মতে আমার গলায় ছুরি চালিয়ে দিন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে সবরকারীদের মধ্যে পাবেন।’ [সূরা আস-সাফফাত : ১০২]
প্রিয় পাঠক! কুরবানির ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত ঘটনাই এতক্ষণ আলোচনা করেছি। এখন মূল ঘটনা ও রহস্য এবং হাকিকত ঘটনার নির্দেশদাতা মহান আল্লাহর থেকে শুনে নিই- ‘পিতা জবেহ করার জন্য ধারালো কৃপান হাতে আর পুত্র মিনা কুরবানি গাহে কাত হয়ে শুয়ে গেল মাটিতে। গলদেশে তরবারি চলছে ইসমাইলের কিš‘ পিতা ইবরাহিমের অতি ধারালো তরবারি এত ভোঁতা হয়ে গেল যে, ইসমাইলের পশমও কাটছে না। আল্লাহর আওয়াজ এলো, “হে ইবরাহিম! থেমে যাও। স্বপ্নে যে কুরবানির নির্দেশ দিয়েছিলাম, তা সুসম্পন্ন হয়ে গেছে। তোমরা উভয়েই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছ। আমি মুহসিন বান্দাদের এইভাবে পুরস্কার দিয়ে থাকি। তোমাদের উভয়ের জন্য এটা আমার পরীক্ষামাত্র”।’ [সূরা আস-সাফফাত : ১০৩-১০৬]
মিনার কুরবানির ময়দানে সাত বছরের শিশু পুত্র ৮৭ বছর বয়স্ক আল্লাহর রাহে নিবেদিত পিতার তরবারির নিচে শুইয়ে যাওয়ার দৃশ্য পৃথিবীর বিগত ও আগত ইতিহাসে দেখেনি, দেখবেও না। মাতার বুকের ধনকে জবেহ করার প্রস্তাবে কোনো প্রতিবাদ ও বিরোধিতা না করা কত বড়ো কুরবানি, যা কোনো মায়ের ইতিহাসে দৃষ্টান্ত দিতে চাইলে দ্বিতীয় নজির খুঁজে পাওয়া সুকঠিন। আর পিতা ও পুত্রকে আল্লাহ নিজে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মুহসিন বান্দা বলে ঘোষণা দিয়েছেন,
‘ইবরাহিমের ওপর আমার সালাম।’ [সূরা আস-সাফফাত : ১০৯]
তাঁদের এ ত্যাগের স্মৃতিকে ধরে রাখতে আল্লাহ মানবতার জন্য ত্যাগ-কুরবানির মহান ঈদ পালনের বিধান করেছেন,
‘আল্লাহ বলেন, “বিরাট কুরবানির বিনিময়ে ইসমাইলকে আমি বাঁচালাম ও পরবর্তী কিয়ামত পর্যন্ত মানবতার জন্য এটিকে কুরবানির ঈদ হিসেবে রেখে দিলাম”।’ [সূরা আস-সাফফাত : ১০৭-১০৮]
ইসমাইলের ¯’লে সেদিন জান্নাতের এক দুম্বা জবেহ করা হয়েছিল। তখন থেকে ইসমাইলের কুরবানির ¯’লে কোটি কোটি প্রাণী জবাই হয়ে আসছে এবং হতে থাকবে কিয়ামত অবধি। তাফসিরবিদগণ এটিকে বলেছেন, । ইসমাইলের জানের ফিদিইয়া বা বিনিময়। আর এক ইসমাইলের খুনের বা কুরবানির ¯’ালে অগণিত হাজার লাখো জীবন কুরবান হ”েছ ও হবে অনন্তকাল ধরে। যাকে আল্লাহ বলেন, ‘জবহে আজিম’ । ‘যাকে রেখে দিলাম আগামী প্রজন্মের জন্য স্মারক হিসেবে।’
ইসমাইল আলাইহিস সালামের ¯’লে জবাই হলো ‘দুম্বা’। ‘ইসমাইলকে শুইয়ে দিয়ে ছুরি চালাল। আল্লাহ বলেন, ‘কুরবানি করার এ সাহসই কুরবানি।’ আসলে এটি ছিল ‘পরীক্ষা’ মাত্র।
‘এটি তোমাদের জন্য আল্লাহর পরীক্ষা।’ [সূরা আস-সাফফাত : ১০৬)
কুরবানি আমাদের কী শেখায়?
