{{ news.section.title }}
ঋণ করে বা ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কোরবানি নিয়ে ধর্মীয় বিধানে কী বলা আছে?
ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর অন্যতম বড় ধর্মীয় উৎসব। প্রতিবছর জিলহজ মাসের ১০ তারিখ থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে মুসলমানরা পশু কোরবানি করেন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামর্থ্যবান মুসলমানরা কেউ এককভাবে, আবার কেউ ভাগে গরু, মহিষ বা উট কোরবানি দিয়ে থাকেন।
ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী কোরবানি শুধু সামাজিক উৎসব নয়; এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ও আত্মিক ইবাদত। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কোরবানির বিধান রেখেছি, যাতে তারা আল্লাহর দেওয়া চতুষ্পদ জন্তুর ওপর তাঁর নাম স্মরণ করে।” (সুরা হজ: ৩৪)
কোরবানির আসল উদ্দেশ্য পশুর আকার, দাম বা মাংসের পরিমাণ নয়; বরং আল্লাহর জন্য তাকওয়া ও আনুগত্য প্রকাশ। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আল্লাহর কাছে পৌঁছে না সেগুলোর গোশত, আর না সেগুলোর রক্ত; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।” (সুরা হজ: ৩৭)
বাংলাদেশে অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে-ঠিক কত সম্পদ থাকলে একজন মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন মুসলিম নর-নারী যদি কোরবানির দিনগুলোতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। আল কাওসারের মাসআলায় বলা হয়েছে, ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
কোরবানি ওয়াজিব কার ওপর
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, নিসাব হলো সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা, অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যবসার পণ্য, প্রয়োজনের অতিরিক্ত জমি, বাড়ি, অলংকার বা অপ্রয়োজনীয় সম্পদ। কারও কাছে এসব সম্পদ পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকলেও যদি প্রয়োজনের অতিরিক্ত একাধিক সম্পদ মিলিয়ে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্য হয়, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
কোরবানির নিসাবের ক্ষেত্রে যাকাতের মতো পুরো বছর সম্পদ থাকা শর্ত নয়। বরং কোরবানির নির্দিষ্ট দিনগুলোতে কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়। এমনকি ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের কিছু আগে কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেও তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে বলে ফিকহের কিতাবগুলোতে উল্লেখ আছে।
একই পরিবারে একাধিক ব্যক্তি যদি পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে প্রত্যেকের ওপর আলাদাভাবে কোরবানি ওয়াজিব হবে। পরিবারের একজনের কোরবানি সবার পক্ষ থেকে ওয়াজিব কোরবানি হিসেবে যথেষ্ট হবে না। তবে কেউ চাইলে অন্যের অনুমতি নিয়ে তার পক্ষ থেকে কোরবানি করতে পারেন।
সামর্থ্য থাকার পরও কোরবানি না করার বিষয়ে হাদিসে কঠোর সতর্কবাণী এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যার সামর্থ্য আছে অথচ কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছে না আসে।” (সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩১২৩)
তবে যাদের নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই, তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। দরিদ্র ব্যক্তি যদি কোরবানি না করেন, এতে তার কোনো গুনাহ হবে না। কিন্তু কোনো দরিদ্র ব্যক্তি যদি কোরবানির নিয়তে পশু কিনে ফেলেন, তাহলে সেই পশুটি কোরবানি করা তার জন্য আবশ্যক হয়ে যায়-এমন মাসআলা ফিকহের আলোচনায় পাওয়া যায়।
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির কোরবানির বিধান
অনেকের মনে প্রশ্ন থাকে-ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে কি না, অথবা ঋণ করে কোরবানি করা যাবে কি না। এ বিষয়ে ইসলামি বিধান হলো, ঋণ থাকলেই কোরবানি মাফ হয়ে যায়-বিষয়টি এমন নয়। দেখতে হবে, ঋণ পরিশোধের পর তার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে কি না।
যদি কারও জীবনযাত্রা কঠিন হয়ে পড়ে, মৌলিক প্রয়োজন মেটানোর মতো অর্থ না থাকে এবং ঋণ পরিশোধের পর নিসাব পরিমাণ সম্পদ অবশিষ্ট না থাকে, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। এমন ব্যক্তির জন্য লোকলজ্জা বা সামাজিক চাপে ঋণ করে কোরবানি করা জরুরি নয়।
তবে কারও ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পূরণ হয়েছে, কিন্তু হাতে নগদ টাকা নেই-এ অবস্থায় সে যদি পরিশোধের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঋণ করে কোরবানি করে, তাহলে তার কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। আল কাওসারের মাসআলায় বলা হয়েছে, কোরবানি ওয়াজিব এমন ব্যক্তি ঋণের টাকা দিয়ে কোরবানি করলেও ওয়াজিব আদায় হবে। তবে সুদের ভিত্তিতে ঋণ নিয়ে কোরবানি করা যাবে না।
