কুরবানী : ইতিহাস, গুরুত্ব ও শিক্ষা

কুরবানী : ইতিহাস, গুরুত্ব ও শিক্ষা
ছবির ক্যাপশান, জাগরণ ছবি

কুরবানী ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান, বিশেষ ইবাদত এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের অন্যতম মাধ্যম। ‘কোরবান’ আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ হলো কাছে যাওয়া বা নৈকট্য অর্জন করা। ইসলামি ফিকহের পরিভাষায় কোরবানী হলো-জ্ঞানসম্পন্ন, প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম ১০ জিলহজ সকাল থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত পশু আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবাই করা। যে ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, অর্থাৎ সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা অথবা এর যেকোনো একটির মূল্যের সমপরিমাণ নগদ অর্থ বা ব্যবসার পণ্যের মালিক, তার জন্য কোরবানী করা ওয়াজিব।

কুরবানীর বিধান ইসলামে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং এটি আল্লাহর নির্দেশের সামনে আত্মসমর্পণ, তাওহীদ, তাকওয়া, ইখলাস, বিনয় এবং আত্মত্যাগের এক গভীর শিক্ষা বহন করে। হযরত আদম আলাইহিস সালামের যুগ থেকে কুরবানীর ধারা চলে আসছে। তবে সব নবীর শরীয়তে এর পদ্ধতি এক ছিল না। ইসলামী শরীয়তে কুরবানীর যে পদ্ধতি নির্দেশিত হয়েছে, তার মূল সূত্র ‘মিল্লাতে ইবরাহীমী’তে বিদ্যমান ছিল। এ কারণেই কুরবানীকে ‘সুন্নতে ইবরাহীমী’ বলা হয়।

 

মহান আল্লাহ বলেন, ‘প্রত্যেক উম্মতের জন্য আমি কোরবানির বিধান রেখেছিলাম, যাতে তারা উক্ত পশু জবাই করার সময় মহান আল্লাহর নাম স্মরণ করে এ জন্য যে, তিনি চতুষ্পদ জন্তু থেকে তাদের জন্য রিজিক নির্ধারণ করেছেন।’ (সুরা হজ ৩৪)

 

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা নাসাফি (রহ.) বলেন,

আদম (আ.) থেকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পর্যন্ত প্রত্যেক জাতিকে মহান আল্লাহ তার নৈকট্য লাভের জন্য কোরবানির বিধান দিয়েছেন। (তাফসিরে নাসাফি ৩/৭৯)

 

মানব ইতিহাসের শুরুতেই কোরবানীর নিদর্শন পাওয়া যায়। হজরত আদম (আ.)-এর দুই সন্তান সর্বপ্রথম কোরবানী করেন। হাবিল ভেড়া, দুম্বা ইত্যাদি পশু পালন করতেন। তিনি একটি উৎকৃষ্ট দুম্বা কোরবানী করলেন। অন্যদিকে কাবিল কৃষিকাজ করতেন। তিনি কিছু শস্য, গম ইত্যাদি কোরবানীর জন্য উপস্থিত করলেন। অতঃপর আকাশ থেকে অগ্নিশিখা এসে হাবিলের কোরবানী ভস্মীভূত করে দিল এবং কাবিলের কোরবানী যেমন ছিল তেমনই পড়ে রইল। এভাবেই হাবিলের কোরবানী কবুল হয়।

 

কোরবানীর ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত ও শিক্ষণীয় ঘটনা হলো হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও তাঁর পুত্র হযরত ইসমাঈল আলাইহিস সালামের ঘটনা। মুসলিম উম্মাহর জাতির পিতা হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর পুত্র হযরত ইসমাইল (আ.)-কে কোরবানী করার মাধ্যমে ইতিহাসে আত্মসমর্পণ, আনুগত্য ও ত্যাগের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। ইসলামে হজরত ইসমাইল (আ.)-এর স্মরণে কোরবানী করা হয়। কেননা রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘কোরবানি হলো তোমাদের পিতা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সুন্নত।’

 

