সূরা ইয়াসিনকে কুরআনের হৃদয় বলা হয় কেন?

সূরা ইয়াসিনকে কুরআনের হৃদয় বলা হয় কেন?
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

মানুষের হেদায়াত, ঈমানের দৃঢ়তা এবং পরকালের প্রস্তুতির আলোচনায় সুরা ইয়াসিনের গুরুত্ব মুসলিম সমাজে বিশেষভাবে আলোচিত। পবিত্র কোরআনের ৩৬তম সুরা এটি; সুরাটি মক্কায় অবতীর্ণ এবং এতে ৮৩টি আয়াত রয়েছে।

বাংলা ইসলামী সাহিত্যে এবং বিভিন্ন বর্ণনায় সুরা ইয়াসিনকে “কোরআনের হৃদয়” বলা হয়েছে, আর সেই কারণেই সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এই সুরার তেলাওয়াত, অধ্যয়ন ও আমলের প্রতি বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়। তোমার দেওয়া দুইটি লেখাতেও সুরাটির ফজিলত, বিষয়বস্তু, আখিরাতের প্রস্তুতি, গোনাহ মাফ, মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে তেলাওয়াত এবং মুমিনের জীবনে এর প্রভাব-এসব দিক জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে।

 

সুরা ইয়াসিনের মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে তাওহিদ, রিসালাত এবং আখিরাত। শুরুতেই কোরআনের শপথ করে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর রিসালাতের সত্যতা ঘোষণা করা হয়েছে, আর এরপর মানুষকে সতর্ক করা হয়েছে গাফলত, কুফর, অবিশ্বাস ও কূটতর্কের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে। কোরআনের ব্যাখ্যাকারীরা বলেন, এই সুরায় মক্কার মুশরিকদের আপত্তি, নবীদের অস্বীকার, পুনরুত্থান নিয়ে সন্দেহ এবং আল্লাহর সৃষ্টিনিয়ামতকে অস্বীকারকারীদের জবাব অত্যন্ত শক্তিশালী ভাষায় এসেছে। সুরার বড় একটি অংশে বিশ্বজগতের সুশৃঙ্খল সৃষ্টি, দিন-রাতের আবর্তন, সূর্য-চন্দ্রের নির্ধারিত গতিপথ, মৃত জমিনে বৃষ্টি নেমে জীবনের পুনর্জাগরণ-এসবকে আল্লাহর একত্বের নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

তোমার দেওয়া প্রথম লেখায় যে বিষয়টি খুব সুন্দরভাবে এসেছে, তা হলো-সুরা ইয়াসিন কেবল তেলাওয়াতের ফজিলতের সুরা নয়; বরং এটি একটি গভীর বার্তার সুরা। এতে এমন এক জনপদের দৃষ্টান্ত এসেছে, যেখানে একের পর এক রাসুলকে অস্বীকার করা হয়। পরে এক ঈমানদার ব্যক্তি দৌড়ে এসে নিজের সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন। মুফাসসিরদের আলোচনায় যাঁর নাম হাবিবে নাজ্জার হিসেবে উল্লেখ করা হয়, তিনি নিজের সম্প্রদায়ের কল্যাণ চেয়েছিলেন জীবিত অবস্থায়ও, মৃত্যুর পরও। জান্নাতে প্রবেশের পরও তাঁর আকাঙ্ক্ষা ছিল, যদি তাঁর জাতি জানত-আল্লাহ তাঁকে কীভাবে ক্ষমা করেছেন ও সম্মানিত করেছেন। এই ঘটনাটি আসলে একজন সত্যিকার ঈমানদারের পরিচয় তুলে ধরে: সে নিজে হেদায়াত পেয়ে থেমে থাকে না, বরং অন্যের কল্যাণও কামনা করে।

 

