{{ news.section.title }}
বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডের দ্বারপ্রান্তে এমবাপ্পে
বিশ্বকাপ এলেই যেন অন্য এক কিলিয়ান এমবাপ্পেকে দেখা যায়। ক্লাব ফুটবলে তিনি বহু রেকর্ডের মালিক, কিন্তু বিশ্বকাপের মঞ্চে তাঁর পারফরম্যান্স যেন আরও ভয়ংকর। ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সেনেগালের বিপক্ষে ফ্রান্সের প্রথম ম্যাচেও সেই চেনা দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটল। জোড়া গোল করে শুধু দলকে জয়ই এনে দেননি, একই সঙ্গে ভেঙেছেন ফ্রান্স জাতীয় দলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ডও।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত গ্রুপ ‘আই’-এর ম্যাচে সেনেগালকে ৩–১ গোলে হারিয়েছে ফ্রান্স। প্রথমার্ধে গোলশূন্য থাকা ম্যাচে বিরতির পর যেন সম্পূর্ণ বদলে যায় দিদিয়ের দেশমের দল। আর সেই রূপান্তরের মূল কারিগর ছিলেন অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে।
প্রথমার্ধে খেলা দেখে মনে হচ্ছিল না, ফ্রান্সের মতো তারকাখচিত একটি দল মাঠে রয়েছে। কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসে, অরেলিয়েন চুয়ামেনি কিংবা দেজিরে দুয়ের মতো তারকাদের নিয়েও নিজেদের স্বাভাবিক ছন্দ খুঁজে পাচ্ছিল না তারা। বরং আফ্রিকার অন্যতম শক্তিশালী দল সেনেগাল কয়েকটি বিপজ্জনক আক্রমণ গড়ে ফরাসি রক্ষণকে ব্যস্ত রেখেছিল।
সেনেগালের গোলরক্ষক এদুয়ার্দো মেন্দিও ছিলেন দুর্দান্ত। প্রথমার্ধে তাঁর একাধিক সেভ ফ্রান্সকে গোলবঞ্চিত রাখে। ফলে বিরতিতে দুই দলই মাঠ ছাড়ে গোলশূন্য সমতা নিয়ে।
কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সম্পূর্ণ বদলে যায় ম্যাচের চিত্র।
৬৬তম মিনিটে মাইকেল ওলিসের অসাধারণ এক পাস থেকে গোল করে ফ্রান্সকে এগিয়ে দেন এমবাপ্পে। ডান প্রান্ত থেকে সেনেগালের ডিফেন্স চিরে দেওয়া ওলিসের সেই পাস এবং এমবাপ্পের নিখুঁত ফিনিশিং ছিল বিশ্বমানের। গোলটি করার মধ্য দিয়ে এমবাপ্পে ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় অলিভিয়ের জিরুর ৫৭ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন। এই গোলের পর ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে নেয় ফ্রান্স। মাঝমাঠে আধিপত্য বিস্তার করে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তারা।
৮২ মিনিটে বদলি হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র তিন মিনিটের মধ্যেই গোল করেন ব্র্যাডলি বারকোলা। দ্রুতগতির এক আক্রমণ থেকে পাওয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যবধান ২–০ করেন তরুণ এই ফরোয়ার্ড। বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি ছিল তাঁর প্রথম গোল।ম্যাচের যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে সেনেগালের হয়ে একটি গোল শোধ করেন ইব্রাহিম এমবায়ে। এতে ম্যাচে সামান্য উত্তেজনা ফিরে আসে। তবে সেই উত্তেজনা বেশিক্ষণ স্থায়ী হতে দেননি এমবাপ্পে।
গোল হজমের কয়েক মুহূর্ত পর বক্সের বাইরে থেকে দুর্দান্ত এক শটে বল জড়িয়ে দেন জালে। দর্শকদের চোখ ধাঁধানো সেই গোল শুধু ম্যাচের জয় নিশ্চিত করেনি, একই সঙ্গে ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখেছে। এই গোলের মাধ্যমে ফ্রান্সের জার্সিতে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ৫৮-তে। ফলে ৫৭ গোল নিয়ে এতদিন শীর্ষে থাকা অলিভিয়ের জিরুকে পেছনে ফেলে ফ্রান্স জাতীয় দলের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন কিলিয়ান এমবাপ্পে।
আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই রেকর্ড গড়তে তিনি খেলেছেন মাত্র ৯৯টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ। অন্যদিকে জিরুর প্রয়োজন হয়েছিল ১৩৭ ম্যাচ। ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, এমবাপ্পের ক্যারিয়ার যে গতিতে এগোচ্ছে, তাতে এই রেকর্ড ভবিষ্যতে আরও অনেক দূর নিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে তাঁর সামনে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসেও দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছেন ফরাসি অধিনায়ক। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোলের পর বিশ্বকাপে তাঁর মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৪-তে। এর ফলে বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোলদাতাদের তালিকায় নিজের অবস্থান আরও শক্ত করেছেন তিনি।
বর্তমানে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসা। চারটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তাঁর গোলসংখ্যা ১৬। অর্থাৎ ক্লোসার রেকর্ড স্পর্শ করতে এমবাপ্পের প্রয়োজন মাত্র দুই গোল এবং এককভাবে রেকর্ড নিজের করে নিতে প্রয়োজন তিন গোল।
ফিফার ঐতিহাসিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতাদের তালিকায় ক্লোসার পর রয়েছেন ব্রাজিলের রোনালদো নাজারিও (১৫), জার্মানির জার্ড মুলার (১৪), ফ্রান্সের জুস্ত ফঁতেন (১৩) এবং ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলে (১২)। মাত্র ২৭ বছর বয়সেই এমবাপ্পে ইতোমধ্যে এই তালিকার অনেক কিংবদন্তিকে ছাড়িয়ে গেছেন।
বিশ্বকাপে এমবাপ্পের উত্থান শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে রাশিয়ায়। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফ্রান্সকে বিশ্বকাপ জেতানোর পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফাইনালে হ্যাটট্রিক করে ফুটবল বিশ্বকে বিস্মিত করেন। যদিও সেবার ফ্রান্স শিরোপা হারায় আর্জেন্টিনার কাছে।
ফুটবল পরিসংখ্যান প্রতিষ্ঠান Opta এবং FIFA-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপের নকআউট পর্ব ও বড় ম্যাচগুলোতে গত এক দশকে এমবাপ্পের মতো ধারাবাহিক প্রভাব খুব কম ফুটবলারই রাখতে পেরেছেন।
রেকর্ড গড়া গোলের পরপরই শুভেচ্ছাবার্তা আসে অলিভিয়ের জিরুর কাছ থেকেও। বিবিসি ওয়ানের বিশ্বকাপ সম্প্রচারে বিশ্লেষকের দায়িত্ব পালন করা জিরু বলেন, “অভিনন্দন কিলিয়ান। আমি খুব খুশি। এটা প্রত্যাশিতই ছিল। সে সব রেকর্ড ভেঙে দেবে। জাতীয় দলের হয়ে সর্বোচ্চ ম্যাচ খেলার রেকর্ডও ভাঙবে, গোলের রেকর্ডও ভাঙবে। আমার মনে হয় সে সহজেই ১০০ গোল করতে পারবে। এমনকি বিশ্বকাপে মিরোস্লাভ ক্লোসার রেকর্ডও ভেঙে ফেলতে পারবে।”
জিরু আরও বলেন, “বড় ম্যাচগুলোতে সে সব সময় নিজের সেরাটা দেয়। বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে সে অন্য উচ্চতায় উঠে যায়।”
বর্তমান ফুটবলে বড় ম্যাচের খেলোয়াড় হিসেবে এমবাপ্পের সুনাম দিন দিন আরও শক্তিশালী হচ্ছে। বিশ্বকাপ, ইউরো কিংবা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ-চাপের মুহূর্তে নিজের সেরাটা বের করে আনার বিরল ক্ষমতা রয়েছে তাঁর মধ্যে। এদিকে এই জয়ের মাধ্যমে বিশ্বকাপ অভিযানও দুর্দান্তভাবে শুরু করল ফ্রান্স। শক্তিশালী স্কোয়াড, অভিজ্ঞ কোচ দিদিয়ের দেশম এবং দুর্দান্ত ফর্মে থাকা এমবাপ্পেকে নিয়ে শিরোপার অন্যতম দাবিদার হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে লে ব্লুদের।
গ্রুপ পর্বে ফ্রান্সের পরবর্তী ম্যাচ ২২ জুন ইরাকের বিপক্ষে। বর্তমান ফর্ম বিবেচনায় অনেকেরই ধারণা, সেই ম্যাচেই হয়তো বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার রেকর্ড স্পর্শ কিংবা ভেঙে নতুন অধ্যায় লিখতে পারেন কিলিয়ান এমবাপ্পে। ফ্রান্সের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার মুকুট এখন তাঁর মাথায়। আর বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার সিংহাসনও যে খুব দূরে নয়, নিউ জার্সির রাতেই সেটির আরও শক্ত প্রমাণ দিলেন ফুটবল বিশ্বের এই মহাতারকা।