একই পশু দিয়ে কি আকিকা ও কোরবানি করা যাবে? জানুন বিস্তারিত

একই পশু দিয়ে কি আকিকা ও কোরবানি করা যাবে? জানুন বিস্তারিত
ছবির ক্যাপশান, ছবি: এআই

ঈদুল আজহা সামনে এলেই মুসলিম সমাজে কোরবানির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে-কোরবানির পশুতে সন্তানের আকিকা দেওয়া যাবে কি না। বাংলাদেশে অনেক পরিবার আছে, যারা সন্তানের জন্মের পর নির্ধারিত সময়ে আকিকা করতে পারেননি। পরে ঈদুল আজহার সময় কোরবানির পশুর সঙ্গে আকিকার অংশ দিতে চান তারা। এ বিষয়ে ইসলামি ফিকহে আলোচনা রয়েছে এবং মাজহাবভেদে কিছু মতপার্থক্যও পাওয়া যায়।

আকিকা কী

আকিকা হলো সন্তান জন্মের পর আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের একটি সুন্নত আমল। সাধারণভাবে সন্তান জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করা উত্তম। একই দিনে সন্তানের সুন্দর নাম রাখা, মাথার চুল মুণ্ডন করা এবং চুলের ওজন পরিমাণ রুপা সদকা করার কথাও হাদিসে এসেছে।

 

সামুরাহ ইবনে জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “প্রত্যেক শিশু তার আকিকার বিনিময়ে বন্ধক থাকে। তার জন্মের সপ্তম দিনে আকিকা করতে হয়, মাথার চুল ফেলতে হয় এবং নাম রাখতে হয়।” (সুনানে আবু দাউদ: ২৮৩৮)

 

আলী ইবনে আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত আছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান (রা.)-এর আকিকা একটি বকরী দিয়ে করেন এবং বলেন, “হে ফাতিমা! তার মাথা নেড়া করে দাও এবং তার চুলের ওজনের অনুরূপ রূপা দান কর।” (জামে তিরমিজি: ১৫১৯)

 

ছেলে ও মেয়ের আকিকার বিধান

ইসলামি বিধান অনুযায়ী, ছেলে সন্তানের জন্য দুটি এবং মেয়ে সন্তানের জন্য একটি পশু আকিকা করা সুন্নত। উম্মু কুরজ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “ছেলের জন্য দুটি ভেড়া এবং মেয়ের জন্য একটি ভেড়া।” সুনানে নাসায়ির বর্ণনায় এ হাদিস উল্লেখ রয়েছে।

 

তবে ছেলে সন্তানের জন্য দুটি পশু দেওয়া উত্তম হলেও একটি পশু দিলে আকিকার মূল সুন্নত আদায় হয়ে যায়-এমন মতও অনেক আলেম উল্লেখ করেছেন। ইসলামি ফিকহের আলোচনায় বলা হয়েছে, ছেলের জন্য দুটি পশু সুন্নত; তবে একটি পশু দিলেও মূল সুন্নত আদায় হবে। কারণ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসান ও হুসাইন (রা.)-এর পক্ষ থেকে একটি করে দুম্বা আকিকা করেছেন-এমন বর্ণনাও আছে।

 

আকিকা করার সময়

আকিকা সাধারণত সপ্তম দিনে করা উত্তম। তবে ওই দিন সম্ভব না হলে পরেও করা যায়। অনেক পরিবার সন্তানের জন্মের সময় আর্থিক সংকট, চিকিৎসাজনিত ব্যস্ততা বা অন্য কোনো কারণে আকিকা করতে পারেন না। পরে সামর্থ্য হলে তা আদায় করতে পারেন। আলেমরা বলেছেন, আকিকা একটি সুন্নত আমল; তাই তা নির্ধারিত সময়ে না হলে পরবর্তীতেও করা যায়।

 

কোরবানি ও আকিকার পার্থক্য

কোরবানি ও আকিকা দুটি আলাদা ইবাদত। কোরবানি ঈদুল আজহার নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আদায় করা হয়। হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের মুসলমানের ওপর কোরবানি ওয়াজিব। অন্যদিকে আকিকা সন্তানের জন্মের শুকরিয়া হিসেবে সুন্নত আমল। তাই এই দুই ইবাদতের উদ্দেশ্য আলাদা হলেও উভয়টির মধ্যেই আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে পশু জবাই করার বিষয় রয়েছে।

 

কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ রাখা যাবে কি

এখন প্রশ্ন হলো, কোরবানির গরু, মহিষ বা উটে আকিকার অংশ রাখা যাবে কি না। এ বিষয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। মালেকি, শাফেয়ি এবং ইমাম আহমদ (রহ.)-এর একটি বর্ণনা অনুযায়ী, কোরবানির পশু আকিকার জন্য যথেষ্ট হবে না। তাদের মতে, কোরবানি ও আকিকা-দুটি আলাদা উদ্দেশ্যসম্পন্ন ইবাদত; তাই একটি পশুতে দুই নিয়ত একত্র করা যাবে না।

 