সুরা ইয়াসিনের একটি বড় বিষয় হলো পুনরুত্থান। এ সুরায় বারবার মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে, মানুষ মরে গেলেই সব শেষ হয়ে যায় না; বরং মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে, হিসাব নেওয়া হবে, এবং দুনিয়ার প্রতিটি কাজ, এমনকি মানুষের রেখে যাওয়া প্রভাবও সংরক্ষিত আছে। তোমার দেওয়া লেখায় আয়াত ১২-এর অনুবাদ উদ্ধৃত হয়েছে-‘আমি মৃতকে জীবিত করি আর লিখে রাখি ওরা যা পাঠায় ও ওদের যে পায়ের চিহ্ন রেখে যায়। এক সুস্পস্ট গ্রন্থে আমি সব সংরক্ষণ করে রেখেছি।’ এ আয়াতের মর্ম হলো, মানুষের কোনো কাজই আল্লাহর জ্ঞানের বাইরে নয়। তাই সুরা ইয়াসিন মানুষকে কেবল আখিরাতের ভয় দেখায় না; বরং দায়িত্বশীল জীবনযাপনেরও শিক্ষা দেয়।

 

এই সুরায় কিয়ামতের দৃশ্যও অত্যন্ত গভীরভাবে এসেছে। শিঙায় ফুঁক দেওয়া, প্রথম ফুৎকারে সবকিছুর ধ্বংস, এরপর দ্বিতীয় ফুৎকারে পুনরুত্থান-এসব বর্ণনা মানুষকে দুনিয়ার ব্যস্ততার মধ্যেই পরকালের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তোমার দেওয়া উপাদানে উল্লেখ আছে, এমন সময়ও কিয়ামত এসে যেতে পারে যখন মানুষ বাজারে কেনাকাটা বা দুনিয়ার স্বাভাবিক কাজেই ব্যস্ত থাকবে। অর্থাৎ, আখিরাত দূরের কোনো গল্প নয়; এটি অনিবার্য বাস্তবতা। সে কারণেই সুরা ইয়াসিনের বার্তা মানুষকে গাফলত ভেঙে জাগিয়ে তোলে।

 

সুরাটির ফজিলত নিয়ে দ্বিতীয় লেখায় যে হাদিসগুলো এসেছে, সেগুলো মুসলিম সমাজে বহুল পরিচিত। হজরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘প্রত্যেক বস্তুরই একটা হৃদয় থাকে আর কুরআনের হৃদয় হল সুরা ইয়াসিন। যে ব্যক্তি সুরা ইয়াসিন একবার পড়বে, মহান আল্লাহ তাকে দশবার পুরো কুরআন পড়ার সওয়াব দান করবেন।’ (তিরমিজি)

 

রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আরও বলেছেন, ‘সুরা ইয়াসিন কুরআনের রূহ বা হৃৎপিণ্ড। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের কল্যাণ লাভের জন্য সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে তার জন্য রয়েছে মাগফিরাত বা ক্ষমা।

 

এই বর্ণনাগুলো মুসলমানদের মধ্যে সুরা ইয়াসিনের গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে বহু যুগ ধরে। তবে শুধু ফজিলতের আশায় তেলাওয়াত করলেই যথেষ্ট নয়-তোমার দেওয়া দ্বিতীয় লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, সুরা ইয়াসিন বুঝে পড়ার ওপর জোর দেওয়া। এতে মানুষকে পরকালের প্রস্তুতির দিকে আহ্বান করা হয়, আর পরকালভীতি মানুষকে সৎকর্মে উদ্বুদ্ধ করে এবং অবৈধ বাসনা ও হারাম কাজ থেকে বিরত রাখে। এই পর্যবেক্ষণটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ কোরআনের প্রকৃত প্রভাব তখনই জীবনে পড়ে, যখন তা কেবল মুখে নয়, অন্তরেও পৌঁছে।

 

গোনাহ মাফের প্রসঙ্গে দ্বিতীয় লেখায় যে অংশ এসেছে, সেটিও মুসলিমদের কাছে অত্যন্ত আবেগঘন ও গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে এসেছে-- হজরত ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেছেন রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করবে আল্লাহ তাআলা তার বিগত জীবনের সব গোনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (বায়হাকি,আবু দাউদ)- হজরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে রাতে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করবে, আল্লাহ তার ওই রাতের সব গোনাহ মাফ করে দেবেন।’ (দারেমি)

 

এখানে “আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে” কথাটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামি আমলের মূল ভিত্তি হচ্ছে নিয়ত। সুরা ইয়াসিনের তেলাওয়াত যদি কেবল অভ্যাস বা আনুষ্ঠানিকতা হয়ে যায়, তবে এর প্রকৃত উদ্দেশ্য পূর্ণ হয় না। কিন্তু যদি তা হয় আল্লাহর সন্তুষ্টি, আত্মশুদ্ধি, তওবা এবং পরকালের চিন্তা থেকে-তবে এই তেলাওয়াত মানুষের জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে।

