{{ news.section.title }}
মুখে মাস্ক পরে খেললেন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক, কারণ কী?
চলতি ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শুরুতেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছেন আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বহুল প্রতীক্ষিত ম্যাচে মুখে কালো সুরক্ষামূলক মাস্ক পরে মাঠে নামেন তিনি। ম্যাচ চলাকালে ক্যামেরা বারবার তার দিকে ঘুরে যাওয়ায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শুরু হয় ব্যাপক আলোচনা। অনেক দর্শক প্রথমে বিষয়টিকে ব্যতিক্রমধর্মী স্টাইল বা ব্যক্তিগত পছন্দ ভেবেছিলেন। তবে বাস্তবে এর পেছনে রয়েছে গুরুতর একটি চোট এবং চিকিৎসকদের বিশেষ পরামর্শ।
বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে খেলতে হলে খেলোয়াড়দের শারীরিকভাবে শতভাগ ফিট থাকা জরুরি। কিন্তু লুকা জিদানের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলের শেষ দিকে স্প্যানিশ ক্লাব গ্রানাডার হয়ে একটি লিগ ম্যাচে খেলতে গিয়ে প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের সঙ্গে সংঘর্ষে মুখে গুরুতর আঘাত পান তিনি। সংঘর্ষের ফলে তার চোয়াল এবং থুতনির অংশে ফ্র্যাকচার ধরা পড়ে।
সাধারণত এ ধরনের চোটে খেলোয়াড়দের দীর্ঘ সময় মাঠের বাইরে থাকতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার এবং কয়েক মাসের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রয়োজন পড়ে। তবে সামনে বিশ্বকাপ থাকায় এবং জাতীয় দলের হয়ে খেলার সুযোগ হাতছাড়া না করতে চাওয়ায় লুকা জিদান চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করে বিকল্প পথ বেছে নেন।
বিশেষ কার্বন ফাইবার মাস্কের ব্যবহার
চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে তার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয় একটি কার্বন ফাইবার ফেস মাস্ক। এই মাস্কের মূল উদ্দেশ্য হলো আঘাতপ্রাপ্ত চোয়াল ও মুখের হাড়কে সুরক্ষা দেওয়া।
মাস্কটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে নতুন করে কোনো সংঘর্ষ হলে আঘাতের চাপ সরাসরি ফ্র্যাকচার হওয়া অংশে না পড়ে। বরং চাপ পুরো মাস্কের কাঠামোতে ছড়িয়ে যায়। এর ফলে হাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ কম পড়ে এবং পুনরায় গুরুতর চোট পাওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখের হাড়ে ফ্র্যাকচার নিয়ে খেলতে হলে এমন সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা প্রায় অপরিহার্য। কারণ গোলরক্ষকদের প্রায়ই প্রতিপক্ষের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে হয় এবং বল প্রতিহত করার সময় মাথা ও মুখে আঘাত লাগার সম্ভাবনাও বেশি থাকে।
ফিফার নিয়মে কি মাস্ক পরে খেলা যায়?
অনেক দর্শকের মনেই প্রশ্ন উঠেছে, ফিফার ম্যাচে এমন মাস্ক পরে খেলার অনুমতি কীভাবে পাওয়া যায়?
ফিফার নিয়ম অনুযায়ী, কোনো খেলোয়াড় চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনের কারণে সুরক্ষামূলক মুখোশ বা মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন। তবে সেটি অবশ্যই নিরাপদ হতে হবে এবং অন্য খেলোয়াড়দের জন্য ঝুঁকির কারণ হওয়া যাবে না।
ফিফা ও আন্তর্জাতিক ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বোর্ড (IFAB)-এর নিয়ম অনুযায়ী, মাস্কটি নরম বা নিরাপদ উপাদানে তৈরি হতে হবে কিংবা এমনভাবে ডিজাইন করা থাকতে হবে যাতে সংঘর্ষে অন্য কারও ক্ষতি না হয়। ম্যাচ শুরুর আগে রেফারি ও ম্যাচ কর্মকর্তারা সেটি পরীক্ষা করে অনুমোদন দেন।
বিশ্ব ফুটবলে এর আগেও এমন ঘটনা দেখা গেছে। জার্মানির আন্তোনিও রুডিগার, দক্ষিণ কোরিয়ার সন হিউং-মিন, ক্রোয়েশিয়ার যোশকো গভার্দিওলসহ অনেক তারকা ফুটবলার মুখে সুরক্ষামূলক মাস্ক পরে আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন।
আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কঠিন পরীক্ষায় লুকা
বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই লুকা জিদানের সামনে ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। প্রতিপক্ষ হিসেবে ছিলেন লিওনেল মেসির নেতৃত্বাধীন আর্জেন্টিনা। পুরো ম্যাচজুড়েই আর্জেন্টাইন আক্রমণ সামাল দিতে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে তাকে। যদিও শেষ পর্যন্ত মেসির হ্যাটট্রিকের সামনে আলজেরিয়া ৩-০ গোলে পরাজিত হয়, তবুও ম্যাচজুড়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সেভ করে আলোচনায় আসেন লুকা। বিশেষ করে প্রথমার্ধে কয়েকটি আক্রমণ প্রতিহত করে তিনি আলজেরিয়াকে বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়া থেকে বাঁচান।
ফ্রান্সে জন্ম, হৃদয়ে আলজেরিয়া
লুকা জিদানের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার নিয়েও রয়েছে আলাদা আগ্রহ। ফ্রান্সে জন্মগ্রহণ করলেও তার পারিবারিক শিকড় আলজেরিয়ায়। পরিবারের পূর্বসূরিদের স্মৃতি এবং নিজের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে আলজেরিয়ার প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন। বিশ্লেষকদের মতে, আলজেরিয়ান সমর্থকদের কাছে তিনি শুধু একজন গোলরক্ষক নন, বরং প্রবাসী আলজেরিয়ানদের প্রতিনিধিত্বকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকও।
বিশ্বকাপে সাহসিকতার প্রতীক
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অনেক খেলোয়াড় চোট নিয়েও দেশের জন্য লড়েছেন। লুকা জিদানের গল্পও এখন সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে। মুখের হাড়ে ফ্র্যাকচার, অস্ত্রোপচার পিছিয়ে দেওয়া, বিশেষ সুরক্ষামূলক মাস্ক ব্যবহার এবং তারপরও বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফুটবল আসরে নিজের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করা-সব মিলিয়ে তিনি ইতোমধ্যেই আলজেরিয়ার সমর্থকদের কাছে সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের এক প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
কালো মাস্কটি তাই শুধু একটি সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম নয়; এটি লুকা জিদানের বিশ্বকাপ খেলার অদম্য ইচ্ছা, পেশাদারিত্ব এবং জাতীয় দলের প্রতি তার দায়বদ্ধতারও প্রতীক।