ফুটবলকে আমেরিকানরা ‘সকার’ বলে কেন? জানলে অবাক হবেন

ফুটবলকে আমেরিকানরা ‘সকার’ বলে কেন? জানলে অবাক হবেন
ছবির ক্যাপশান, প্রতীকী ছবি

ফুটবল বিশ্বকাপ ২০২৬ বসেছে উত্তর আমেরিকায়। এবারের আসরের যৌথ স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো। বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকে ঘিরে কোটি কোটি সমর্থক যখন ফুটবল উন্মাদনায় ডুবে আছেন, তখন আবারও আলোচনায় এসেছে বহু পুরোনো একটি বিতর্ক-খেলাটির নাম আসলে ‘ফুটবল’, নাকি ‘সকার’?

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে খেলাটি ‘ফুটবল’ নামে পরিচিত হলেও যুক্তরাষ্ট্রে একে বলা হয় ‘সকার’। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, টেলিভিশন আলোচনা কিংবা বিশ্বকাপ ঘিরে সমর্থকদের তর্কে প্রায়ই উঠে আসে এই বিষয়টি। অনেকের ধারণা, ‘সকার’ শব্দটি আমেরিকানদের তৈরি। কিন্তু ইতিহাস বলছে একেবারে ভিন্ন কথা। বাস্তবে ‘সকার’ শব্দটির জন্মই হয়েছিল ইংল্যান্ডে-যে দেশকে আধুনিক ফুটবলের জন্মভূমি বলা হয়।

 

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু

ফুটবলের নাম নিয়ে এই গল্পের শুরু উনিশ শতকের ইংল্যান্ডে। সে সময় অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে শব্দ সংক্ষিপ্ত করে উচ্চারণ করার একটি বিশেষ সংস্কৃতি জনপ্রিয় ছিল। দীর্ঘ শব্দকে ছোট করে তার সঙ্গে ‘-er’ বা ‘-ar’ ধ্বনি যোগ করে নতুন শব্দ তৈরি করা হতো।

 

১৮৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দ্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (The Football Association)। এর মাধ্যমে আধুনিক ফুটবলের নিয়মকানুন আনুষ্ঠানিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। খেলাটির নাম রাখা হয় “Association Football”।

 

অক্সফোর্ডের শিক্ষার্থীরা প্রথমে “Association” শব্দটিকে সংক্ষিপ্ত করে “Assoc” বলতেন। পরে সেটি রূপ নেয় “Socca”-তে এবং শেষ পর্যন্ত “Soccer” শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। একই সময়ে “Rugby Football” থেকে “Rugger” নামটিও তৈরি হয়েছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সেটি হারিয়ে গেলেও “Soccer” টিকে যায়। ভাষাবিদদের মতে, আজকের ‘সকার’ শব্দের উৎপত্তি আসলে একটি ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের ছাত্র-সংস্কৃতি থেকে।

 

একসময় ব্রিটিশরাও বলত ‘সকার’

আজকের দিনে অনেক ব্রিটিশ সমর্থক ‘সকার’ শব্দটি শুনলে বিরক্তি প্রকাশ করেন। কারণ বর্তমানে যুক্তরাজ্যে ‘ফুটবল’ শব্দটিই সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, একসময় ব্রিটেনেই ‘সকার’ ছিল একেবারে স্বাভাবিক ও গ্রহণযোগ্য শব্দ।

 

১৯৩০ থেকে ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত ব্রিটিশ সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন ও ক্রীড়া সাময়িকীগুলোতে নিয়মিত ‘সকার’ শব্দ ব্যবহার করা হতো। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইংল্যান্ডের ঐতিহাসিক ১-০ গোলের পরাজয়ের খবরেও ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যমগুলো “Soccer” শব্দ ব্যবহার করেছিল।

 

ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি কোচ স্যার আলফ রামসেও তাঁর আত্মজীবনীতে “Soccer” শব্দ লিখেছেন। এমনকি ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড যখন নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র বিশ্বকাপ জিতে নেয়, তখনও বহু সংবাদপত্রের শিরোনামে “Soccer” দেখা গিয়েছিল।

 

ব্রিটিশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান Soccer AM-ও ২০২৩ সাল পর্যন্ত সম্প্রচার হয়েছে। অর্থাৎ ‘সকার’ শব্দটি ব্রিটিশ সংস্কৃতির বাইরে নয়; বরং তারই একটি ঐতিহাসিক অংশ।

 

তাহলে যুক্তরাষ্ট্রে ‘সকার’ থেকে গেল কেন?

