{{ news.section.title }}
দুরুদে ইব্রাহিম - নবীজির (সা.) শেখানো আমল
দুরুদে ইবরাহিম হলো মহানবী (সা.)-এর প্রতি আল্লাহ তা'আলার রহমত ও বরকত কামনা করার শ্রেষ্ঠ দোয়া। এটি আমাদের দৈনন্দিন নামাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং রাসূলের (সা.) প্রতি ভালোবাসা ও অশেষ সওয়াব অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।
দুরুদে ইবরাহিম হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ও সবচেয়ে বরকতময় দুরুদ, যা স্বয়ং নবীজি হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর সাহাবিদের শিখিয়েছেন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর এই দুরুদ পাঠ করা ওয়াজিব বা সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে মুমিনদের প্রতি দুরুদ পাঠের নির্দেশ দিয়েছেন।
দুরুদে ইবরাহিম (আরবি, উচ্চারণ ও অর্থ)
আরবি:
اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِإبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ. اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ
বাংলা উচ্চারণ:
"আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা সাল্লাইতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ। আল্লাহুম্মা বারিক আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ, কামা বারকতা আলা ইব্রাহিমা ওয়া আলা আলি ইব্রাহিম, ইন্নাকা হামিদুম মাজিদ।"
বাংলা অর্থ:
"হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করো, যেমন তুমি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর রহমত বর্ষণ করেছিলে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত। হে আল্লাহ! তুমি মুহাম্মাদ (সা.) এবং তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করো, যেমন তুমি ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর বংশধরদের ওপর বরকত নাজিল করেছিলে। নিশ্চয়ই তুমি প্রশংসিত ও সম্মানিত।"
নবীজির শেখানো এই আমলের বিশেষ ফজিলত ও উপকারিতা
নিয়মিত দুরুদে ইবরাহিম পাঠ করার মাধ্যমে একজন মুমিন ইহকাল ও পরকালে অসংখ্য নেয়ামত লাভ করতে পারেন:
দশটি রহমত ও গুনাহ মাফ: একবার দুরুদ পাঠ করলে আল্লাহর পক্ষ থেকে ১০টি রহমত নাজিল হয়, ১০টি গুনাহ মাফ হয় এবং ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।
দোয়া কবুল হওয়া: যেকোনো দোয়া করার আগে ও পরে দুরুদ শরীফ পাঠ করলে সেই দোয়া আল্লাহর দরবারে দ্রুত কবুল হয়।
নবীজির (সা.) নিকটবর্তী হওয়া: কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি নবীজি (সা.)-এর সবচেয়ে নিকটবর্তী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করবে, যে বেশি দুরুদ পড়বে।
দুশ্চিন্তা ও অভাব দূর হওয়া: নিয়মিত দুরুদের আমল মানুষের মনের অস্থিরতা, দুনিয়াবি দুশ্চিন্তা এবং পারিবারিক ও অর্থনৈতিক অভাব-অনটন দূর করে।
দুরুদ পাঠের সর্বোত্তম সময়সমূহ
নামাজের বাইরেও যেকোনো পবিত্র অবস্থায় দুরুদ পাঠ করা যায়, তবে কিছু বিশেষ সময়ে এর গুরুত্ব আরও বৃদ্ধি পায়:
পবিত্র জুমআর দিন: শুক্রবার দিন ও রাতে বেশি বেশি দুরুদ পাঠের বিশেষ নির্দেশনা রয়েছে, কারণ এই দুরুদ নবীজি (সা.)-এর দরবারে সরাসরি পেশ করা হয়।
আজানের পর: আজান শেষ হওয়ার পর দুরুদ শরীফ পড়ে আজানের দোয়া পাঠ করা সুন্নাত।
