মেসির হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বড় জয় আর্জেন্টিনার

মেসির হ্যাটট্রিকে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বড় জয় আর্জেন্টিনার
ছবির ক্যাপশান, ছবি: সংগৃহীত

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর শুরুটা আর্জেন্টিনা যেভাবে চেয়েছিল, ঠিক সেভাবেই হয়েছে। কানসাস সিটির পূর্ণ দর্শকভর্তি স্টেডিয়ামে আলজেরিয়াকে ৩-০ গোলে হারিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করেছে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা। আর এই জয়ের পুরো আলোটাই নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন অধিনায়ক লিওনেল মেসি। তিনটি গোল করে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেছেন তিনি, একই সঙ্গে গড়েছেন একাধিক রেকর্ড।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা। বলের দখল, পাসিং এবং আক্রমণ-সব দিক থেকেই এগিয়ে ছিল লিওনেল স্কালোনির দল। তবে আলজেরিয়ার রক্ষণও শুরুতে বেশ সংগঠিত ছিল। কয়েকটি সুযোগ তৈরি করলেও গোলের দেখা পাচ্ছিল না আর্জেন্টিনা।

 

অবশেষে ম্যাচের ১৭তম মিনিটে অপেক্ষার অবসান ঘটে। বক্সের বাইরে থেকে নিজের চিরচেনা বাঁ পায়ে দুর্দান্ত শট নেন মেসি। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান বলটিতে হাত ছোঁয়ালেও সেটিকে জালে যাওয়া থেকে আটকাতে পারেননি। সেই গোলেই ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।

 

প্রথম গোলের পর আর্জেন্টিনা আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। মাঝমাঠে এনজো ফার্নান্দেজ, রদ্রিগো ডি পল এবং আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিয়ে নেন। অন্যদিকে জুলিয়ান আলভারেজ ও লাউতারো মার্টিনেজের চলাফেরা আলজেরিয়ার রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে পুরো সময়।

 

দ্বিতীয়ার্ধে আরও ভয়ংকর মেসি

বিরতির পরও আক্রমণের ধার কমায়নি আর্জেন্টিনা। ৬০তম মিনিটে আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের নেওয়া শট গোলরক্ষক ফিরিয়ে দিলে ফিরতি বলে সবার আগে পৌঁছে যান মেসি। খুব সহজেই বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান ২-০ করেন তিনি।

দ্বিতীয় গোলের পর স্টেডিয়ামে উপস্থিত হাজারো আর্জেন্টাইন সমর্থক "মেসি, মেসি" ধ্বনিতে মুখর করে তোলেন পুরো পরিবেশ।

 

এরপর ম্যাচের ৭৬তম মিনিটে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। বক্সের ডান দিক থেকে বল পেয়ে নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বাঁ পায়ের নিখুঁত শটে আলজেরিয়ার গোলরক্ষককে পরাস্ত করেন মেসি। বল জালে জড়াতেই পূর্ণ হয় তাঁর বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিক।

 

বিশ্বকাপে দীর্ঘ দুই দশকের ক্যারিয়ারে অসংখ্য স্মরণীয় মুহূর্ত তৈরি করলেও এর আগে কখনো হ্যাটট্রিক করতে পারেননি আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। অবশেষে ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই সেই অপূর্ণতা ঘুচল।

 

২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে ইতিহাস

আলজেরিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল আর্জেন্টিনা জার্সিতে মেসির ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ। এমন মাইলফলক ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে সেটিকে আরও স্মরণীয় করে তুলেছেন তিনি।

 

জাতীয় দলের হয়ে ২০০ ম্যাচ খেলার মাইলফলকে পৌঁছানো ফুটবলার বিশ্বের ইতিহাসেই খুব কম। সেই বিশেষ দিনে তিন গোল করে দলকে জিতিয়ে মেসি আবারও দেখিয়ে দিয়েছেন কেন তাঁকে ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বলা হয়।

বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতাদের শীর্ষে মেসি

 

