{{ news.section.title }}
প্রবাসীরা কি দেশে কোরবানি দিতে পারবেন?
কোরবানি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং শায়াইরে ইসলাম তথা ইসলামের অন্যতম প্রতীক। ‘কোরবানি’ শব্দটি ‘কুরবুন’ মূল ধাতু থেকে এসেছে। এর অর্থ হলো নৈকট্য লাভ করা, অর্থাৎ আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে প্রিয় বস্তু উৎসর্গ করা। শরিয়তের পরিভাষায়, নির্দিষ্ট সময়ে নির্ধারিত নিয়মে একমাত্র আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি লাভের জন্য নির্দিষ্ট পশু আল্লাহর নামে জবাই করাকেই কোরবানি বলা হয়।
রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিবছর কোরবানি করতেন। কোরবানি শুধু একটি সামাজিক আয়োজন নয়; বরং এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, তাকওয়া, আত্মত্যাগ ও ইখলাসের শিক্ষা বহন করে। কোরআনে আল্লাহ তাআলা নামাজের সঙ্গে যুক্ত করে কোরবানি করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহ বলেন,
اِنَّاۤ اَعۡطَیۡنٰکَ الۡکَوۡثَرَ فَصَلِّ لِرَبِّکَ وَ انۡحَرۡ اِنَّ شَانِئَکَ هُوَ الۡاَبۡتَرُ
নিশ্চয় আমি তোমাকে কাওসার দান করেছি। সুতরাং তোমার রবের উদ্দেশে সালাত আদায় করো ও কোরবানি করো। নিশ্চয় তোমার প্রতি শত্রুতা পোষণকারীই নির্বংশ। (সুরা কাওসার: ১-৩)
হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, জিলহজ মাসের ১০, ১১ ও ১২ তারিখে কোনো প্রাপ্তবয়স্ক, জ্ঞানসম্পন্ন মুসলিম যদি নিজের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের বাইরে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হন, তাহলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব। নিসাব হলো সাড়ে সাত তোলা বা সাড়ে সাত ভরি সোনা, অথবা সাড়ে বায়ান্ন তোলা বা সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপা, অথবা এর সমমূল্যের নগদ অর্থ, ব্যবসার পণ্য বা অতিরিক্ত সম্পদ। হানাফি ফিকহে সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার বিষয়টি আলেমদের আলোচনায় সুপ্রতিষ্ঠিত।
জাকাত ও কোরবানির নিসাবের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে। জাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ মালিকের কাছে পূর্ণ এক বছর থাকা শর্ত। কিন্তু কোরবানির ক্ষেত্রে জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখের মধ্যে কারও কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলেই তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়। এ কারণে অনেকের ওপর জাকাত ওয়াজিব না হলেও কোরবানি ওয়াজিব হতে পারে।
তাই একটি পরিবারের মধ্যে শুধু একজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করলেই সবার ওয়াজিব আদায় হয়ে যায়-এমন ধারণা সঠিক নয়। পরিবারের যেসব সদস্য পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক, তাদের প্রত্যেকের পক্ষ থেকেই কোরবানি করতে হবে। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, পরিবারের প্রত্যেক সামর্থ্যবান ব্যক্তির জন্য আলাদা কোরবানি আদায় করা প্রয়োজন; একটি ছাগল বা ভেড়া একজনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট, আর গরু, মহিষ বা উটের মতো বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন অংশ নিতে পারেন।
কোরবানি সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,
وَالۡبُدۡنَ جَعَلۡنٰهَا لَکُمۡ مِّنۡ شَعَآئِرِ اللّٰهِ لَکُمۡ فِیۡهَا خَیۡرٌ فَاذۡکُرُوا اسۡمَ اللّٰهِ عَلَیۡهَا صَوَآفَّ فَاِذَا وَجَبَتۡ جُنُوۡبُهَا فَکُلُوۡا مِنۡهَا وَ اَطۡعِمُوا الۡقَانِعَ وَ الۡمُعۡتَرَّ کَذٰلِکَ سَخَّرۡنٰهَا لَکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ لَنۡ یَّنَالَ اللّٰهَ لُحُوۡمُهَا وَ لَا دِمَآؤُهَا وَ لٰکِنۡ یَّنَالُهُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ سَخَّرَهَا لَکُمۡ لِتُکَبِّرُوا اللّٰهَ عَلٰی مَا هَدٰىکُمۡ وَ بَشِّرِ الۡمُحۡسِنِیۡنَ