ইবরাহীম (আ.)-এর দোয়া ও সন্তানের আকাঙ্ক্ষা

হযরত ইবরাহীম আলাইহিস সালামের কুরবানীর ঘটনা কুরআন মাজীদে উল্লেখিত হয়েছে। এ ঘটনার সঙ্গে জুড়ে আছে এক অবিস্মরণীয় পরীক্ষা ও ঈমানের সর্বোচ্চ প্রকাশ। বহুদিন ধরে ইবরাহীম আ.-এর কোনো সন্তান হচ্ছিল না। ধীরে ধীরে তাঁর ও তাঁর স্ত্রীর সন্তান জন্মের স্বাভাবিক বয়সও পার হয়ে যায়। জীবনের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও তিনি আল্লাহ তাআলার কাছে নেক সন্তান প্রার্থনা করতে থাকেন-

رَبِّ هَبْ لِيْ مِنَ الصّٰلِحِيْنَ.

হে আমার রব! আমাকে নেক সন্তান দান করুন। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০০

 

দিন যত যাচ্ছিল, ইবরাহীম আ.-এর হৃদয়ে সন্তানের আকাঙ্ক্ষা ততই তীব্র হচ্ছিল এবং আল্লাহর দরবারে তাঁর দোয়া ততই গভীর হচ্ছিল। অবশেষে আল্লাহ তাঁর আকাঙ্ক্ষা পূরণ করে একজন সহনশীল পুত্রসন্তান দান করেন। এই সন্তানের নাম রাখেন ইসমাঈল।

 

একজন অশীতিপর বৃদ্ধ মানুষ সন্তানের মুখ দেখলে কতটা আনন্দিত হতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়। ইবরাহীম আ. শুধু আনন্দিতই হননি; বরং আল্লাহর শোকরে তাঁর হৃদয় ভরে যায়। তিনি শোকর আদায় করে বলেন-

الْحَمْدُ لِلهِ الَّذِيْ وَهَبَ لِيْ عَلَي الْكِبَرِ اِسْمٰعِيْلَ وَاِسْحٰقَ اِنَّ رَبِّيْ لَسَمِيْعُ الدُّعَآء.

সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে বৃদ্ধ বয়সে ইসমাঈল ও ইসহাক দান করেছেন। নিশ্চয় আমার রব দুআ শ্রবণকারী। -সূরা ইবরাহীম (১৪) : ৩৯

 

মক্কার নির্জন ভূমিতে আল্লাহর নির্দেশ পালন

হযরত ইবরাহীম আ. শামে বসবাস করতেন। একসময় আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর কাছে নির্দেশ এল, পুত্র ইসমাঈল ও তাঁর মা হা-জারকে যেন মক্কায় রেখে আসেন। সে সময় মক্কায় জনবসতি ছিল না, জীবনোপকরণের কোনো স্বাভাবিক ব্যবস্থা ছিল না। তবু আল্লাহর নির্দেশের সামনে তিনি নিজের অনুভূতিকে প্রাধান্য দেননি। আল্লাহর আদেশ মেনে তিনি তাঁদেরকে সুদূর মক্কায় রেখে যান।

 

ইসমাঈল আ. ধীরে ধীরে বড় হতে থাকেন। তিনি যত বড় হচ্ছিলেন, তাঁর প্রতি পিতার ভালোবাসা ততই গভীর হচ্ছিল। যখন তিনি চলাফেরা ও ছোটাছুটি করার বয়সে পৌঁছালেন, তখন হযরত ইবরাহীম আ. এক কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হন। তিনি স্বপ্নে দেখেন, নিজের কলিজার টুকরো সন্তানকে যবেহ করছেন। এটি যদিও স্বপ্ন ছিল; কিন্তু নবীদের স্বপ্ন ওহীর মতো হয়ে থাকে। তাই এ স্বপ্নের অর্থ ছিল, আল্লাহর পক্ষ থেকে ইবরাহীম আ.-কে একমাত্র সন্তান ইসমাঈল আ.-কে যবেহ করার আদেশ করা হয়েছে।

 

ইসমাঈল আ. ছিলেন ইবরাহীম আ.-এর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও দোয়ার ফল। তবু তাঁর কাছে আল্লাহর আদেশ ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। তিনি খুশিমনে এ আদেশ পালন করতে প্রস্তুত হয়ে গেলেন। কারণ সন্তান আল্লাহই দান করেছেন, আর এখন সেই আল্লাহই তাকে যবেহ করার আদেশ দিয়েছেন। আল্লাহর দেওয়া সম্পদ আল্লাহর জন্য কুরবান করতে একজন সত্যিকারের বান্দার দ্বিধা থাকার কথা নয়; বরং বান্দার জন্য এটিই সৌভাগ্যের বিষয়।