সকাল ও সন্ধ্যায়: প্রতিদিন সকালে ও সন্ধ্যায় ১০ বার করে দুরুদ পাঠ করলে কেয়ামতের দিন নবীজি (সা.)-এর শাফায়াত বা সুপারিশ লাভ নিশ্চিত হয়।
হাদিসের আলোকে দুরুদে ইবরাহিমের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত
দুরুদে ইবরাহিম হলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শেখানো সবচেয়ে বিশুদ্ধ ও নির্ভরযোগ্য দুরুদ, যার শ্রেষ্ঠত্ব ও গুরুত্ব অসংখ্য সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। সাহাবিরা যখন নবীজিকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে কীভাবে তাঁর ওপর দুরুদ পাঠ করতে হবে, তখন তিনি স্বয়ং এই বাক্যগুলো তাদের শিক্ষা দেন।
নিচে হাদিসের আলোকে দুরুদে ইবরাহিমের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতগুলো তুলে ধরা হলো:
১. সরাসরি নবীজির (সা.) শেখানো আমল
সাহাবি হযরত কা’ব বিন উজরা (রা.) বর্ণনা করেন, "আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসুল! আপনার ওপর তো সালাম পাঠানোর নিয়ম আমরা জেনেছি, কিন্তু আপনার ওপর দুরুদ পাঠাব কীভাবে? তখন নবীজি (সা.) বললেন, তোমরা বলো: 'আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিওঁ ওয়া আলা আলি মুহাম্মাদ...'" (উৎস: সহিহ বুখারি, হাদিস নং: ৬৩৫৭ ও সুনানে নাসায়ি, হাদিস নং: ১২৮৭)
২. একবারে ৩০টি পুরস্কার লাভ
হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দুরুদ পাঠ করবে, আল্লাহ তাআলা তার ওপর ১০টি রহমত নাজিল করবেন, তার আমলনামা থেকে ১০টি গুনাহ মুছে দেবেন এবং আল্লাহর দরবারে তার ১০টি মর্যাদা (শ্রেণি) বৃদ্ধি করবেন।" (উৎস: সুনান আন-নাসায়ি, হাদিস: ১২৯৭; সহিহ ইবনে হিব্বান: ৯০৮)
৩. দোয়া কবুল হওয়ার প্রধান শর্ত
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেছেন: "নিশ্চয়ই মানুষের দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে, তার কোনো কিছুই ওপরে ওঠে না (কবুল হয় না), যতক্ষণ না তুমি তোমার নবী (সা.)-এর ওপর দুরুদ পাঠ করো।" (উৎস: সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪৮৬)
৪. কেয়ামতের দিন নবীজির সবচেয়ে কাছে থাকার সৌভাগ্য
রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন: "কেয়ামতের দিন সেই ব্যক্তি আমার সবচেয়ে নিকটবর্তী এবং আমার শাফায়াত (সুপারিশ) পাওয়ার সবচেয়ে যোগ্য হবে, যে আমার ওপর সবচেয়ে বেশি দুরুদ পাঠ করবে।" (উৎস: সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৪৮৪)
৫. সব দুশ্চিন্তা ও পাপ মুক্তির উপায়
বিখ্যাত সাহাবি হযরত উবাই ইবনে কাব (রা.) নবীজিকে বললেন, "হে আল্লাহর রাসুল! আমি আমার দোয়ার সম্পূর্ণ অংশই আপনার দুরুদের জন্য নির্ধারণ করতে চাই।" তখন নবীজি (সা.) বললেন, "তাহলে তা তোমার দুনিয়া ও আখিরাতের সব দুশ্চিন্তা দূর করার জন্য যথেষ্ট হবে এবং তোমার সব গুনাহ ক্ষমা করা হবে।" (উৎস: সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৭)
৬. কৃপণতার হাত থেকে মুক্তি
নবীজি (সা.) সেই ব্যক্তিকে চরম কৃপণ বলে আখ্যায়িত করেছেন, যে তাঁর নাম শোনার পরও দুরুদ পড়ে না। হাদিসে এসেছে: "সেই ব্যক্তিই প্রকৃত কৃপণ, যার সামনে আমার নাম নেওয়া হলো অথচ সে আমার ওপর দুরুদ পাঠ করল না।" (উৎস: সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ৩৫৪৬)