 

অভাব-অনটন ও প্রয়োজন পূরণের আলোচনাতেও সুরা ইয়াসিনকে ঘিরে মুসলিম সমাজে দীর্ঘদিনের আস্থা রয়েছে। দ্বিতীয় লেখায় এসেছে, হজরত আবদুল্লাহ ইবনে জুবায়ের রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যদি কোনো ব্যক্তি অভাব-অনটনের সময় সুরা ইয়াসিন পাঠ করে তাহলে তার অভাব দূর হয়, সংসারে শান্তি আসে এবং রিজিকে বরকত হয় ‘ (মাজহারি)- হজরত আতা বিন আবি রাবাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন আমি শুনেছি যে, রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি দিনের বেলায় সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করবে, তার সব হাজত (প্রয়োজন) পূর্ণ করা হবে।’ (দারেমি)-হজরত ইয়াহইয়া ইবনে কাসির রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, ‘যে ব্যক্তি সকালে সুরা ইয়াসিন পাঠ করবে সে সন্ধ্যা পর্যন্ত সুখে-স্বস্তিতে থাকবে। যে সন্ধ্যায় পাঠ করবে সে সকাল পর্যন্ত শান্তিতে থাকবে।’ (মাজহারি)

 

এ ধরনের বর্ণনা মুসলিমদের মধ্যে সুরা ইয়াসিনকে দৈনন্দিন আমলের অংশ করে তুলেছে। তবে এর পাশাপাশি এটাও মনে রাখা জরুরি যে, কোরআনের প্রকৃত বরকত শুধু পাঠে নয়; তার নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন গঠনে। আল্লাহর একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস, নবী (সা.)-এর আনুগত্য, কিয়ামতের প্রস্তুতি, সৎকর্ম, অন্যকে হেদায়াতের আহ্বান-এসবই সুরা ইয়াসিনের মূল শিক্ষা।

 

মৃত্যুর মুহূর্তে সুরা ইয়াসিন পাঠের প্রসঙ্গও বহু মুসলিম পরিবারে পরিচিত একটি আমল। দ্বিতীয় লেখায় এসেছে, মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হওয়ার প্রসঙ্গে তাফসিরে জালালাইনের হাশিয়ায় একটি বর্ণনা উদ্ধৃত হয়েছে এবং এরপর হাদিসে পাকে এসেছে-- হজরত আবু যর রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে শুনেছি, তিনি বলেছেন, ‘মৃত্যুশয্যা ব্যক্তির কাছে সুরা ইয়াসিন পাঠ করলে তার মৃত্যু যন্ত্রণা সহজ হয়ে যায়। (মাজহারি)- হযরত ইবনে ইয়াসার রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, ‘এটা (সুরা ইয়াসিন) তোমাদের মুমূর্ষু (মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে) ব্যক্তিদের কাছে পাঠ কর।’ (আবু দাউদ, নাসাঈ, ইবনে মাজাহ, মুসনাদে আহমাদ)

 

এই কারণে অনেক মুসলমান মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পাশে সুরা ইয়াসিন তেলাওয়াত করেন। এর মধ্যে শুধু ফজিলতের বিশ্বাসই নয়, বরং মৃত্যুর প্রান্তে থাকা মানুষকে কোরআনের সুর, আখিরাতের স্মরণ এবং আল্লাহর রহমতের বার্তা পৌঁছে দেওয়ারও একটি আধ্যাত্মিক দিক রয়েছে।

 

সুরা ইয়াসিনের নাম নিয়েও দ্বিতীয় লেখায় কয়েকটি অতিরিক্ত তথ্য এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে, সুরাটি ‘সুরা ইয়াসিন’ নামে প্রসিদ্ধ হলেও এর আরও কিছু নাম রয়েছে-‘সুরা আজিমা’, ‘সুরা মুদাফিয়া’, ‘সুরা কাজিয়া’; এবং কিছু আসমানি সূত্রে এটিকে ‘মুয়িম্মাহ’ হিসেবেও উল্লেখ করা হয়েছে। এসব নামের আলোচনা মূলত ইসলামী ব্যাখ্যাগ্রন্থ ও বর্ণনাভিত্তিক ঐতিহ্যের অংশ।


সম্পর্কিত নিউজ