 

ইবরাহীম আ. অতীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে অনেক বড় বড় পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং সবগুলোতেই চূড়ান্ত সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছেন। এই আদেশ পালনের ক্ষেত্রেও তিনি নিজের দিক থেকে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। তবে যেহেতু বিষয়টি শুধু তাঁর নিজের সঙ্গে নয়, তাঁর সন্তানের সঙ্গেও সংশ্লিষ্ট, তাই তিনি সন্তানের অভিমত জানা বা অন্তত তাকে বিষয়টি অবহিত করা প্রয়োজন মনে করেন। এতে সন্তান মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারবেন, আর কোনো দ্বিধা থাকলে তা বুঝিয়ে বলা যাবে।

 

ইবরাহীম আ. নিজ স্বপ্নের কথা সন্তানকে জানিয়ে তাঁর অভিমত জানতে চাইলেন-

يٰبُنَيَّ اِنِّيْۤ اَرٰي فِي الْمَنَامِ اَنِّيْۤ اَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَا ذَا تَرٰي.

হে আমরা বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি, তোমাকে যবেহ করছি। তাই তুমি চিন্তা করে দেখ, তোমার অভিমত কী।

 

কিন্তু তিনি তো ছিলেন খলীলুল্লাহর পুত্র এবং ভবিষ্যৎ নবী। তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন-

يٰۤاَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِيْۤ اِنْ شَآءَ اللهُ مِنَ الصّٰبِرِيْنَ.

হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে আল্লাহ চাহেন তো অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০২

 

এ উত্তরের মধ্যে ইসমাঈল আ.-এর গভীর জ্ঞান, বিনয় ও আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য প্রকাশ পায়। ইবরাহীম আ. তাঁর কাছে সরাসরি বলেননি যে, আল্লাহ তোমাকে যবেহ করার আদেশ করেছেন; তিনি কেবল স্বপ্নের কথা বলেছেন। কিন্তু ইসমাঈল আ. বুঝে ফেলেছিলেন, এ স্বপ্ন মূলত আল্লাহর একটি আদেশ।

 

দ্বিতীয়ত, তিনি ‘ইনশাআল্লাহ’ বলে বিষয়টি আল্লাহর কাছে সমর্পণ করেছেন। আবার ‘আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন’ বলে তিনি ইঙ্গিত করেছেন যে, এই ধৈর্য একা তাঁর ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়; বরং পৃথিবীতে আরও বহু ধৈর্যশীল আছেন, ইনশাআল্লাহ তিনি তাঁদের অন্তর্ভুক্ত হবেন। এভাবে তিনি অহংকার ও আত্মমুগ্ধতার নাম-গন্ধটুকুও দূর করে চূড়ান্ত বিনয়ের প্রকাশ ঘটান।

 

আত্মসমর্পণের পরীক্ষায় পিতা-পুত্রের সফলতা

যখন পিতা-পুত্র উভয়ে আল্লাহর আদেশ পালনের জন্য রাজি হয়ে গেলেন, তখন এল আসল পর্ব। ইবরাহীম আ. পুত্রকে যবেহ করার জন্য কাত করে শোয়ালেন। যবেহের ক্ষেত্রে সাধারণ নিয়ম হলো চিত করে শোয়ানো। কিন্তু ইবরাহীম আ. ইসমাঈল আ.-কে কাত করে শোয়ানোর উদ্দেশ্য সম্ভবত এই ছিল যে, ছুরি চালানোর সময় সন্তানের মুখ যেন নজরে না পড়ে, পাছে পুত্রবাৎসল্য জেগে উঠলে মন দুর্বল হয়ে যায়। এ থেকেই বোঝা যায়, আল্লাহর আদেশ পালনের ব্যাপারে তাঁরা কতটা আন্তরিক ছিলেন।

 

