{{ news.section.title }}
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে দামি ১০ ফুটবলার কারা?
ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ শুধু মাঠের লড়াই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আসরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। ৪৮ দলের অংশগ্রহণে প্রথমবারের মতো তিন দেশ-যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত হচ্ছে এই টুর্নামেন্ট। বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এবারই প্রথম ১০৪টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী দর্শকসংখ্যাও অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে।
বিশ্বকাপ ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে মাঠের পারফরম্যান্সের পাশাপাশি খেলোয়াড়দের বিপুল আয় ও সম্পদের হিসাবও। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্যবসায়িক সাময়িকী Forbes সম্প্রতি বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া সবচেয়ে বেশি আয় করা ফুটবলারদের তালিকা প্রকাশ করেছে। সেখানে বেতন, বোনাস, স্পন্সরশিপ, বিজ্ঞাপন চুক্তি এবং বাণিজ্যিক আয় বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় রয়েছে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে এই প্রথম শতকোটিপতি (বিলিয়নিয়ার) দুই ফুটবলার একই আসরে অংশ নিচ্ছেন। তারা হলেন পর্তুগালের অধিনায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো এবং আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বিশ্ব ফুটবল শাসন করা এই দুই তারকা এখনও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে রয়েছেন।
১০. হ্যারি কেইন (ইংল্যান্ড) - আয় ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার
এবারের বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া ফুটবলারদের মধ্যে সর্বোচ্চ আয়ের তালিকায় দশম স্থানে আছেন হ্যারি কেইন। জার্মান ক্লাব বায়ার্ন মিউনিখের এই ইংলিশ স্ট্রাইকার ইংল্যান্ডের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। তিনি জাতীয় দলের হয়ে ১১৩ ম্যাচে ৭৯টি গোল করেছেন। গত ১২ মাসে তাঁর মোট আয় ছিল প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
২০২৪ ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোল করে তিনি গোল্ডেন বুট জিতেছিলেন। ৩২ বছর বয়সী কেইন সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ প্রস্তুতি ম্যাচেও গোল করেছেন। ইএসপিএনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ক্লাব ও দেশের হয়ে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩২, যা বিশ্বের অন্য যেকোনো ফুটবলারের চেয়ে ১৪টি বেশি।
৯. লামিনে ইয়ামাল (স্পেন) - আয় ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার
হ্যামস্ট্রিং চোটের কারণে বার্সেলোনার হয়ে লা লিগার মৌসুমের শেষ অংশে খেলতে পারেননি ইয়ামাল। তবে মে মাসের শেষ দিকে তিনি স্পেন জাতীয় দলের অনুশীলনে ফেরেন। এরপরও তাঁর বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ নিয়ে বার্সেলোনা কঠোর শর্ত আরোপ করেছে বলে জানিয়েছে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম এএস।
ধারণা করা হচ্ছে, কেপ ভার্দের বিপক্ষে স্পেনের প্রথম প্রস্তুতি ম্যাচে তিনি মাত্র ১৫ মিনিট খেলতে পারেন। পরের সপ্তাহে সৌদি আরবের বিপক্ষে তাঁর খেলার সময় সর্বোচ্চ ৬০ মিনিট পর্যন্ত সীমিত থাকতে পারে।
তবে মাঠের সময় সীমিত হলেও বিজ্ঞাপন ও প্রচারণায় তাঁর উপস্থিতি অব্যাহত থাকবে। জানুয়ারিতে তিনি আমেরিকান ইগলের সঙ্গে চুক্তি করেন। পাশাপাশি কোকা-কোলা, ম্যাকডোনাল্ডস, পাওয়ারেড এবং ভিসার বিশ্বকাপ ক্যাম্পেইনেও তাঁকে দেখা যাবে। গত এক বছরে তাঁর মোট আয় ছিল প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার।
৮. জুড বেলিংহাম (ইংল্যান্ড) - আয় ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার
এমবাপ্পে ও ভিনিসিয়ুসের সঙ্গে রিয়াল মাদ্রিদের তিন শীর্ষ খেলোয়াড়ের একজন হিসেবে বিবেচিত জুড বেলিংহামও বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ আয় করা ফুটবলারদের তালিকায় আছেন। ২৩ বছর বয়সে পৌঁছাতে তাঁর এখনো কয়েক সপ্তাহ বাকি। গত ১২ মাসে তাঁর আয় ছিল প্রায় ৪ কোটি ৪০ লাখ ডলার।
২০২২ বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ছিলেন এই মিডফিল্ডার। গ্রুপ পর্বে ইরানের বিপক্ষে গোল করে তিনি ইংল্যান্ডের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বকনিষ্ঠ বিশ্বকাপ গোলদাতা হন। এরপর শেষ ষোলোতে একটি অ্যাসিস্টও করেন তিনি। পরে ১০ কোটি ডলারের ট্রান্সফার ফিতে বরুসিয়া ডর্টমুন্ড থেকে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন বেলিংহাম।
৭. সাদিও মানে (সেনেগাল) - আয় ৫ কোটি ৪০ লাখ ডলার
আফ্রিকার অন্যতম সেরা ফুটবলার সাদিও মানে এখনও সেনেগালের সবচেয়ে বড় তারকা। লিভারপুলে সফল সময় কাটানোর পর বর্তমানে সৌদি আরবের ক্লাব ফুটবলে খেলছেন তিনি। সামাজিক কাজ, দাতব্য কার্যক্রম এবং নিজ দেশের উন্নয়নে বিনিয়োগের কারণে মানে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত। ২০২২ বিশ্বকাপ মিস করার পর এবার বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমাণের সুযোগ পাচ্ছেন তিনি।
৬. মোহাম্মদ সালাহ (মিসর) - আয় ৫ কোটি ৫০ লাখ ডলার