আর কোরবানির উটকে আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর অন্যতম নিদর্শন বানিয়েছি; তোমাদের জন্য তাতে রয়েছে কল্যাণ। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দন্ডায়মান অবস্থায় সেগুলির উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ কর যখন সেগুলি কাত হয়ে পড়ে যায় তখন তা থেকে খাও। যে অভাবী, মানুষের কাছে হাত পাতে না এবং যে অভাবী চেয়ে বেড়ায়-তাদেরকে খেতে দাও। এভাবেই আমি ওগুলিকে তোমাদের অনুগত করে দিয়েছি; যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর। আল্লাহর কাছে পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত; বরং তার কাছে পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া। এভাবেই তিনি সে সবকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর তাকবির পাঠ করতে পার, এজন্য যে, তিনি তোমাদেরকে হিদায়াত দান করেছেন; সুতরাং তুমি সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ দাও। (সুরা হজ: ৩৬, ৩৭)
এই আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, কোরবানির আসল উদ্দেশ্য গোশত বা রক্ত নয়; বরং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য হয় বান্দার তাকওয়া, নিয়ত ও আনুগত্য। তাই কোরবানি আদায়ের সময় লোক দেখানো, সামাজিক প্রতিযোগিতা বা অহংকার থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। পশুর দাম, আকার বা বাহ্যিক আয়োজনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো নিয়তের বিশুদ্ধতা।
প্রবাসীদের পক্ষ থেকে দেশে কোরবানি দেওয়ার বিষয়েও ইসলামে নিষেধ নেই। কোনো ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করলেও তার তত্ত্বাবধান, অনুমতি বা নির্দেশক্রমে বাংলাদেশে তার নামে কোরবানি করা হলে তার পক্ষ থেকে কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। একইভাবে কেউ ঢাকায় অবস্থান করে নিজের গ্রামে কোরবানি দিলে বা প্রবাসে থেকে নিজ দেশে কোরবানি করালে কোরবানি আদায় হবে। প্রতিনিধির মাধ্যমে কোরবানি আদায়ের বিষয়টি ফিকহি আলোচনায় বৈধ হিসেবে বিবেচিত।
তবে প্রবাসীর কোরবানির ক্ষেত্রে সময়ের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কোরবানি নির্দিষ্ট সময়ের ইবাদত। জিলহজের ১০ তারিখ কোরবানির সময় শুরু হওয়ার আগে পশু জবাই করলে কোরবানি আদায় হবে না। তাই যে ব্যক্তি প্রবাসে থাকেন এবং তার পক্ষ থেকে অন্য দেশে কোরবানি করা হয়, তার ক্ষেত্রে সময়ের সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রবাসীর পক্ষ থেকে দেশে কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে আগে থেকে যোগাযোগ করা উচিত। বিশেষ করে যেসব দেশ সময়ের দিক থেকে বাংলাদেশ থেকে পেছনে, সেসব দেশের প্রবাসীর কোরবানির পশু জবাই করার আগে নিশ্চিত হতে হবে-তার দেশের সময় অনুযায়ী জিলহজ মাসের ১০ তারিখ সুবহে সাদিক অতিবাহিত হয়েছে কি না। এ বিষয়ে ফিকহি গ্রন্থে সতর্কতার কথা এসেছে। (বাদায়েউস সানায়ে : ৬/২৮৫, কিফায়াতুল মুফতি : ৮/১৮৬, ফাতাওয়ায়ে ফকীহুল মিল্লাত : ১১/২০৪)
এ কারণে কোনো প্রবাসীর পক্ষ থেকে কোরবানি করার আগে তার অবস্থানরত দেশের সময়, ঈদের দিন এবং কোরবানির সময় শুরু হয়েছে কি না-এসব বিষয় মিলিয়ে নেওয়া নিরাপদ। আলেমদের আলোচনায় কোরবানির সময় নির্ধারণে পশু যে এলাকায় আছে, সেই এলাকার সময় বিবেচনার কথাও পাওয়া যায়। আবার প্রবাসীর পক্ষ থেকে কোরবানি হলে দাতার অবস্থানরত দেশের সময় বিবেচনা করে সতর্কতা অবলম্বনের কথাও বলা হয়। তাই বাস্তব ক্ষেত্রে সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো-দাতা ও পশু যেখানে আছে, উভয় দিকের কোরবানির সময় শুরু হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জবাই করা।
যদি কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি আত্মীয়ের পক্ষ থেকে বিদেশে কোরবানি করতে চান, তাহলেও সময়ের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো সৌদি প্রবাসী যদি তার বাংলাদেশি আত্মীয়ের পক্ষ থেকে সৌদি আরবে কোরবানি করতে চান, তাহলে বাংলাদেশ সময় অনুযায়ী ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক পার হওয়ার আগে কোরবানি করা উচিত হবে না। কারণ কোরবানিদাতা বা যার পক্ষ থেকে কোরবানি করা হচ্ছে, তার কোরবানির সময় শুরু হওয়ার আগেই পশু জবাই হয়ে গেলে কোরবানি আদায়ে সমস্যা হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-কোরবানিদাতা ও কোরবানির পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে ঈদের নামাজের সময় নিয়ে অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। ফিকহি আলোচনায় বলা হয়েছে, কোরবানিদাতা যে দেশে বা এলাকায় অবস্থান করেন, তার জন্য ওই দেশেই কোরবানি করা জরুরি নয়। বরং তার তত্ত্বাবধান ও নির্দেশক্রমে পৃথিবীর যেকোনো জায়গায় তার নামে কোরবানি করা হলে তা আদায় হয়ে যাবে। কোরবানিদাতা ও পশু ভিন্ন স্থানে থাকলে কোরবানিদাতার ঈদের নামাজ পড়া বা না পড়া ধর্তব্য নয়; বরং পশু যে এলাকায় আছে, ওই এলাকায় ঈদের জামাত হয়ে গেলে পশু জবাই করা যাবে। (আদ্দুররুল মুখতার ৬/৩১৮)
