৬৮ বছর পর আবারও বিশ্বকাপে একদিনে সব ম্যাচ ড্র

৬৮ বছর পর আবারও বিশ্বকাপে একদিনে সব ম্যাচ ড্র
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই নতুন ইতিহাস, অপ্রত্যাশিত ফলাফল আর রোমাঞ্চে ভরপুর লড়াই। তবে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপে সোমবারের (স্থানীয় সময়) ম্যাচগুলো এমন এক বিরল রেকর্ডের জন্ম দিয়েছে, যা গত ৬৮ বছর ধরে আর দেখা যায়নি। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নয়, তবে দীর্ঘ প্রায় সাত দশক পর আবারও একদিনে অনুষ্ঠিত চারটি ম্যাচের সবকটিই ড্র হয়েছে।

দিনের প্রথম ম্যাচে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন গোলশূন্য ড্র করে আফ্রিকার উদীয়মান দল কেপ ভার্দের সঙ্গে। দ্বিতীয় ম্যাচে ইউরোপের অন্যতম শক্তিশালী দল বেলজিয়ামকে ১-১ গোলে আটকে দেয় মিশর। এরপর সৌদি আরব ও উরুগুয়ের মধ্যকার ম্যাচও ১-১ গোলে সমতায় শেষ হয়। আর দিনের শেষ ম্যাচে ইরান ও নিউজিল্যান্ড চার গোলের রোমাঞ্চকর লড়াইয়ে ২-২ গোলে ড্র করে।

 

একদিনে চারটি ম্যাচ, কিন্তু কোনো দলই জয় তুলে নিতে পারেনি-এমন দৃশ্য বিশ্বকাপ ইতিহাসে অত্যন্ত বিরল। পরিসংখ্যানবিদদের মতে, সর্বশেষ ১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে এমন ঘটনা ঘটেছিল। এরপর ১৯৬২ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ১৬টি বিশ্বকাপের কোনো একদিনেও অন্তত চারটি ম্যাচ একসঙ্গে ড্র হওয়ার নজির দেখা যায়নি।

 

১৯৫৮ সালের পর প্রথমবার

১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম স্মরণীয় আসর। ওই বিশ্বকাপেই বিশ্ব ফুটবল প্রথমবারের মতো ১৭ বছর বয়সী পেলের আবির্ভাব দেখেছিল। ব্রাজিলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের সেই আসরে একদিনে অনুষ্ঠিত চারটি ম্যাচই ড্র হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৬৮ বছর কেটে গেলেও বিশ্বকাপে এমন ঘটনা আর ঘটেনি।

 

ফুটবল ইতিহাসবিদদের মতে, আধুনিক ফুটবলে কৌশলগত উন্নয়ন, ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (VAR), উন্নত ফিটনেস এবং আক্রমণাত্মক ফুটবলের কারণে সাধারণত ম্যাচে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। তাই একই দিনে চারটি ম্যাচের সবকটিই ড্র হওয়া আরও বেশি বিস্ময়কর।

 

স্পেনকে হতাশ করল কেপ ভার্দে

দিনের শুরুতেই সবচেয়ে বড় চমক উপহার দেয় কেপ ভার্দে। বলের দখল ও আক্রমণে স্পেন এগিয়ে থাকলেও গোলের দেখা পায়নি। কেপ ভার্দের শৃঙ্খলাবদ্ধ রক্ষণভাগ এবং গোলরক্ষকের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স স্পেনকে হতাশ করে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি ড্র নয়; বরং বিশ্বকাপে আফ্রিকান দলগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তিরও প্রতিফলন।

 

বেলজিয়ামকে আটকাল মিশর

মোহাম্মদ সালাহর নেতৃত্বে মিশর বেলজিয়ামের বিপক্ষে আত্মবিশ্বাসী ফুটবল উপহার দেয়। ম্যাচে দুই দলই একটি করে গোল করলেও শেষ পর্যন্ত জয় পায়নি কেউ। বেলজিয়ামের তারকা খেলোয়াড়দের একাধিক আক্রমণ ব্যর্থ করে মিশর গুরুত্বপূর্ণ এক পয়েন্ট তুলে নেয়।

