{{ news.section.title }}
মিনাব হামলায় নিহত ১৬৮ শিক্ষার্থীকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দাঁড়িয়ে স্মরণ ইরানের
বিশ্বকাপ ২০২৬-এর গ্রুপ ‘জি’-তে নিজেদের প্রথম ম্যাচে দারুণ প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে ইরান। দুইবার পিছিয়ে পড়েও হাল না ছেড়ে শেষ পর্যন্ত নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ২-২ গোলের ড্র নিয়ে মাঠ ছেড়েছে মেহদি তারেমির দল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলেসে অবস্থিত সোফি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচটি ছিল আবেগ, নাটকীয়তা এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের এক অনন্য মিশ্রণ।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের আগেই নানা বিতর্ক ও রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ছিল ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্কের কারণে দলটির অংশগ্রহণ নিয়েও অনিশ্চয়তার আলোচনা ছিল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত সব বাধা পেরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেই বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করে তারা।
ম্যাচের শুরুতে বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণে আধিপত্য দেখিয়েছিল ইরান। কিক-অফের পর থেকেই একের পর এক আক্রমণ শানিয়ে নিউজিল্যান্ডকে চাপে ফেলে দেয় দলটি। কিন্তু খেলার ধারার বিপরীতে ৫ মিনিটেই এগিয়ে যায় অল হোয়াইটসরা। ক্রিস উডদের দ্রুত আক্রমণ থেকে সুযোগ পেয়ে এলিজাহ জাস্ট ইরানের জালে বল পাঠালে প্রথম ধাক্কা খায় এশিয়ার প্রতিনিধিরা।
গোল হজমের পরও আক্রমণ থামায়নি ইরান। ১৬তম আন্তর্জাতিক গোলের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিলেন মেহদি তারেমি। দুর্দান্ত এক পাল্টা আক্রমণে গোলরক্ষককে পরাস্ত করলেও তার শট গিয়ে আঘাত করে বারপোস্টে। কিছুক্ষণ পর ফাঁকা জাল পেয়েও সমতায় ফিরতে ব্যর্থ হয় ইরান।
অবশেষে ৩২ মিনিটে কাঙ্ক্ষিত গোল আসে। বক্সের ভেতরে সৃষ্ট জটলার মধ্যে বল পেয়ে অভিজ্ঞ রামিন রেজাইয়ান নিখুঁত ফিনিশে ম্যাচে সমতা ফেরান। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আলি নেমাতি বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোলটি বাতিল হয়। ফলে ১-১ সমতা নিয়েই বিরতিতে যায় দুই দল।
দ্বিতীয়ার্ধে আবারও আঘাত হানে নিউজিল্যান্ড। ৫৫ মিনিটে এলিজাহ জাস্ট নিজের দ্বিতীয় গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। তবে এবারও দ্রুত জবাব দেয় ইরান। মাত্র আট মিনিট পর রামিন রেজাইয়ানের দারুণ ক্রস থেকে মোহাম্মদ মুহিবি হেডে বল জালে পাঠিয়ে স্কোরলাইন ২-২ করেন।
শেষ প্রায় আধঘণ্টা দুই দলই জয়ের জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। একের পর এক আক্রমণ, দ্রুত পাল্টা আক্রমণ এবং গোলের সুযোগ তৈরি হলেও আর কোনো দলই জালের দেখা পায়নি। ফলে রুদ্ধশ্বাস লড়াই শেষে পয়েন্ট ভাগাভাগি করেই মাঠ ছাড়ে দুই দল।
লস অ্যাঞ্জেলেসে যেন ‘তেহরানজেলেস’
ম্যাচটির আরেকটি বড় আলোচনার বিষয় ছিল গ্যালারির পরিবেশ। যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইরানি প্রবাসী সম্প্রদায়ের একটি বসবাস করে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর বিপুলসংখ্যক ইরানি এই শহরে বসতি গড়েন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরটি ‘তেহরানজেলেস’ নামেও পরিচিতি পায়।
সোফি স্টেডিয়ামের প্রায় ৫০ হাজারের বেশি দর্শকের বড় অংশই ছিলেন ইরানি সমর্থক। জাতীয় পতাকা, ব্যানার এবং স্লোগানে তারা পুরো স্টেডিয়ামকে ইরানের ঘরের মাঠে পরিণত করেছিলেন। রামিন রেজাইয়ানের সমতাসূচক গোলের পর গ্যালারির উল্লাসে মুহূর্তের জন্য মনে হচ্ছিল ম্যাচটি যেন লস অ্যাঞ্জেলেসে নয়, তেহরানের বিখ্যাত আজাদি স্টেডিয়ামেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
মিনাবের ১৬৮ শিক্ষার্থীর স্মরণ
ম্যাচে আবেগঘন একটি দৃশ্যও দেখা গেছে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের শাহজারেহ তাইয়েবেহ স্কুলে নিহত ১৬৮ শিক্ষার্থীর স্মরণে বিশেষ ব্যানার প্রদর্শন করেন সমর্থকেরা।
ইরানি ফুটবল দলের খেলোয়াড়রাও বিশ্বকাপ যাত্রার সময় নিজেদের আনুষ্ঠানিক পোশাকে সেই নিহত শিক্ষার্থীদের স্মরণে বিশেষ ব্যাজ ধারণ করেছিলেন। ম্যাচের আগে অধিনায়ক মেহদি তাজ জানান, এই শিশুদের স্মৃতি জাতির হৃদয়ে চিরস্থায়ী হয়ে থাকবে। সোফি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বড় অক্ষরে লেখা ‘MINAB 168’ ব্যানারটি ম্যাচজুড়ে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। খেলাধুলার মঞ্চে মানবিক এই বার্তাটি ইরানি সমর্থকদের আবেগকে আরও গভীরভাবে তুলে ধরে।
গ্রুপের সমীকরণ
এই ড্রয়ের ফলে গ্রুপ ‘জি’-তে ইরান ও নিউজিল্যান্ড উভয় দলই একটি করে পয়েন্ট নিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করল। দুইবার পিছিয়ে পড়েও ফিরে আসার মানসিকতা ইরানকে আত্মবিশ্বাস দেবে, অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিপক্ষে লড়াকু পারফরম্যান্স নিউজিল্যান্ডের জন্যও ইতিবাচক বার্তা হয়ে থাকবে।
বিশ্বকাপের দীর্ঘ যাত্রায় এই ম্যাচটি হয়তো শুধু একটি ড্র হিসেবেই পরিসংখ্যানে থাকবে। কিন্তু মাঠের লড়াই, গ্যালারির আবেগ, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং মিনাবের শিশুদের স্মরণ—সব মিলিয়ে এটি ছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের অন্যতম স্মরণীয় এক রাত।