তবে বাস্তবে যেহেতু দেশভেদে চাঁদ দেখা, ঈদের দিন এবং সময়ের পার্থক্য থাকে, তাই প্রবাসী বা প্রতিনিধির মাধ্যমে কোরবানি আদায়ের আগে স্থানীয় আলেম বা বিশ্বস্ত মুফতির পরামর্শ নেওয়া উত্তম। বিশেষ করে সৌদি আরব, মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, আমেরিকা বা বাংলাদেশ-এসব অঞ্চলের সময়ের পার্থক্যের কারণে আগে থেকেই সমন্বয় না করলে ভুল সময়ে পশু জবাই হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
কোরবানির দিনগুলো সাধারণত জিলহজের ১০, ১১ ও ১২ তারিখ। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী, কোরবানির সময় ১০ জিলহজ ঈদের নামাজের পর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্তের পূর্ব পর্যন্ত থাকে। ফিকহি আলোচনায় এ সময়সীমাকে কোরবানির বৈধতার মৌলিক শর্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কোরবানি আদায়ের ক্ষেত্রে আরেকটি দিক হলো, যিনি নিজে কোরবানি করতে সক্ষম, তার জন্য নিজ হাতে কোরবানি করা উত্তম। তবে প্রয়োজন হলে অন্য কাউকে প্রতিনিধি বানিয়ে কোরবানি করানো বৈধ। বর্তমান সময়ে প্রবাসী, শহরে অবস্থানকারী ব্যক্তি, কর্মব্যস্ত মানুষ বা দূরবর্তী স্থানে থাকা মুসলমানরা আত্মীয়, মাদরাসা, মসজিদ কমিটি, বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান বা দাতব্য সংস্থার মাধ্যমে কোরবানি করিয়ে থাকেন। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো-প্রতিনিধি যেন নির্ভরযোগ্য হয়, পশু শরিয়তসম্মত হয়, সময় ঠিক থাকে এবং যার নামে কোরবানি করা হচ্ছে, তার নিয়ত ও অনুমতি স্পষ্ট থাকে।
কোরবানি শুধু সামর্থ্যবান মুসলমানের ওপর একটি আর্থিক ইবাদত নয়; বরং এর সঙ্গে রয়েছে সামাজিক দায়িত্বও। কোরবানির গোশত নিজেরা খাওয়া, আত্মীয়স্বজনকে দেওয়া এবং দরিদ্র-অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করা ইসলামের সৌন্দর্যকে প্রকাশ করে। কোরবানি মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধ বাড়ায়।
বিশেষ করে ঈদুল আজহার সময় প্রবাসীরা দেশে থাকা পরিবার, আত্মীয়স্বজন ও দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পান। অনেক প্রবাসী নিজ গ্রামে বা এলাকায় কোরবানি দিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে গোশত বিতরণ করেন। এতে একদিকে তাদের ওয়াজিব কোরবানি আদায় হয়, অন্যদিকে সমাজের অসহায় মানুষের ঈদের আনন্দেও অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
তবে কোরবানি আদায়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। প্রথমত, কার ওপর কোরবানি ওয়াজিব, তা বুঝতে হবে। দ্বিতীয়ত, একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিসাবের মালিক হলে প্রত্যেকের পক্ষ থেকে কোরবানি দিতে হবে। তৃতীয়ত, প্রবাসীর পক্ষ থেকে কোরবানি হলে সময়ের পার্থক্য অবশ্যই বিবেচনা করতে হবে। চতুর্থত, প্রতিনিধি বা প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকতে হবে। পঞ্চমত, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য যেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন হয়, লোক দেখানো বা সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শন নয়।
ঈদুল আজহার আগে তাই মুসলমানদের উচিত নিজের আর্থিক অবস্থা যাচাই করা, কোরবানি ওয়াজিব কি না তা জেনে নেওয়া এবং প্রবাসী হলে সময়ের সমন্বয় করে আগেই পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করা। কোরবানি যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের ইবাদত, তাই পশু কেনা, অংশীদার নির্ধারণ, টাকা পাঠানো, প্রতিনিধি ঠিক করা এবং জবাইয়ের সময় নিশ্চিত করা-সবকিছু আগেভাগে পরিকল্পনা করে নেওয়া প্রয়োজন।