আল্লাহ তাআলার আদেশ পালনের জন্য তাঁরা নিজেদের এখতিয়ারাধীন সবকিছুই করে ফেলেছিলেন। তাই তাঁদের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়ে গিয়েছিল। এরপর আল্লাহ তাআলা তাঁর কুদরতের এক কারিশমা দেখালেন। তিনি নিজ কুদরতে সেখানে একটি দুম্বা পাঠিয়ে দিলেন। ইবরাহীম আ. আল্লাহর নির্দেশে পুত্রের স্থলে সেটি যবেহ করলেন। ইসমাঈল আ. জীবিত ও নিরাপদ থাকলেন।

 

কুরআনের ভাষায়-

فَلَمَّاۤ اَسْلَمَا وَتَلَّهٗ لِلْجَبِيْنِ وَنَادَيْنٰهُ اَنْ يّٰۤاِبْرٰهِيْمُ قَدْ صَدَّقْتَ الرُّءْيَا اِنَّا كَذٰلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِيْنَ، اِنَّ هٰذَا لَهُوَ الْبَلٰٓؤُا الْمُبِيْنُ، وَفَدَيْنٰهُ بِذِبْحٍ عَظِيْمٍ.

অতঃপর যখন তারা উভয়ে আদেশ মান্য করল এবং পিতা পুত্রকে উপুড় করে শুইয়ে দিল। আর আমি তাকে ডাক দিয়ে বললাম, হে ইবরাহীম! তুমি স্বপ্নকে সত্যে পরিণত করে দেখিয়েছ। আমি এভাবেই সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা ছিল স্পষ্ট পরীক্ষা। এবং আমি এক মহান কুরবানীর (পশুর) বিনিময়ে তাকে (ইসমাঈল) মুক্ত করলাম। -সূরা সাফফাত (৩৭) : ১০৩-১০৭

 

আরেক স্থানে এই ঘটনার সারকথা এভাবে এসেছে-

অতঃপর যখন সে তার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন সে বলল, হে প্রিয় বৎস, আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে জবাই করছি, অতএব দেখ তোমার কী অভিমত; সে বলল, হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। আমাকে ইনশাআল্লাহ আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন। অতঃপর তারা উভয়ে যখন আত্মসমর্পণ করল এবং সে তাকে কাত করে শুইয়ে দিল। তখন আমি তাকে আহ্বান করে বললাম, হে ইবরাহিম, তুমি তো স্বপ্নাদেশ সত্যিই পালন করলে! এভাবেই আমি সৎ কর্মপরায়ণদের পুরস্কৃত করে থাকি। (সুরা আস-সাফফাত, আয়াত: ১০২-১০৫)

 

ইবরাহীম আ.-এর এই দুম্বা কুরবানী ইসলামী শরীয়তে নির্দেশিত কুরবানীর পদ্ধতির মূল সূত্র। সামর্থ্যবান মুসলমানদের কর্তব্য হলো নির্ধারিত দিনে নির্দিষ্ট পশু কুরবানী করা। এটি কুরআন ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।

 

কুরআন ও হাদীসে কুরবানীর বিধান

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَ انْحَرْ.

সুতরাং আপনার প্রতিপালকের জন্য সালাত আদায় করুন এবং কুরবানী করুন। -সূরা কাওসার (১০৮) : ২

এ আয়াতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এবং তাঁর মাধ্যমে গোটা উম্মতকে নামায ও কুরবানীর আদেশ করা হয়েছে।

 

আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা.-এর সূত্রে বর্ণিত এক দীর্ঘ হাদীসে এসেছে, এক ব্যক্তি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে দ্বীন সম্পর্কে জানতে এসেছিল। ফিরে যাওয়ার সময় নবীজী তাকে ডেকে বললেন-

أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى، جَعَلَهُ اللهُ عِيدًا لِهَذِهِ الْأُمَّةِ.

আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহার’ আদেশ করা হয়েছে। এ দিবসকে আল্লাহ এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। -মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৬৫৭৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস ৫৯১৪

এ হাদীস থেকে জানা যায়, আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কুরবানীর দিন কুরবানী করার জন্য বিশেষভাবে আদেশ করা হয়েছে।

 

মিখনাফ ইবনে সুলাইম রা. বলেন-

كُنّا وُقُوفًا مَعَ النّبِيِّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ بِعَرَفَاتٍ، فَسَمِعْتُهُ يَقُولُ: يَا أَيّهَا النّاسُ، عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِي كُلِّ عَامٍ أُضْحِيّةٌ.

আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আরাফায় অবস্থান করছিলাম। তখন তাঁকে বলতে শুনেছি, হে লোকসকল! প্রত্যেক ঘরওয়ালার উপর প্রতি বছর কুরবানী আবশ্যক। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫১৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৮৮; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা, হাদীস ২৪৭৮৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৭৮৮৯

 

ইমাম তিরমিযী রহ. বলেন-

هذا حديث حسن غريب.

তাছাড়া নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদানী-জীবনে প্রতি বছর কুরবানী করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন-

أَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي كُلَّ سَنَةٍ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় দশ বছর ছিলেন। প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন। -জামে তিরমিযী, হাদীস ১৫০৭; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ৪৯৫৫

 

ইমাম তিরমিযী রাহ. বলেন-

هذا حديث حسن

উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীসসমূহ থেকে বোঝা যায়, কুরবানী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধান। সামর্থ্যবানদের জন্য কুরবানী করা আবশ্যক।

 

কুরবানীর মূল শিক্ষা: তাওহীদকে নিখুঁত করা

কুরবানীর গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো আল্লাহর প্রতি তাওহীদের বিশ্বাসকে দৃঢ়, পরিপূর্ণ ও নিখুঁত করা। কুরবানী আমাদের শেখায়, ইবাদতের উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ, আর কোনো কিছু ইবাদতের উপযুক্ত নয়। সুতরাং ইবাদত একমাত্র আল্লাহর জন্যই হবে। আল্লাহ ছাড়া আর কারও বা কোনো কিছুর ইবাদত করা যাবে না। কোথাও উপাসনাধর্মী কোনো কাজ গায়রুল্লাহর জন্য হলে তাতে শরীক হওয়া যাবে না।

 

আল্লাহ তাআলা নবীজীকে বলেন-

قُلْ اِنَّنِيْ هَدٰىنِيْ رَبِّيْۤ اِلٰي صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ دِيْنًا قِيَمًا مِّلَّةَ اِبْرٰهِيْمَ حَنِيْفًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، قُلْ اِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ، لَا شَرِيْكَ لَهٗ وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَاَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ.

আপনি বলে দিন, আমার প্রতিপালক আমাকে সরলপথ প্রদর্শন করেছেন, যা বিশুদ্ধ দ্বীন, ইবরাহীমের মিল্লাত, যিনি ছিলেন একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুন, আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই প্রথম আনুগত্যকারী। -সূরা আনআম (৬) : ১৬১-৬৩

এ আয়াতগুলোতে নবীজীকে নিখুঁত ও পরিপূর্ণ তাওহীদের ঘোষণা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে। নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর পশু যবেহ করার সময় তাওহীদের এই ঘোষণা উচ্চারণ করতেন।

 

জাবির রা. থেকে বর্ণিত, একবার নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের দিন দুটি দুম্বা জবাই করেছেন। তিনি যখন এগুলোকে কেবলামুখী করে শোয়ালেন তখন বললেন-

إِنِّي وَجَّهْتُ وَجْهِيَ لِلَّذِيْ فَطَرَ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضَ، عَلى مِلَّةِ إِبْرَاهِيْمَ حَنِيْفًا، وَمَا أَنَا مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ، إِنَّ صَلَاتِيْ وَنُسُكِيْ وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ. لَا شَرِيْكَ لَهٗ، وَبِذلِكَ أُمِرْتُ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ.

আমি আমার মুখ তাঁর অভিমুখী করলাম, যিনি আসমান ও যমীন সৃষ্টি করেছেন, ইবরাহীমের মিল্লাতের ওপর, যিনি একনিষ্ঠ ছিলেন এবং আমি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত নই। আমার নামায, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। এরই আদেশ করা হয়েছে আমাকে এবং আমিই প্রথম আনুগত্যকারী। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ২৮৯৯

 