আলজেরিয়ার বিপক্ষে তিন গোল করার মাধ্যমে বিশ্বকাপে মেসির মোট গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬-তে। এই গোলসংখ্যা নিয়ে তিনি কিলিয়ান এমবাপ্পে, জার্মান কিংবদন্তি গার্ড মুলার এবং ব্রাজিলিয়ান কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে পেছনে ফেলেছেন। বর্তমানে তাঁর সমান ১৬ গোল রয়েছে জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোসার। বিশ্বকাপে আর একটি গোল করলেই সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে এককভাবে বসবেন মেসি।

 

রোনালদোর রেকর্ডও ভাঙলেন

এই ম্যাচে হ্যাটট্রিক করে আরেকটি বড় রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। ৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা সবচেয়ে বয়স্ক ফুটবলার এখন তিনি। এর আগে রেকর্ডটি ছিল ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর। ২০১৮ বিশ্বকাপে স্পেনের বিপক্ষে ৩৩ বছর ১৩০ দিন বয়সে হ্যাটট্রিক করেছিলেন পর্তুগিজ সুপারস্টার।

 

শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের পাঁচটি ভিন্ন আসরে গোল করার বিরল কীর্তিতেও রোনালদোর পাশে নাম লিখিয়েছেন মেসি। তিনি গোল করেছেন ২০০৬, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬ বিশ্বকাপে। কেবল ২০১০ বিশ্বকাপেই গোল করতে পারেননি তিনি।

 

সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতাদের তালিকায়ও ওপরে

৩৮ বছর ৩৫৭ দিন বয়সে গোল করে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে বয়স্ক গোলদাতাদের তালিকায় তিন নম্বরে উঠে এসেছেন মেসি। এই তালিকায় তাঁর ওপরে রয়েছেন শুধু ক্যামেরুন কিংবদন্তি রজার মিলা এবং পর্তুগালের ডিফেন্ডার পেপে।

 

আবেগে ভেসেছেন আর্জেন্টাইন অধিনায়ক

ম্যাচের সবচেয়ে আলোচিত মুহূর্তগুলোর একটি ছিল প্রথম গোলের পর মেসির উদযাপন। গোল করার পর টেলিভিশন ক্যামেরায় ধরা পড়ে তাঁর আবেগঘন প্রতিক্রিয়া। অনেকেই লক্ষ্য করেছেন, তখন তাঁর চোখে জল ছিল। বিশ্বকাপের মঞ্চে এটি হয়তো তাঁর শেষ অভিযান। সেই যাত্রার প্রথম ম্যাচেই গোল, তারপর হ্যাটট্রিক-সবকিছু মিলিয়ে আবেগে ভেসে যাওয়াটা স্বাভাবিকই ছিল। স্টেডিয়ামে উপস্থিত আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও দাঁড়িয়ে করতালির মাধ্যমে তাঁদের অধিনায়ককে সম্মান জানান।

 

শিরোপা রক্ষার বার্তা

শুধু জয় নয়, আর্জেন্টিনার খেলায় ছিল চ্যাম্পিয়নসুলভ আত্মবিশ্বাস। দলগত সমন্বয়, বলের নিয়ন্ত্রণ, আক্রমণের বৈচিত্র্য এবং রক্ষণভাগের দৃঢ়তা-সব মিলিয়ে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা প্রতিপক্ষদের জন্য স্পষ্ট বার্তা দিয়ে রাখল। বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই মেসির হ্যাটট্রিক এবং ৩-০ গোলের দাপুটে জয় প্রমাণ করে দিয়েছে, ২০২২ সালের শিরোপাজয়ী আর্জেন্টিনা এবারও ট্রফির অন্যতম বড় দাবিদার। আর সেই স্বপ্নযাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে এখনো রয়েছেন একজনই-লিওনেল মেসি। ৩৮ বছর বয়সেও যিনি বিশ্বমঞ্চে নিজের জাদু ছড়িয়ে চলেছেন আগের মতোই।


সম্পর্কিত নিউজ