ইসলামে সুদভিত্তিক লেনদেন হারাম। তাই কোরবানির মতো পবিত্র ইবাদত আদায়ের জন্য সুদের ঋণ নেওয়া শরিয়তসম্মত নয়। হালাল উপার্জন থেকে কোরবানি করা জরুরি। আল কাওসারের আরেক আলোচনায় বলা হয়েছে, কোরবানি সম্পূর্ণ হালাল সম্পদ থেকে হতে হবে; হারাম টাকা দিয়ে কোরবানি সহিহ নয়।
এ ক্ষেত্রে যারা ব্যবসা, জমি, বাড়ি বা অন্য সম্পদের মালিক, কিন্তু সাময়িকভাবে ব্যাংক বা কারও কাছে ঋণগ্রস্ত-তাদের বিষয় আলাদা। যদি ঋণ পরিশোধের সামর্থ্য থাকে এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকে, তাহলে তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। কিন্তু যাদের কোনো পরিশোধক্ষমতা নেই এবং ঋণই তাদের মৌলিক জীবনযাত্রাকে সংকটে ফেলেছে, তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়।
কোরবানির গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম
কোরবানির পশু হতে হবে শরিয়তসম্মত গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু। উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা দ্বারা কোরবানি করা জায়েজ। এসবের বাইরে হরিণ, বন্য গরু বা অন্য বন্য প্রাণী দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নয়। আল কাওসারের মাসআলায় এ বিষয়ে ফাতাওয়ায়ে কাযীখান ও বাদায়েউস সানায়ের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছে।
গরু, মহিষ ও উটে সর্বোচ্চ সাতজন পর্যন্ত শরিক হতে পারেন। তবে ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা একজনের পক্ষ থেকেই কোরবানি করতে হবে। ইসলামিক রিলিফের কোরবানি বিধানেও বলা হয়েছে, একটি ছাগল বা ভেড়া একজনের কোরবানির সমান, আর গরু, মহিষ বা উটের এক-সপ্তমাংশ একজনের কোরবানির অংশ হিসেবে ধরা হয়।
কোরবানির পশুর বয়সের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। উট কমপক্ষে পাঁচ বছর, গরু ও মহিষ কমপক্ষে দুই বছর, আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে এক বছর বয়সী হতে হবে। তবে ভেড়া বা দুম্বা যদি ছয় মাসের বেশি বয়সী হয় এবং দেখতে এক বছরের মতো হৃষ্টপুষ্ট মনে হয়, তাহলে তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ। কিন্তু ছাগল এক বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দিয়ে কোরবানি জায়েজ হবে না।
কোরবানির পশু সুস্থ ও দোষত্রুটিমুক্ত হওয়া জরুরি। এমন অতি দুর্বল পশু, যা জবাইয়ের স্থান পর্যন্ত হাঁটতে পারে না, স্পষ্ট খোঁড়া, প্রকাশ্য রোগগ্রস্ত, অন্ধ বা গুরুতর ত্রুটিযুক্ত পশু দিয়ে কোরবানি করা উচিত নয়। কারণ কোরবানি আল্লাহর জন্য নিবেদিত ইবাদত; তাই সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো, সুস্থ ও সুন্দর পশু নির্বাচন করা তাকওয়ার পরিচায়ক।
কোরবানির সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের নামাজের আগে পশু জবাই করলে তা কোরবানি হিসেবে আদায় হয় না। সহিহ বুখারির হাদিসে এসেছে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “যে ব্যক্তি নামাজের পর জবাই করল, সে সঠিক সময়ে জবাই করল এবং মুসলমানদের সুন্নত অনুসরণ করল।”
অনেকে প্রশ্ন করেন, পশু কোরবানি না করে সমপরিমাণ টাকা দান করলে কোরবানি আদায় হবে কি না। ইসলামি গবেষকরা বলেছেন, কোরবানির মূল আমল হলো নির্দিষ্ট দিনে আল্লাহর নামে নির্দিষ্ট পশু জবাই করা। তাই ওয়াজিব কোরবানির পরিবর্তে শুধু টাকা দান করলে ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না। তবে কোরবানির বাইরে নফল দান-সদকা করা অবশ্যই সওয়াবের কাজ।
কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া এবং দরিদ্র-অসহায়দের খাওয়ানো ইসলামের শিক্ষা। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, কোরবানির পশু জবাইয়ের পর তা থেকে নিজে খেতে এবং অভাবী ও সাহায্যপ্রার্থী মানুষকে খাওয়াতে। (সুরা হজ: ৩৬)
তবে কোরবানিতে লোক দেখানো মনোভাব থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। বড় পশু, বেশি পশু বা বেশি দামের পশু কিনে সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন কোরবানির উদ্দেশ্য নয়। কেউ যদি দরিদ্রদের উপকার, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাকওয়ার নিয়তে বেশি কোরবানি করেন, তা ভালো কাজ। কিন্তু তা যদি অহংকার বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে ইবাদতের সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যায়।
কোরবানি সামর্থ্যবান মুসলমানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব ইবাদত। যার কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদ আছে, তার উচিত যথাসময়ে কোরবানি আদায় করা। আর যার সামর্থ্য নেই, তার ওপর কোরবানি বাধ্যতামূলক নয়। তাই কোরবানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো-নিসাবের হিসাব জানা, হালাল অর্থ ব্যবহার করা, শরিয়তসম্মত পশু নির্বাচন করা, সঠিক সময়ে জবাই করা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টিকেই একমাত্র উদ্দেশ্য বানানো।