আল্লাহর আদেশের সামনে পূর্ণ আত্মসমর্পণ

কুরবানীর আরেকটি বড় শিক্ষা হলো আল্লাহর সামনে আত্মসমর্পণ করা। তাঁর আদেশকে শিরোধার্য করা এবং তাঁর হুকুম-আহকাম পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা। কুরবানীর ইতিহাসে দেখা যায়, ইবরাহীম আ. আল্লাহর নির্দেশে বৃদ্ধ বয়সে প্রাপ্ত একমাত্র সন্তান ইসমাঈল আ.-কে যবেহ করার জন্য খুশিমনে রাজি হয়েছিলেন। এটি প্রমাণ করে, আল্লাহর আদেশের সামনে মুমিনের ব্যক্তিগত আবেগ, ভালোবাসা ও স্বার্থও নত হয়ে যায়।

 

নেক আমলের নিয়ত হবে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি

কুরবানীর আরেকটি বড় শিক্ষা হলো যে কোনো নেক কাজ একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য করা। কুরবানীর এ শিক্ষা উপরিউক্ত আয়াত ও হাদীস থেকেই পাওয়া যায়। অন্যত্র বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে এসেছে।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

لَنْ يَّنَالَ اللهَ لُحُوْمُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلٰكِنْ يَّنَالُهُ التَّقْوٰي مِنْكُمْ.

আল্লাহর কাছে সেগুলোর গোশত পৌঁছে না এবং সেগুলোর রক্তও না; বরং তাঁর কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। -সূরা হজ্ব (২২) : ৩৭

 

কুরবানীর পশুর গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, রক্তও পৌঁছে না। গোশত মানুষ খেয়ে নেয়, রক্ত-ময়লা ফেলে দেওয়া হয়। তাহলে আল্লাহর কাছে কী পৌঁছে? তাঁর কাছে পৌঁছে অন্তরের নিয়ত ও তাকওয়া। যদি একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কুরবানী করা হয়, তাহলে সেটিই আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হবে এবং তার প্রতিদান পাওয়া যাবে। আর যদি নাম-দাম, লৌকিকতা বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে করা হয়, তাহলে আল্লাহর কাছে এর কোনো প্রতিদান থাকবে না।

 

মানব ইতিহাসের প্রথম কুরবানীর ঘটনাতেও এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখিত হয়েছে। আদম আ.-এর দুই পুত্র যখন কুরবানী পেশ করলেন, তখন একজনের কুরবানী কবুল হলো, আর অপরজনের কুরবানী কবুল হয়নি। এ অবস্থায় যার কুরবানী কবুল হয়নি, তার উচিত ছিল সত্য মেনে নেওয়া। কিন্তু সে উল্টো ঈর্ষাকাতর হয়ে ওঠে এবং একপর্যায়ে অপর ভাইকে হত্যা করার জন্য উদ্যত হয়। তখন যার কুরবানী কবুল হয়েছিল, তিনি বলেন-

اِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنَ الْمُتَّقِيْنَ .

আল্লাহ তো মুত্তাকীদের থেকেই কবুল করেন। -সূরা মায়েদা (৫) : ২৭

 

হাদীসেও এ বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বারা ইবনে আযিব রা. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন-

إِنَّ أَوَّلَ مَا نَبْدَأُ بِهِ فِي يَوْمِنَا هَذَا أَنْ نُصَلِّيَ، ثُمَّ نَرْجِعَ فَنَنْحَرَ، مَنْ فَعَلَهُ فَقَدْ أَصَابَ سُنَّتَنَا، وَمَنْ ذَبَحَ قَبْلُ، فَإِنَّمَا هُوَ لَحْمٌ قَدَّمَهُ لِأَهْلِهِ، لَيْسَ مِنَ النُّسُكِ فِي شَيْءٍ.

ঈদের দিন আমরা প্রথমে নামায আদায় করি। অতঃপর ফিরে এসে কুরবানী করি। যে ব্যক্তি এভাবে আদায় করবে, সে আমাদের নিয়ম মতো করল। আর যে নামাযের আগেই পশু জবাই করল সেটা তার পরিবারের জন্য গোশত হবে, কুরবানী হবে না। -সহীহ বুখারী, হাদীস ৫৫৪৫; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৯৬১

এ হাদীস থেকে বোঝা যায়, কুরবানী শরীয়তের বিধান মোতাবেক আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে করতে হবে। অন্যথায় তা কুরবানী হবে না; বরং নিছক গোশত খাওয়ার আয়োজন হবে।