 

সৌদি আরবের ধারাবাহিক চমক

গত কয়েক বছরে সৌদি আরব বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। ২০২২ বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে হারানোর পর থেকেই দলটি বড় প্রতিপক্ষদের জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। সেই ধারাবাহিকতায় এবার উরুগুয়ের মতো ঐতিহ্যবাহী দলের বিপক্ষেও তারা হার এড়িয়েছে। ১-১ গোলে শেষ হওয়া ম্যাচটি ছিল কৌশল, শারীরিক লড়াই এবং পাল্টা আক্রমণের এক দারুণ উদাহরণ।

 

ইরান-নিউজিল্যান্ড ম্যাচে দিনের সেরা নাটক

দিনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচটি ছিল ইরান ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যে। দুইবার পিছিয়ে পড়েও ম্যাচে ফিরে আসে ইরান। শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র হয় ম্যাচটি। অভিজ্ঞ ফুটবলার রামিন রেজাইয়ান গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে অবদান রেখে ম্যাচের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ে পরিণত হন। ম্যাচটি শুধু ফলাফলের কারণে নয়, বরং গ্যালারির অসাধারণ পরিবেশ ও সমর্থকদের উপস্থিতির কারণেও বিশেষ আলোচনায় এসেছে।

 

নতুন ৪৮ দলের বিশ্বকাপ কি বদলে দিচ্ছে সমীকরণ?

বিশ্লেষকদের বড় একটি অংশ মনে করছেন, ২০২৬ বিশ্বকাপের নতুন ৪৮ দলের ফরম্যাট ফুটবলের প্রতিযোগিতাকে আরও ভারসাম্যপূর্ণ করেছে। আগে যেখানে বড় দলগুলো সহজেই ছোট দলগুলোর বিপক্ষে জয় পেত, এখন সেই ব্যবধান অনেকটাই কমে এসেছে।

 

আফ্রিকা, এশিয়া, উত্তর আমেরিকা ও ওশেনিয়ার দলগুলো আগের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত, ফিট এবং কৌশলগতভাবে পরিণত। ফলে স্পেন, বেলজিয়াম কিংবা উরুগুয়ের মতো দলগুলোকেও এখন প্রতিটি ম্যাচে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সোমবারের চারটি ড্র ম্যাচ সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

 

গ্রুপপর্বে বাড়ছে উত্তেজনা

একদিনে চারটি ম্যাচ ড্র হওয়ায় সংশ্লিষ্ট গ্রুপগুলোর পয়েন্ট টেবিল আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অনেক দলই এখনো নকআউট পর্বে ওঠার দৌড়ে টিকে রয়েছে। ফলে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে প্রতিটি গোল, প্রতিটি পয়েন্ট এবং গোল ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।

 

বিশ্বকাপের ইতিহাসে কিছু দিন থাকে, যা শুধু ফলাফলের জন্য নয়, বরং বিরল পরিসংখ্যানের কারণেও স্মরণীয় হয়ে যায়। ২০২৬ বিশ্বকাপের এই দিনটি ঠিক তেমনই একটি দিন। ১৯৫৮ সালের পর ৬৮ বছর অপেক্ষার পর বিশ্ব ফুটবল আবারও দেখল একদিনে চারটি ম্যাচ, কিন্তু কোনো জয়ী দল নেই।

 

ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি শুধু একটি রেকর্ড নয়, বরং আধুনিক বিশ্ব ফুটবলের পরিবর্তিত বাস্তবতারও প্রতিচ্ছবি-যেখানে ছোট দলগুলো আর শুধু অংশ নিতে আসে না, তারা লড়তে আসে, পয়েন্ট নিতে আসে এবং ইতিহাস গড়তেও আসে।


সম্পর্কিত নিউজ