তবে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোরবানির বড় পশুতে আকিকার অংশ রাখা জায়েজ। আল কাওসারের মাসআলায় বলা হয়েছে, কোরবানির গরু, মহিষ ও উটে আকিকার নিয়তে শরিক হতে পারবে। এতে কোরবানি ও আকিকা দুটোই সহিহ হবে। ছেলের জন্য দুই অংশ আর মেয়ের জন্য এক অংশ দিতে হবে। শৈশবে আকিকা করা না হলে বড় হওয়ার পরও আকিকা করা যায় এবং যার আকিকা, সে নিজে ও তার মা-বাবা আকিকার গোশত খেতে পারবেন।

 

বড় পশুতে আকিকার অংশ

আল কাওসারের দালিলিক আলোচনায় আরও বলা হয়েছে, আকিকা এক প্রকার কোরবানি। তাই যেমন একাধিক কোরবানি পৃথক পশু দ্বারা আদায় করা যায়, আবার বড় পশুতে অংশ রেখেও আদায় করা যায়, তেমনি আকিকাও পৃথক পশু দিয়ে করা যায় এবং গরু বা উটের অংশ দিয়েও করা যায়। তবে অংশটি এক সপ্তমাংশের কম হওয়া যাবে না।

 

এ কারণে বাংলাদেশের হানাফি অনুসারী অনেক আলেমের মতে, কেউ চাইলে কোরবানির গরুতে নিজের ওয়াজিব কোরবানির অংশ রাখার পাশাপাশি সন্তানের আকিকার অংশও রাখতে পারেন। যেমন, ছেলে সন্তানের জন্য দুই ভাগ এবং মেয়ে সন্তানের জন্য এক ভাগ রাখা যেতে পারে। তবে যদি সামর্থ্য থাকে, আলাদা ছাগল দিয়ে আকিকা করা উত্তম ও সুন্দর পদ্ধতি বলে অনেক আলেম উল্লেখ করেন।

 

নিয়ত সঠিক হওয়া জরুরি

এ ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নিয়ত। কোরবানির পশুতে যারা শরিক হবেন, সবার নিয়ত আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য হতে হবে। কেউ যদি শুধু গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্যে শরিক হয়, তাহলে তা অন্য শরিকদের কোরবানির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে-এ বিষয়ে ফিকহের কিতাবগুলোতে সতর্ক করা হয়েছে। আল কাওসারের মাসআলায় বলা হয়েছে, শরিক নির্বাচনে সতর্ক থাকা জরুরি।

 

আকিকার গোশত খাওয়া ও বণ্টন

আকিকার গোশত খাওয়া ও বণ্টনের ক্ষেত্রেও কোরবানির মতো সুবিধা রয়েছে। আকিকার গোশত শিশুর বাবা-মা, পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্র মানুষ সবাই খেতে পারেন। এটি রান্না করে খাওয়ানো যায়, আবার কাঁচা গোশত হিসেবেও বণ্টন করা যায়। তবে দরিদ্র, প্রতিবেশী ও আত্মীয়দের অংশ দেওয়া আকিকার সৌন্দর্য বাড়ায় এবং এতে সামাজিক সহমর্মিতাও প্রকাশ পায়।

 

আকিকার পশু কেমন হওয়া উচিত

আকিকার পশু নির্বাচনের ক্ষেত্রেও পশু সুস্থ, ত্রুটিমুক্ত ও শরিয়তসম্মত হওয়া উচিত। ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দিয়ে আকিকা করা বেশি প্রচলিত ও উত্তম। তবে হানাফি ফিকহ অনুযায়ী, বড় পশুতে অংশ দিয়েও আকিকা করা যায়। আর কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ রাখলে সেটি অবশ্যই কোরবানির উপযুক্ত পশু হতে হবে।

 

আগে কোরবানি, নাকি আকিকা

ইসলামি গবেষকদের মতে, কেউ যদি কোরবানি ওয়াজিব হওয়া সত্ত্বেও কোরবানি না দিয়ে শুধু আকিকা করেন, তাহলে তা উত্তম সিদ্ধান্ত নয়। কারণ যার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তার আগে নিজের ওয়াজিব কোরবানি আদায় করা জরুরি। এরপর সামর্থ্য থাকলে আলাদা পশু দিয়ে বা বড় পশুতে অংশ রেখে আকিকা করা যেতে পারে।

 

আকিকা সন্তানের জন্য দোয়া, শুকরিয়া ও কল্যাণ কামনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নত। আর কোরবানি হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আত্মত্যাগের মহান ইবাদত। তাই ঈদুল আজহার সময় কেউ যদি কোরবানির পশুতে আকিকার অংশ রাখতে চান, তাহলে তিনি নিজ মাজহাবের নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিয়ে তা করতে পারেন। বাংলাদেশের প্রচলিত হানাফি মত অনুযায়ী, কোরবানির গরু, মহিষ বা উটে আকিকার অংশ রাখা জায়েজ; তবে অংশের পরিমাণ ও নিয়ত অবশ্যই সঠিক হতে হবে।

 

আল্লাহ তাআলা আমাদের ইবাদতগুলো খাঁটি নিয়তে আদায় করার তাওফিক দান করুন এবং কোরবানি ও আকিকার আমল কবুল করুন। আমিন।


সম্পর্কিত নিউজ