 

বড় নেক আমলেও অহংকার নয়, থাকবে বিনয়

কুরবানীর আরেকটি শিক্ষা হলো, কোনো কাজেই অহংকার না করা। এমনকি বড় কোনো নেক কাজের তাওফীক হয়ে গেলেও আত্মমুগ্ধতার শিকার হওয়া যাবে না; বরং বিনয়ী হতে হবে। অন্তরে এই অনুভূতি রাখতে হবে যে, এটি একমাত্র আল্লাহর দয়াতেই সম্ভব হয়েছে; অন্যথায় মানুষের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না।

 

কুরবানীর ইতিহাসে আমরা দেখি, ইবরাহীম আ. যখন ইসমাঈল আ.-এর কাছে স্বপ্নের কথা ব্যক্ত করে তাঁর অভিমত জানতে চেয়েছিলেন, তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হে আমার পিতা! আপনাকে যে আদেশ করা হয়েছে তা করে ফেলুন। আপনি আমাকে আল্লাহ চাহেন তো অবশ্যই ধৈর্যশীলদের মধ্যে পাবেন।’ এই বাক্যে ইসমাঈল আ.-এর বিনয়, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা এবং আত্মপ্রশংসা থেকে দূরে থাকার শিক্ষা স্পষ্ট।

 

একবার নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দুটি দুম্বা কুরবানী করেন-একটি নিজের পক্ষ থেকে, আরেকটি উম্মতের পক্ষ থেকে। দুম্বা দুটি জবাই করার সময় তিনি বলেন-

اَللّٰهُمَّ مِنْكَ وَلَكَ.

হে আল্লাহ! এটা তোমার পক্ষ থেকেই এবং তোমার জন্যই। -সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২৭৯৫; মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ১৫০২২; সহীহ ইবনে খুযাইমা, হাদীস ২৮৯৯

নবীজীর বিনয় এখানে স্পষ্ট। দুটি দুম্বা কুরবানী করা সত্ত্বেও তিনি অহংকার করেননি; বরং এই অনুভূতি প্রকাশ করেছেন যে, এটি আল্লাহরই দান, তিনিই এর তাওফীক দিয়েছেন।

 

সন্তানকে আল্লাহর অনুগত করে গড়ে তোলার শিক্ষা

কুরবানীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো সন্তানকে আল্লাহর অনুগত বানানোর চেষ্টা করা। কুরবানীর ইতিহাসে দেখা যায়, ইবরাহীম আ. মনে মনে এমন সন্তানের কথাই ভাবতেন এবং আল্লাহর কাছেও এমন সন্তানই প্রার্থনা করতেন, যে আল্লাহর পূর্ণ অনুগত হবে, আল্লাহর জন্য জীবন দিতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধা করবে না। হযরত ইসমাঈল আ. সেই আনুগত্য বাস্তবে প্রমাণ করেছেন। পিতার স্বপ্নের কথা শুনেই তিনি আল্লাহর আদেশ পালনে নিজেকে প্রস্তুত করে দেন। এই ঘটনা শুধু পিতা-পুত্রের আত্মত্যাগের ইতিহাস নয়; বরং প্রতিটি মুসলিম পরিবারের জন্য বড় শিক্ষা। সন্তানকে শুধু দুনিয়াবি সফলতার জন্য নয়, আল্লাহর আনুগত্য, ঈমান, বিনয়, ধৈর্য ও তাকওয়ার ওপর গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে।

 

কুরবানী তাই এক দিনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি মুমিন জীবনের গভীর আত্মশুদ্ধির শিক্ষা। কুরবানীর পশু জবাইয়ের মধ্য দিয়ে মুমিন তার ভেতরের অহংকার, আত্মমুগ্ধতা, লৌকিকতা, কৃপণতা এবং আল্লাহর আদেশ অমান্য করার প্রবণতাকেও কুরবান করার শিক্ষা নেয়। আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত নয়, পৌঁছে মানুষের তাকওয়া, ইখলাস ও আনুগত্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সুন্দরভাবে কুরবানী করা এবং এর শিক্ষা দ্বারা আলোকিত হওয়ার তাওফীক দান করুন।


সম্পর্কিত নিউজ