এর পেছনের কারণ মূলত আরেকটি খেলা। যুক্তরাষ্ট্রে “Football” বলতে সাধারণত বোঝানো হয় “American Football”-যেখানে ডিম্বাকৃতির বল হাতে নিয়ে খেলা হয় এবং যা দেশটির সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রীড়াগুলোর একটি। ফলে দুটি খেলাকে আলাদা করে বোঝানোর প্রয়োজন দেখা দেয়। সেই কারণে “Association Football”-এর সংক্ষিপ্ত রূপ “Soccer” যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।

 

বিশ শতকের শুরুতে মার্কিন ক্রীড়া সংগঠনগুলো আনুষ্ঠানিকভাবেই “Soccer” শব্দ ব্যবহার শুরু করে। ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় “United States Football Association”, যা পরবর্তীতে “United States Soccer Federation” নামে পরিচিত হয়। এরপর ধীরে ধীরে “Soccer” যুক্তরাষ্ট্রের ক্রীড়া সংস্কৃতির স্থায়ী অংশ হয়ে ওঠে।

 

অন্যদিকে ব্রিটেনে রাগবি ও অ্যাসোসিয়েশন ফুটবলের পার্থক্য নিয়ে বিভ্রান্তি কমে যাওয়ায় “Football” শব্দটিই বেশি জনপ্রিয় হয়ে যায় এবং “Soccer” ধীরে ধীরে ব্যবহারের বাইরে চলে যেতে শুরু করে।

 

শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই নয়

অনেকে মনে করেন, ‘সকার’ কেবল আমেরিকানদের শব্দ। বাস্তবে বিষয়টি তা নয়। বর্তমানেও কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ও জাপানের বহু মানুষ খেলাটিকে “Soccer” নামে ডাকেন।

অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘদিন “Soccer Australia” নামের ফুটবল সংস্থা ছিল। পরে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে নাম পরিবর্তন করে “Football Australia” করা হয়।

 

জাপানে আজও জনপ্রিয় শব্দ “Sakka” (サッカー), যা মূলত “Soccer” থেকেই এসেছে।

 

কানাডায়ও “Football” এবং “Soccer”-দুই শব্দই প্রচলিত, কারণ সেখানে কানাডিয়ান ফুটবল নামের আরেকটি খেলা রয়েছে।

 

বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় ফুটবলের নাম

একই খেলা হলেও বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এর নাম ও উচ্চারণ ভিন্ন। স্প্যানিশ ভাষায় বলা হয় “Fútbol”, জার্মান ভাষায় “Fußball”, ফরাসি ভাষায় “Le Foot”, ইতালীয় ভাষায় “Calcio”, পর্তুগিজ ভাষায় “Futebol” এবং আরবি ভাষায় “Kurat al-Qadam”। নাম ভিন্ন হলেও খেলার প্রতি আবেগ, উন্মাদনা ও ভালোবাসা একই রয়ে গেছে।

 

বিশ্বকাপ ২০২৬ ও নতুন প্রজন্মের বিতর্ক

বিশ্বকাপ ২০২৬ প্রথমবারের মতো ৪৮ দলের আসর হিসেবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উত্তর আমেরিকায় আয়োজিত এই বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আবারও ‘ফুটবল বনাম সকার’ বিতর্ক নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইউরোপীয় ও আমেরিকান সমর্থকদের মধ্যে এ নিয়ে মজার তর্ক-বিতর্ক প্রায়ই দেখা যাচ্ছে। কেউ বলছেন “It's Football”, আবার কেউ বলছেন “It's Soccer”। তবে ভাষাবিদ ও ক্রীড়া ইতিহাসবিদদের মতে, দুই শব্দই ঐতিহাসিকভাবে সঠিক। পার্থক্য শুধু আঞ্চলিক ব্যবহারে।

 

ইতিহাসের সবচেয়ে মজার সত্য

আজ যেই শব্দটিকে অনেকে আমেরিকান সংস্কৃতির প্রতীক মনে করেন, সেই “Soccer” শব্দটির জন্ম হয়েছিল ইংল্যান্ডে। বরং ইংরেজরাই শব্দটি তৈরি করেছিলেন এবং কয়েক দশক ধরে নিজেরাই ব্যবহার করেছেন। পরে যুক্তরাষ্ট্র শব্দটি ধরে রেখেছে, আর ব্রিটেন ধীরে ধীরে “Football” শব্দটিকে এককভাবে গ্রহণ করেছে।

 

তাই বিশ্বকাপের উন্মাদনার এই সময়ে কেউ যদি বলেন, “সকার আমেরিকানদের বানানো শব্দ”, তাহলে ইতিহাসের তথ্য হাতে নিয়ে নিশ্চিন্তে বলা যায়-শব্দটির শিকড় আসলে ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে, আটলান্টিকের ওপারে নয়।

 

বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলার নাম নিয়ে বিতর্ক যতই থাকুক, একটি বিষয়ে সবাই একমত-ফুটবল হোক বা সকার, গোলের আনন্দ, আবেগ আর বিশ্বকাপের উন্মাদনার কোনো বিকল্প নেই।


সম্পর্কিত নিউজ