আফ্রিকান ফুটবলের আরেক সুপারস্টার মোহাম্মদ সালাহ। লিভারপুলের ইতিহাসের অন্যতম সফল খেলোয়াড় হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মিসরের ফুটবল ইতিহাসেও তিনি অন্যতম সেরা তারকা। বিশ্বকাপের মঞ্চে এবার তাঁর ওপরই সবচেয়ে বেশি প্রত্যাশা। মাঠের বাইরে অসংখ্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে চুক্তির কারণে তাঁর আয়ও দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
৫. ভিনিসিয়ুস জুনিয়র (ব্রাজিল) - আয় ৬ কোটি ডলার
রিয়াল মাদ্রিদ ও ব্রাজিল জাতীয় দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবলার ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। তাঁর গতি, ড্রিবলিং এবং আক্রমণাত্মক ফুটবল বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে ব্রাজিলের শিরোপা সম্ভাবনা নিয়ে কিছু সতর্ক মন্তব্য করেছেন তিনি, তবুও বিশ্বকাপের অন্যতম আকর্ষণীয় তারকা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। নাইকি ও একাধিক বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর বড় চুক্তি রয়েছে।
৪. আর্লিং হলান্ড (নরওয়ে) - আয় ৮ কোটি ডলার
গত বছর ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে রেকর্ড অঙ্কের নতুন চুক্তি করেন নরওয়ের আর্লিং হলান্ড। তবুও তাঁকে দলে ভেড়ানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রিয়াল মাদ্রিদ। জ্বালানি খাতের উদ্যোক্তা এনরিকে রিকেলমে গত সপ্তাহে প্রতিশ্রুতি দেন, তিনি রিয়ালের প্রেসিডেন্ট হলে ২৫ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকারকে দলে নেবেন। এ বিষয়টি ঘিরে ম্যানচেস্টার সিটি আইনি পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছে। গত ১২ মাসে তাঁর আয় ছিল প্রায় ৮ কোটি ডলার।
অন্যদিকে, ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে খেলছে নরওয়ে। আশ্চর্যের বিষয়, সেই ১৯৯৮ সালে আর্লিং হলান্ডের জন্মই হয়নি।
৩. কিলিয়ান এমবাপ্পে (ফ্রান্স) - আয় ৯ কোটি ৫০ লাখ ডলার
ফরাসি সুপারস্টার কিলিয়ান এমবাপ্পে ইতোমধ্যে বিশ্বকাপজয়ী এবং বিশ্বকাপ ফাইনালে হ্যাটট্রিক করা বিরল খেলোয়াড়দের একজন। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই তিনি আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাদের কাতারে পৌঁছে গেছেন। রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেওয়ার পর তাঁর বাণিজ্যিক মূল্য আরও বেড়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আগামী দশকের বিশ্ব ফুটবলের মুখ হতে পারেন এমবাপ্পে।
২. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) - আয় ১৪ কোটি ডলার
আটবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী লিওনেল মেসি বিশ্বকাপের বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ২০২২ সালে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর বিশ্বকাপ জয়ের মাধ্যমে নিজের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা পূরণ করেন তিনি। এবার রেকর্ড ষষ্ঠ বিশ্বকাপ খেলছেন মেসি। বিশ্বকাপে আরও কয়েকটি গোল করতে পারলে সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকাতেও নতুন ইতিহাস গড়তে পারেন তিনি।
মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি অ্যাডিডাস, অ্যাপল, পেপসি এবং একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর বহুমূল্যের চুক্তি রয়েছে। তাঁর মোট সম্পদের পরিমাণ ইতোমধ্যে ১.১ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে বলে ফোর্বসের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১. ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল) - আয় ৩০ কোটি ডলার
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর সবচেয়ে বেশি আয় করা ফুটবলার এবং বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্রীড়াবিদ ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। গত ১২ মাসে তাঁর মোট আয় প্রায় ৩০ কোটি ডলার, যা তালিকার অন্য সবার তুলনায় অনেক বেশি।
সৌদি আরবের আল নাসরের সঙ্গে তাঁর চুক্তি, বিশাল স্পন্সরশিপ পোর্টফোলিও, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি অনুসারী থাকা ক্রীড়াবিদ হওয়ার রেকর্ড এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক বিনিয়োগ তাঁকে ক্রীড়া ইতিহাসের অন্যতম সফল ব্র্যান্ডে পরিণত করেছে।
রোনালদো পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এবং পাঁচবারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ বিজয়ী। যদিও এখনও বিশ্বকাপ শিরোপা তাঁর অধরা, তবুও গোলসংখ্যা, জনপ্রিয়তা এবং আয়-সব দিক থেকেই তিনি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব।
বিশ্বকাপের অর্থনীতিও নতুন উচ্চতায়
বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু খেলাধুলার আসর নয়, এটি একটি বিশাল বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। খেলোয়াড়দের বেতন, সম্প্রচারস্বত্ব, স্পন্সরশিপ, টিকিট বিক্রি এবং ডিজিটাল কনটেন্ট থেকে আয়-সব মিলিয়ে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ও বাণিজ্যিকভাবে সফল বিশ্বকাপ হওয়ার পথে রয়েছে।
রোনালদো ও মেসির মতো কিংবদন্তিদের শেষ বিশ্বকাপ, এমবাপ্পে-হলান্ড-ইয়ামাল-বেলিংহামের মতো নতুন প্রজন্মের তারকাদের উত্থান এবং রেকর্ডসংখ্যক দর্শকের আগ্রহ-সব মিলিয়ে বিশ্বকাপ ২০২৬ শুধু মাঠের লড়াই নয়, বরং ফুটবল অর্থনীতিরও এক নতুন যুগের সূচনা করছে।
তথ্যসূত্র: ফোর্বস