১. গৃহপালিত ছয় শ্রেণির পশু দিয়ে ১০ জিলহজ ও পরের দুই দিনে হলেও আল্লাহর সš‘ষ্টির জন্য খুন প্রবাহিত করা। এটি নিছক একটি পশু জবাই করা নয় বা তার গোশত খাওয়া হয়। সকল নবীর শরিয়তে যুদ্ধলব্ধ সম্পদ ভোগ করার হুকুম ছিল না, সেগুলো আগুনে পুড়িয়ে ফেলতে হতো। কিš‘ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উম্মতের জন্য গনিমত হালাল করা হয়েছে। হাবিলের কুরবানি ছিল কিš‘ গোশত খাওয়ার আদেশ ছিল না। আল্লাহর কাছে কবুল হলে কিছু এসে সেটিকে পুড়িয়ে ফেলত। উম্মতে মুহাম্মাদিকে কুরবানির পশু নিজে খেতে ও দরিদ্র মানুষকে বণ্টন করতে বলা হয়েছে,
‘সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান অব¯’ায় সেগুলির ওপর আল্লাহর নাম উ”চারণ করো। যখন সেগুলি কাত হয়ে পড়ে যায়, তখন তা থেকে খাও। যে অভাবী মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং যে অভাবী চেয়ে বেড়ায়; তাদেরকে খেতে দাও। এভাবেই আমি ওগুলিকে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছি, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ [সূরা হজ : ৩৬]
২. এক উট বা গরুতে সাতজন কুরবানি করতে পারবে। আর ছাগল-দুম্বা একজন।
জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হতে বর্ণনা করেন,
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, আমরা যেন উটের ক্ষেত্রে এবং গরুতে সাতজন শরিক হয়ে যাই।’ [সহিহ মুসলিম : ১২১৮]
৩. খালেস ও নিষ্ঠাবান হয়ে শুধু আল্লাহর সš‘ষ্টির জন্য কুরবানি হবে। আল্লাহ মুত্তাকিদের ত্যাগ গ্রহণ করেন,
‘আল্লাহর কাছে তোমাদের কুরবানির গোশত রক্ত পৌঁছায় না, তাঁর কাছে তোমাদের তাকওয়াটুকু পৌঁছায়।’ [সূরা হজ : ৩৭]
‘আল্লাহ তোমাদের চেহারা-সুরত ও তোমাদের রং দেখেন না: বরং তিনি দেখেন তোমাদের নিয়ত, তোমাদের কলব।’
৪. কুরবানির পশুর জবাই করার সময় আল্লাহর নাম উ”চারণ ফরজ করা হয়েছে।
‘তাদের আল্লাহর নাম উ”চারণ করে খুন প্রবাহিত করো।’ [সূরা হজ : ৩৬]
আল্লাহ ছাড়া নবীর নামে, পীর-পুরোহিতের নাম আল্লাহর নামের সাথে যুক্ত করে উ”চারণ করলেও সমস্ত কুরবানি হারাম হয়ে যাবে নিঃসন্দেহে। সে কুরবানির পশুর গোশত খাওয়া শূকরের গোশত খাওয়ার মতো।
৫. রাসূলের পদ্ধতিতে ও সম্ভব হলে নিজ হাতে বা নিজ উপ¯ি’তিতে কুরবানি করতে হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তরবারি হাতে পড়তেন,
[সূরা হজ : ৩৬ নং আয়াতের ব্যাখ্যা তাফহীমুল কুরআনের অর্থসহ।]
৬. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম স্বীয় কন্যা ফাতেমাকে বলেন, ‘মা! কুরবানির পশু জবাইয়ের সময় উপ¯ি’ত থেকো। তার রক্ত প্রবাহিত হওয়া লক্ষ করো। উপলব্ধি করো আল্লাহর জন্য জীবন দেওয়ার মর্ম। গাফেলের কুরবানি আল্লাহ কবুল করেন না।’
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, অর্থাৎ, ‘মা! আরও জানো, কুরবানির পশুর প্রবাহিত রক্তের প্রতিটি ফোঁটা তোমার জীবন থেকে গুনাহ মিটিয়ে দেবে। আনন্দের সাথে কুরবানি করো।’
৭. সাহেবে নেসাব অর্থাৎ সামর্থ্য আছে অথচ কুরবানি করে না, এমন ব্যক্তি নবীজির উম্মত নয়। ঈদের জামায়াতে যাওয়ার কোনো অধিকার তার নেই। [ইবনে মাজাহ : ৩১২৩]
৮. নারী-পুরুষ কেউই কুরবানির দিনসমূহে রোজা রাখবে না, আল্লাহর মেজবানের গোশত খাবে। অন্য প্রাণী জবাইকে কোনো কোনো ফকিহ মাকরুহ বলেছেন। সর্বদা তাকবিরে তাশরিক বলতে হবে ৯ জিলহজের ফজর হতে ১৩ তারিখ আসর সালাত পর্যন্ত। [তিরমিজি]
৯. রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আলী রাদিয়াল্লাহু আনহুকে বলেছিলেন, ‘আমি যেদিন থাকব না, সম্ভব হলে আমার পক্ষে কুরবানি করবে।’ ফকিহগণের অভিমত হলো-অসিয়তের কুরবানি সদকা করা উচিত। কিš‘ অসিয়ত না হয়ে নসিহত হলে অসুবিধা নেই। আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,
‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে তাঁর জন্য কুরবানি দিতে বলেছেন। এই দুটি কুরবানির জন্য দুম্বার মধ্যে একটি রাসূলের জন্য অপরটি আমার পক্ষ হতে।’ [মিশকাতুল মাসাবীহ : ১৪৬২, আবু দাউদ]
আজ অমানবিকতা, অসভ্যতা, পশুত্ব মনুষ্যত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত হ”েছ প্রবলভাবে। পৃথিবীর প্রতিটি জনপদে চলছে অত্যাচার, জুলুম, ব্যভিচার, অনাচার ও স্বৈরাচারের সীমাহীন ও অপ্রতিরোধ্য ভয়াল অন্তর; অসহায় মজলুম মানবতার আহাজারি, চিৎকার ও মর্মš‘দ ক্রন্দন। মানব বিপর্যয় চলছে আজ গাজায়, কাশ্মীরে, আরাকানে ও সিরিয়ার পুণ্যভ‚মিতে। শত কোটি মুসলমান ও প্রায় অর্ধশত মুসলিম দেশ ও বিপুল অর্থবৃত্তের মালিকদের নীরবতা, দেখেও না দেখা যেন হাজার হাজার নারী-শিশুর শাহাদাতের বেদনার চেয়েও বেশি মর্মš‘দ ও হৃদয়বিদারক। সময়ের দাবি হ”েছ, তাওহিদবাদীদের ঐক্য, সম্মিলিত প্রচেষ্টা, নিজেদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও দেশীয় স্বার্থের ওপর মানবতাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। প্রয়োজন জালেমদের নির্বিচারে বোমাবাজি, খাদ্য, ওষুধ, পানিসহ যাবতীয় জীবন উপকরণ বন্ধ রাখা, রাফা সীমান্তের অবরোধ ভেঙেগুঁড়িয়ে দেওয়া। আল্লাহর অভিশপ্ত জাতি ও মানবতার শত্রæ ও তাদের শক্তিশালী পরমাণু অধিকারীদের বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনির ডাকে কামানের গোলার সামনে বুকের বসন খুলে বলা, ‘আমাদের গুলি করো, শহীদ করো।’ যাদের শাহাদাতের জজবা শাহের সৈন্যদের হাতে রাখা মারণাস্ত্রকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
আশুরার মিছিলে ১৫ হাজার নরনারী একসাথে শহীদ হয়েছিল। আজ কুরবানির শিক্ষা নিজ জীবনে গ্রহণ করার সময় পশু কুরবানি নয়, প্রত্যেকের নিজ জীবন কুরবান করার মুহূর্ত। যদি আমরা তা পারি, তবেই তাদের পশুত্বকে থামিয়ে দেওয়া যাবে। মুসলিম যুবকেরা কোমর বাঁধো, আগুয়ান হও সর্বাত্মক মহাসমরে। আল্লাহ বলেন,
‘সুতরাং (হে মুসলিমগণ!) তোমরা শয়তানের বন্ধুদের সঙ্গে যুদ্ধ করো। (স্মরণ রেখো), শয়তানের কৌশল অতি দুর্বল।’ [সূরা নিসা : ৭৬]